অর্থবছরের শেষ সময়ে এসে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়া বাড়িয়েছে সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের নিলামের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয় সরকার।
আগামী রবিবার ১৮২ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের মাধ্যমে আরও ২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার জন্য নিলামের দিন ধার্য রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, প্রতিবার নিলামেই সবগুলো বন্ডই বিক্রি হচ্ছে। সেই অনুযায়ী রবিবারের নিলামের মাধ্যমেও সরকারের ২ হাজার কোটি টাকা ঋণ আসবে বলে আশা করছেন তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ৫ মে পর্যন্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে সরকার ঋণ করে ৩০ হাজার ১৮২ কোটি টাকা। একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া পুরনো ঋণ শোধ করা হয় ২৮ হাজার ৫৪৬ কোটি টাকা।
ফলে ৫ মে পর্যন্ত সরকারের নিট ঋণ দাঁড়ায় ১ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা।
যেখানে অর্থবছরের পুরো সময়ে সরকারের নিট ৮৪ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। তবে সঞ্চয়পত্র থেকে লক্ষ্যমাত্রার বেশি ঋণ আসায় ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারকে ঋণ করতে হয়েছে কম।
প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, ৫ মে পর্যন্ত ব্যাংকব্যবস্থা থেকে লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রায় ২ শতাংশ ঋণ করেছে সরকার। এর মধ্য দিয়ে সরকারের ব্যাংকব্যবস্থা থেকে নেওয়া নিট ঋণ দাঁড়াল ১ লাখ ৭৯ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা। গত বছরের ১ জুলাই সরকারের ব্যাংকঋণের স্থিতি ছিল ১ লাখ ৭৭ হাজার ৮২৩ কোটি টাকা।
ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারকে ঋণ দিতে চলতি মে মাসের ২৭ তারিখ পর্যন্ত ৫ বার ট্রেজারি বিল ও বন্ড নিলাম করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই নিলামগুলোতে বন্ডের মূল্য ছিল ৭ হাজার কোটি টাকা।
এর মধ্যে ৪ মে দুই বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের নিলামের মাধ্যমে ১ হাজার ৫০০ কোটি, ১১ মে ৫ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ড নিলামের মাধ্যমে ২ হাজার কোটি, ২৫ মে ২০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ড নিলামের মাধ্যমে ১ হাজার কোটি ও ১৫ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ড নিলামের মাধ্যমে ১ হাজার ৫০০ কোটি এবং সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার ৩ মাস মেয়াদি ট্রেজারি বন্ড নিলামের মাধ্যমে ২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয় সরকার।
অর্থবছরের শেষ দিকে ব্যাংক থেকে ঋণ করা বাড়ানোর ফলে বর্তমানে নিট ঋণ কিছুটা বাড়তির দিকে। গত এপ্রিল পর্যন্ত সরকার যে পরিমাণ ঋণ নিয়েছিল, শোধ করেছিল তার থেকে বেশি। ফলে ব্যাংক থেকে সরকারের নিট ঋণ ঋণাত্মক ধারায় ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ বাড়ায় ব্যাংকঋণের তেমন দরকার হচ্ছিল না। অর্থবছরের শেষ দিকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে গতি বাড়ায় সরকারের ব্যাংকঋণ বাড়ছে।’
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, গত এপ্রিল পর্যন্ত সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মাত্র ৪৯ শতাংশ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে। গত মার্চে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৪৫ শতাংশ।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ৮৫ হাজার ৯৯০ কোটি ৬৫ লাখ টাকার। সুদ-আসল বাবদ গ্রাহকদের শোধ করা হয়েছে ৫২ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা। এ হিসাবে এ খাতের নিট ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৩ হাজার ২০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা; যা এ খাতের ঋণের বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার ৬৬ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের পুরো সময়ে সরকারের সঞ্চয়পত্র থেকে নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০ হাজার কোটি টাকা।
ফলে এডিপি বাস্তবায়ন কাক্সিক্ষত হারে না হলেও ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে সরকারের ঋণ বাড়তে থাকে। ব্যাংক ঋণ দিয়ে পুরনো ঋণ পরিশোধ করার সুযোগ তৈরি হয়।
এই পরিস্থিতিতে ২০২১-২২ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি অর্থায়নের জন্য ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৭৬ হাজার কোটি টাকা করা হতে পারে বলে জানা গেছে। তবে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে ঋণের লক্ষ্য বেড়ে ৩২ হাজার কোটি টাকা হতে পারে।
আগামী ৩ জুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জাতীয় সংসদে আগামী অর্থবছরের বাজেট পেশ করবেন বলে জানা গেছে।
করোনাকালে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি চাঙ্গা রাখতে চলতি অর্থবছরে (২০২০-২১) বিশাল ব্যয়ের বাজেট ঘোষণা করে সরকার। এই ব্যয় মেটাতে এনবিআরের মাধ্যমে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়।
এদিকে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ চলছে দেশে। রাজস্ব আদায়ে মন্থর গতি দেখা দিয়েছে। বিশাল ঘাটতির কারণে মূল লক্ষ্যমাত্রা থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৩ লাখ কোটি টাকা।
রাজস্ব বোর্ডের সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম আয় বা ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।
আলোচ্য অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত রাজস্ব আয় ছিল ১ লাখ ৭১ হাজার কোটি টাকা। এই সময়ে মাত্র ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অথচ বাজেটে প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয় ৩৫ শতাংশ।