ঔপনিবেশিক আমলের আইনে বিচারে দীর্ঘসূত্রতা, ভোগান্তি

ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগে ১৮৬০ সালে তৈরি দ-বিধির যেসব ধারায় আসামির বিচার হয়, সেই আইনের বয়স ১৬১ বছর। সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের মাধ্যমে অপরাধ প্রমাণ করার যে আইন সেই সাক্ষ্য আইনটি প্রায় ১৫০ বছরের পুরনো। ফৌজদারি অপরাধের বিচারে পথ নির্দেশক হিসেবে কাজ করে যে ফৌজদারি কার্যবিধি, সেটিও ১২৩ বছর আগের। আইনজীবীরা বলছেন, ১০০ ও ১৫০ বছর আগের প্রেক্ষাপট এখন বাংলাদেশে নেই। মানুষ বেড়েছে। বেড়েছে অপরাধ ও মামলা। একই সঙ্গে অপরাধের ধরন, নৃশংসতা, আইন না মানার প্রবণতাও আগের চেয়ে ঢের বেড়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ঔপনিবেশিক আমলের তৈরি এসব পদ্ধতিগত আইনের (প্রসিডিউরাল ল) অনেক কিছুই এখন আর সময়ের সঙ্গে সমীচীন নয়। আইনের কিছু ক্ষেত্রে সংস্কার, পরিবর্তন ও যুগোপযোগী না হওয়ায় মামলাজট কমানো ও বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি লাঘবে ভূমিকা রাখতে পারছে না।

উচ্চ ও বিচারিক আদালতের বেশ কয়েকজন আইনজীবী প্রায় অভিন্ন সুরে বলেন, দেশের আদালতগুলো মামলার ভারে জর্জরিত। করোনা মহামারীর পরিস্থিতিতে এক বছরের বেশি সময়ে জট আরও বেড়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব বিচারাঙ্গনে পড়বে আগামী কয়েক বছর। দীর্ঘ দিন এসব আইন সংস্কার কিংবা পরিবর্তন হয়নি। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এসব আইনের সংস্কার, পরিবর্তন কিংবা সংশোধন করে যুগোপযোগী করা এখন সময়ের দাবি। তাদের মতে, দ-বিধি ও ফৌজদারি আইনের ধারণা থেকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মতো আরও বিশেষ আইনগুলো তৈরি হয়েছে। তবে পদ্ধতিগত আইনগুলোর সংস্কার না হওয়ার কারণে বিশেষ আইনগুলোর সুফল মিলছে ধীরলয়ে।

দ-বিধির কিছু অসংগতি তুলে ধরে আইনজীবীরা বলেন, ৫১০ ধারা অনুযায়ী মাদক গ্রহণ করে মাতলামির সাজা হিসেবে কোনো ব্যক্তিকে ১০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা ২৪ ঘণ্টার বিনাশ্রম কারাদন্ড দেওয়া যাবে। একই আইনের ৪৯৭ ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তির স্ত্রী কারও সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে (ব্যভিচার) জড়ালে শুধু স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা বা সাজার বিধান রয়েছে। একইভাবে স্বামী অন্য কোনো নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ালে স্বামী কিংবা ওই নারীর বিরুদ্ধে স্ত্রী ব্যবস্থা নিতে পারবেন না। কেউ ঝগড়া-বিবাদ বা মারামারি করে কলহ সৃষ্টি করে শান্তি ভঙ্গ করলে অভিযুক্তকে দ-বিধির ১৬০ ধারায় সর্বোচ্চ ১০০ টাকা জরিমানা করা যাবে। উচ্চ স্বরে গান-বাজনা, হইহুল্লোড় করে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত করলেও গণ-উৎপাতের এই অপরাধে দ-বিধিতে ২৯০ ধারা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ২০০ টাকা জরিমানার কথা বলা হয়েছে।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মূলত প্রসিডিউরাল ল’র কারণে বিচারে দীর্ঘসূত্রতা হয়। আইন যুগোপযোগী না হওয়ায় মামলাজট বেড়ে, বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি বাড়ছে। বিচার দ্রুত শেষ না হলে মানুষ হতাশ হয় এবং এর একটি নেতিবাচক প্রভাবও কিন্তু পড়ে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখনো ১০ টাকা, ৫০ টাকা, ২০০ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। এগুলো কি এখন চলে? তাই নিশ্চিতভাবে আইন পরিবর্তন কিংবা সংশোধন প্রয়োজন। প্রয়োজন এ জন্য যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা যেমন আছে, তেমনি সংবিধানে এটাও আছে যে বিচারকাজটা যেন দ্রুত হয়। বিচারের যে দীর্ঘসূত্রতা এটাকে যদি কমানো না যায়, তাহলে বিচারপ্রার্থী মানুষ বঞ্চিত হবে। এগুলো সংশোধন করে মামলার কীভাবে দ্রুত নিষ্পত্তি করা যায়, সেই ব্যবস্থা রাখতে হবে।’

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই (জহিরুল ইসলাম) খান পান্না এ নিয়ে দেশ রূপান্তরকে ব্যতিক্রমী অভিমত দেন। তার মতে, পদ্ধতিগত এসব আইনের অনেক ধারা যেমন সচল রয়েছে, তেমনি অনেক ধারার ব্যবহার হয় না বললেই চলে। সময়ের প্রয়োজনে সবকিছুরই পরিবর্তন ও সংস্কার হয়। আবার অনেক কিছুর পরিবর্তন না করলেও এমনিতেই কার্যকারিতা থাকে না। তিনি বলেন, ‘একসময় আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ভার্চুয়াল আদালতের কথা চিন্তাতেও আনতে পারিনি। কিন্তু এখন এ আদালত চলছে। ভবিষ্যতে হয়তো এর বিচারিক আওতা আরও বাড়বে। প্রচলিত যেসব আইন রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে এমন কিছু আইন ও ধারা রয়েছে, যেগুলোর ব্যবহার এখন হয় না। বলা যায় হারিয়ে যাচ্ছে। অপরাধের বিচারে এখন বিশেষ আইন হচ্ছে এবং এর সুফলও মিলছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মূলত পুরনো আইনের কারণে মামলাজট বাড়ে না। এটি হয় আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হলে, আদালতে অবকাঠামো ও বিচারকের সংকট থাকলে।’

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও আইন সাময়িকী ঢাকা ল রিপোর্টার্সের (ডিএলআর) সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. খুরশীদ আলম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দ-বিধির বয়স ১৬১ বছর হলেও খুন সম্পর্কিত ৩০২ ও ৩৯৬ ধারায় ডাকাতির সাজা, গুরুতর আঘাতজনিত ৩২৬-এর মতো ধারাগুলো এখনো পূর্ণাঙ্গ ও সচল। কিন্তু এগুলোসহ অন্য ধারাগুলোর আমরা যথাযথভাবে সদ্ব্যবহার করতে পারছি না। আমাদের দক্ষ প্রসিকিউশন, তদন্ত সংস্থা ও দক্ষ পাবলিক প্রসিকিউটরের অভাব রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন ‘ফৌজদারি অপরাধের বিচারে বিশেষ আইনগুলো কিন্তু দন্ড-বিধি ও ফৌজদারি আইনের ধারণা থেকেই করা হয়েছে। তাই সব আইন সংস্কারের প্রয়োজন নেই। ব্রিটিশ আমলে তৈরি আইন পরিবর্তন করতে যখনই হাত দেওয়া হয়েছে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, সেখানে পোকা ধরেছে। কাজেই আইনে যত কম হাত দেওয়া যায়, ততই ভালো। যেগুলো না করলেই না, সেগুলো সংস্কার করে যুগোপযোগী করার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু এটি করতে হবে ভেটিংয়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের মতামত নিয়ে।’ সুপ্রিম কোর্টের একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বলেন, ‘১৮৬০ সালের দ-বিধিতে অপরাধ করলে কী ধরনের সাজা হবে, সেটি বলা আছে। ফৌজদারি কার্যবিধিতেও তদন্ত, সাক্ষী হাজিরসহ বিচারের নানা দিক নির্দেশনা আছে। কিন্তু এই আইন ও নির্দেশনা প্রতিপালন না হলে কিংবা মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে কী হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট উল্লেখ নেই। আবার ডিজিটাল এই যুগে দেড়শ বছরের সাক্ষ্য আইন অনেকটাই বেমানান। এতে বিচারে দীর্ঘসূত্রতা বাড়ে।’

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যদিও দেড়-দুই শো বছর হয়ে গেছে, কিন্তু তারা (ব্রিটিশ) যে আইন করে গেছে এই সময়ে সেটি করার সক্ষমতা কারও আছে বলে আমার মনে হয় না। দন্ড বিধি একটি পূর্ণাঙ্গ বিধান। উপমহাদেশের সব দেশেই এ ধরনের আইনেই বিচার চলছে। তবে দেওয়ানি, ফৌজদারি, সাক্ষ্য আইনের মতো প্রসিডিউরাল লর কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন দরকার। এটি করলে ভালো হয়। কেননা বিচারের ক্ষেত্রে কত দিনের মধ্যে বিচার করবে, তদন্ত কত দিনের মধ্যে হবে, এগুলোসহ সাক্ষ্য আইনেও কিছু পরিবর্তন হলে আইনগুলো যুগোপযোগী হবে।’ তিনি বলেন, ‘ফৌজদারি ও দন্ডবিধিতে অনেক কিছুই বলা আছে। কিন্তু এগুলোর অপপ্রয়োগ হচ্ছে। আমাদের সমস্যা আইনে নয়, বড় সমস্যা হলো বিচারিক পদ্ধতির ত্রুটিতে। এ ছাড়া আইন প্রয়োগ যারা করছেন, তাদের দুর্বলতা এবং ব্যর্থতা রয়েছে।’

সাক্ষ্য আইনে যত অসংগতি: বিচারিক আদালতে ১৮৭২ সালে প্রণীত সাক্ষ্য আইনের আলোকে সাক্ষীর জবানবন্দি ও জেরার মাধ্যমে ফৌজদারি অপরাধ প্রমাণ করতে হয়। কিন্তু ডিজিটাল এই যুগে ডিজিটাল সাক্ষ্যের অপরিহার্যতা থাকলেও চলমান সাক্ষ্য আইনে এর কিছুই উল্লেখ নেই। আইনজীবীরা বলছেন, তথ্যপ্রযুক্তির সহজলভ্যতায় প্রযুক্তিগত বা সাইবার অপরাধ অনেক বেড়েছে। কিন্তু অপরাধ বা ঘটনার ভিডিও, স্থিরচিত্র, অডিও কীভাবে ব্যবহার হবে, সে বিষয়ে সাক্ষ্য আইনে স্পষ্ট কোনো বিশ্লেষণ ও সংজ্ঞা নির্ধারণ নেই। মূলত মৌখিক ও দালিলিক সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করেই আসামির বিরুদ্ধে মামলা প্রমাণ করতে হয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

আইন মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, সাক্ষ্য আইনে তথ্যপ্রযুক্তির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে ইতিমধ্যে উদ্যোগ নেওয়া হলেও কভিড পরিস্থিতির কারণে এটি থমকে আছে।

এদিকে ধর্ষণের মামলায় ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনের ১৫৫ (৪) ধারায় ভুক্তভোগীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা কিংবা তাকে ‘দুশ্চরিত্রা’ হিসেবে দেখানোর সুযোগ রয়েছে খোদ সাক্ষ্য আইনেই। নারী অধিকারকর্মীদের মতে, বৈষম্যমূলক এই ধারার কারণে অনেক ক্ষেত্রে আসামি পার পেয়ে যায়। ঢাকা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট খাদেমুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফৌজদারি অপরাধের বিচারের প্রধান ভিত্তিই হলো সাক্ষ্য গ্রহণ। কিন্তু ডিজিটাল এই যুগে সাক্ষ্য আইন এখনো সেকেলেই রয়ে গেছে। ধর্ষণ মামলার মতো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে এই আইনের কিছু ধারা বিচারপ্রাপ্তিতে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে। এমন আরও অসংগতি রয়েছে। সাক্ষ্য আইনটিকে যুগোপযোগী করা উচিত।’