সরকারের নীতিনির্ধারণী বিভিন্ন বিষয় নিয়ে অবগত হতে পারছেন না ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নেতারা। যে কারণে প্রায় নিয়মিতই অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির মুখোমুখি পড়তে হচ্ছে তাদের। আওয়ামী লীগ নেতাদের মতে, রাজনীতিতে এক ধরনের অচলাবস্থা বিরাজ করছে, বলা যায় সংকটও চলছে। আর এর জন্য করোনা পরিস্থিতি অনেকাংশে দায়ী মন্তব্য করে তারা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, রাজনীতি-কূটনীতিÑ এসব নিয়ে নেতাদের ভেতরে এখন কোনো ধারণাই নেই। এর কারণ হিসেবে তারা দাবি করেন, দলীয় নীতিনির্ধারণী সভা-বৈঠক না থাকাকে। তাছাড়া রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে এখন নেতারা কম সম্পৃক্ত থাকেন। সরকারি মহলেই সবকিছুর সমাধান হয়ে যায়।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নানা ধরনের জটিলতা দেখা দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য। সম্প্রতি সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম ইস্যুর উদাহরণ টেনে ওই নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইস্যুটি রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করা যায়নি বলে এর পরিণতি সরকারকে এবং আওয়ামী লীগকে ভোগান্তিতে ফেলেছে। সরকারের মন্ত্রিসভায় রাজনৈতিকভাবে অভিজ্ঞ ও দক্ষ নেতার অভাব রয়েছে। ফলে মন্ত্রীদের কার্যক্রমও প্রশ্নের মুখে পড়ছে। সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার অর্জন দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়লেও সামান্য ভুলে প্রশ্নবিদ্ধও হয়ে উঠছে।’
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে একটা কথা প্রচলিত রয়েছে, সরকার আমলাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এটিও মন্ত্রীদের রাজনৈতিক অদক্ষতায় প্রচলিত হয়েছে। দক্ষ-অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতারা মন্ত্রিসভায় থাকলে আমলারা সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হতে পারত না। সবকিছু নিয়ে সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার ওপরও চাপ পড়ত না।’
ক্ষমতাসীন দলের এ নেতা আরও বলেন, ‘একটা ইস্যু দেখা দিলে দেখবেন, আমাদের দলের একেকজন নেতা একেক ধরনের বক্তব্য দিয়ে থাকেন। যার ফলে সরকার ও দল উভয়কেই বেকায়দায় পড়তে হয়। রাজনীতি নিয়ে এবং সরকারের নীতি নিয়ে আমরা নেতারা অন্ধকারে থাকি বলেই এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির মুখোমুখি নিয়মিত পড়তে হচ্ছে দলীয় নেতাদের। এর মূল কারণ হলো প্রায় দেড় বছর আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সাক্ষাৎ পাই না আমরা বেশিরভাগ নেতা। ফলে সরকার ও দলের নীতিগত অবস্থান সম্পর্কে অজানা থেকে যায় আমাদের। কিন্তু গণমাধ্যমের মুখোমুখি পড়লে আমাদের রাজনীতির স্বার্থে কথা বলতেই হয়। সেটি কখনো পক্ষে যায়, কখনো আবার বিপক্ষে চলে যায়।’
দলের সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের দলের মিটিং-সিটিং শুরু করা উচিত। তাহলে রাজনীতি সক্রিয় হবে।’
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, করোনা পরিস্থিতির মধ্যে চলমান সংকট মোকাবিলায় রাজনৈতিক কোনো দিকনির্দেশনা না থাকায় দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিএনপির মিথ্যাচারের রাজনীতির জবাবও দেওয়া যাচ্ছে না শুধু রাজনৈতিকভাবে অন্ধকারে থাকার কারণে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দল তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর দলগতভাবে সমস্যা-সংকট মোকাবিলা করার উদ্যোগ একেবারেই কমে গেছে। ফলে সরকার নানা আলোচনা-সমালোচনায় জড়িয়ে পড়েছে। এসব সংকট মোকাবিলায় রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা দৃশ্যমান রাখা হলে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হতো না। এ ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে আওয়ামী লীগের রাজনীতির ঐতিহ্যকে।’
সরকার ও দলের মধ্য এক ধরনের দূরত্ব দেখা দিয়েছে উল্লেখ করে এই আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, ‘দল ও সরকারের ভেতরে এ দূরত্ব সৃষ্টির পেছনে কোনো একটি মহল জড়িতও থাকতে পারে। সম্প্রতি যেসব সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে, বলা যায় এর কোনো কিছুতেই রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে অনলাইনের মাধ্যমে সব ধরনের মিটিং-সিটিং হচ্ছে। শুধু দলীয় কোনো মিটিং-সিটিং হয়নি। গত এক বছরেও দলের কার্যনির্বাহী সংসদের একটি সভা হয়নি। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হলে কার্যনির্বাহী সংসদের সভা গুরুত্বপূর্ণ।’
দলের সম্পাদকমণ্ডলীর আরেক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাতেগোনা কয়েকজন নেতা ছাড়া দলের সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে গত এক বছরে কোনো নেতার দেখা ও কথা হয়নি। রাজনীতি কতখানি উপেক্ষিত এসব চিত্র থেকেই তা স্পষ্ট হয়ে উঠে।’ তিনি আরও বলেন, ‘দলীয় কার্যালয়গুলোও এখন সচল নেই। হাতেগোনা কয়েকজন নেতা যাতায়াত করেন মাত্র।’
তবে কোনো আওয়ামী লীগ নেতা প্রকাশ্যে হতাশার কথা ব্যক্ত করছেন না। দলের সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দলে আমাদের দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনাই সর্বেসর্বা। উনি সরাসরি যে নির্দেশনা দেন সেটা যত ত্বরিতগতিতে সম্পন্ন হয় অন্য কোনো নেতার নির্দেশনা সেভাবে বাস্তবায়ন হয় না।’ কেন তা হয় না জানতে চাইলে এই নেতা বলেন, ‘দলের সবার কাছে শেখ হাসিনা অদ্বিতীয়।’
আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীকে হতাশা ঘিরে ধরেছে। তা দূর করা সম্ভব না হলে আওয়ামী লীগকে ভুগতে হবে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের সবকিছুই করতে হয় সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব মেনে। ফলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, মিটিং-সিটিং দৃশ্যমান নেই। ত্রাণ সহায়তাসহ মাঠেঘাটে সব কাজই তো রাজনৈতিক নেতারা ও সংসদ সদস্যরাই করছেন।’
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখানে হতাশার কোনো কারণ নেই। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সবকিছু চলছে। সব দুর্যোগ এক ধরনের নয় বলে এখানে রাজনৈতিক উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।’