করোনার উৎস নিয়ে রাজনীতি হলে তদন্তে বিঘ্ন ঘটবে : চীন

করোনাভাইরাসের উদ্ভব প্রাণী থেকে নাকি গবেষণাগারের দুর্ঘটনা থেকে হয়েছিল তা নিয়ে আগামী তিন মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। অন্যদিকে চীন জানিয়েছে, এটা নিয়ে রাজনীতি হলে তা তদন্ত প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে আর সেই সঙ্গে মহামারী দমনে বিশ্ববাসীর প্রচেষ্টাকেও ব্যাহত করবে।

সংবাদমাধ্যমগুলোর ভাষ্য, করোনাভাইরাস বন্যপ্রাণী থেকে নাকি গবেষণাগার থেকে মানুষের দেহে প্রবেশ করেছে তা নিয়ে এ মাসের শুরুতে প্রাথমিক একটি প্রতিবেদন পেয়েছেন বাইডেন। কিন্তু সেটি অসম্পূর্ণ। এ কারণেই তিনি বুধবার এ বিষয়ে আরও সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত জানতে দ্বিতীয় আরেকটি তদন্ত প্রতিবেদন চান।

বাইডেন বলেন, ‘আমি এখন গোয়েন্দাদেরকে দ্বিগুণ চেষ্টা চালিয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং তা বিশ্লেষণের অনুরোধ জানাচ্ছি, যার মাধ্যমে একটি সুনির্দিষ্ট উপসংহারে পৌঁছনো যায় এবং এ ব্যাপারে ৯০ দিনের মধ্যে আমাকে প্রতিবেদন দিন।’

এর আগে মঙ্গলবার জেনেভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মন্ত্রী পর্যায়ের এক বৈঠকে কভিডের উৎস নিয়ে নতুন করে আরও ‘নিবিড়’ এবং ‘স্বচ্ছ’ তদন্ত নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা মন্ত্রী জেভিয়ের বেসেরা।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালের নভেম্বরে চীনের উহান ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজির তিন গবেষক এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়েন যে তারা হাসপাতালে ভর্তি হতে চেয়েছিলেন। এর কয়েক সপ্তাহ পর চীন প্রথম সেখানে কেউ কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হওয়ার খবর বিশ্বকে জানায়।

এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের তখনকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, চীনের গবেষণাগার থেকেই ভাইরাসটি ছড়িয়েছে। তবে চীনের পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও তখন সে দাবি প্রত্যাখ্যান করে। এমনকি এ বছরের শুরুর দিকে করোনাভাইরাসের উৎস সন্ধানে চীনে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দল গেলেও বিষয়টির কোনো সুরাহা হয়নি।

মার্চে প্রকাশিত চীন এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যৌথ একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, সার্স-সিওভি-২ সংক্রমণ গবেষণাগার থেকে ছড়িয়েছে এটা প্রমাণ করা খুবই কঠিন। সেখানে বলা হয়, সম্ভবত বাদুর থেকে কোনো একটি প্রাণীর মাধ্যমে বাহিত হয়ে এই ভাইরাসের সংক্রমণ মানুষের মাঝে ছড়িয়েছে।   

এর মধ্যে বুধবার বাইডেনের নতুন এই নির্দেশ এলো। এরপরই ওইদিন বিকেলে ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের ওয়েবসাইটে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, কিছু রাজনৈতিক শক্তি দোষ চাপানো এবং রাজনৈতিক কারসাজির পথ বেছে নিয়েছে। এটা নিয়ে রাজনীতি হলে তা তদন্ত প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে আর সেই সঙ্গে মহামারী দমনে বিশ্ববাসীর প্রচেষ্টাকেও খাটো করবে।

চীনের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশ করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে তাদের ব্যর্থতা ঢাকতে অন্যদিকে দৃষ্টি ঘোরাতে চাইছে।

চীনা দূতাবাসের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘সারা বিশ্বে কভিড-১৯-এর শুরুর দিকের ঘটনাগুলো নিয়ে ব্যাপক গবেষণা দরকার এবং পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে গোপন স্থাপনা এবং জৈব গবেষণাগারে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত চালাতে হবে।’

চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র পিপলস ডেইলি পত্রিকার দ্য গ্লোবাল টাইমস সাময়িকীতে বুধবার বলা হয়, গবেষণাগার থেকে সংক্রমণের তত্ত্ব নিয়ে যদি আরও তদন্ত করতে হয় তবে যুক্তরাষ্ট্রকে ফোর্ট ডেট্রিক ল্যাবসহ নিজেদের অন্য গবেষণাগারগুলোতেও তদন্ত করতে দিতে হবে।

তবে ওয়াশিংটনে কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের (সিএফআর) জ্যেষ্ঠ ফেলো ইয়ানঝঙ হুয়াং জানিয়েছেন, চীন যথেষ্ট খোলামেলা না হওয়ার কারণেই গবেষণাগার থেকে সংক্রমণের তত্ত্ব নতুন করে সামনে এসেছে। তিনি বলেন, ‘মহামারীর উৎপত্তি নিয়ে তদন্তের ফলাফলে আস্থা তৈরির জন্য স্বচ্ছতা খুবই জরুরি।’

হুয়াং বলেন, ‘আপনি চীনের কাছে আরও সহযোগিতা এবং স্বচ্ছতা চাইলেও এখন তদন্তের দাবি বাড়ায় এর রাজনীতিকরণও অনেক বেশি হচ্ছে।’

নতুন করে তদন্তের পক্ষে কাজ করা পরামর্শক সংস্থা আটলান্টিক কাউন্সিলের ফেলো জেইমি মেটজেল বলেন, ‘এটা খুব স্পষ্ট যে তারা যেখানে আটকে আছে সেখান থেকে বের হওয়ার জন্য তারা বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক করার চেষ্টা করছে।’