দেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম কুমিল্লা। এ জেলার অন্তত ১০৬ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে রয়েছে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত। রয়েছে একটি স্থলবন্দরও। কুমিল্লার মানুষের মধ্যে শঙ্কা বাড়াচ্ছে করোনাভাইরাসের ভারতীয় ধরন।
করোনার প্রকোপ ঠেকাতে গত বছরের এপ্রিলের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত জেলার বিবিরবাজার স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের মানুষের আসা-যাওয়া বন্ধ রয়েছে। তবে, চোরাকারবারিরা থেমে নেই। এ পরিস্থিতিতে পার্শ্ববর্তী দেশটিতে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনার ভারতীয় ধরন নিয়ে সীমান্তবর্তী জেলাবাসীর মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কুমিল্লার পাঁচ উপজেলা পড়েছে ভারতীয় সীমান্তে। জেলার আদর্শ সদর, সদর দক্ষিণ, চৌদ্দগ্রাম, বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা দিয়ে ভারতীয় সীমান্ত অতিবাহিত হয়েছে। অবৈধ আসা-যাওয়া ঠেকাতে এসব এলাকায় বিজিবির পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সতর্ক থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব উপজেলার অন্তত ১০ জন ব্যক্তি জানান, বৈধভাবে কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে আসা-যাওয়া বন্ধ থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে অবৈধভাবে আসা-যাওয়া করছেন দু-দেশের লোকজন। বিশেষ করে চোরাকারবারিদের তৎপরতা থেমে নেই।
তারা বলেন, বর্তমানে করোনাভাইরাসের ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। চোরাকারবারি ও অবৈধভাবে আসা-যাওয়া করা মানুষদের মাধ্যমেও কুমিল্লায় ছড়াতে পারে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট। এসব কারণে কুমিল্লায় এখনো করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত না হলেও এর আশঙ্কা উড়িয়ে দিতে পারছেন না কেউ-ই।
জেলার স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ভারত থেকে ফেরা ২৯২ জন বাংলাদেশিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে কুমিল্লার বেশ কয়েকটি বেসরকারি হোটেলে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। তারা সকলেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে দেশে ফিরেছেন। সেখানে স্থানসংকুলান না হওয়াতে তাদেরকে কুমিল্লায় রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে এদের কোয়ারেন্টাইন শেষ হবে। জেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ ও স্বাস্থ্য বিভাগের যৌথ তত্ত্বাবধান তারা কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, সম্প্রতি আখাউড়া স্থলবন্দর হয়ে বাংলাদেশ ফেরত ২৯২ জনকে কুমিল্লার বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে হোটেল টোকিওতে ৪৭, জমজম হোটেলে ৫০, বাগিচাগাঁও ময়নামতি হোটেলে ১৯, আলা ফালাহতে ৩০, রেড রুফ ইনে ২৩, ভিক্টরিতে ৩৫, গোল্ডেন ইনে ২৯, হোটেল পার্কে ২৩, ময়নামতি আলেখারচরে ৩১, মেডিকেল কোয়ারেন্টিনে ৪। এখন পর্যন্ত একজনকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। ভারত থেকে আসা প্রত্যেকেরই করোনাভাইরাস পরীক্ষা করানো হচ্ছে। তবে এদের মধ্যে এখন পর্যন্ত কারও করোনা পজিটিভ পাওয়া যায়নি। তবে এদের সবাইকে বাধ্যতামূলক ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইন পালন করতে হবে।
রবিবার কুমিল্লা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আবু সাঈদ বলেন, কঠোর নজরদারির মাধ্যমে ভারত থেকে দেশে আসা ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করা হচ্ছে। কোয়ারেন্টাইনে থাকা ব্যক্তিরা কুমিল্লা, ফেনী, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নেয়াখালীসহ পার্শ্ববর্তী জেলার বাসিন্দা।
তিনি আরও জানান, ভারত থেকে আসা কেউ এখন পর্যন্ত করোনা পজিটিভ শনাক্ত হননি। তবে সবাইকে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে। এদের সার্বিক বিষয় দেখার জন্য চারজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা রয়েছেন। এছাড়াও সবাইকে পুলিশি নজরদারিতে রাখা হয়েছে বলে তিনি জানান।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান জানান, করোনাভাইরাসের ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট অত্যন্ত প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। কুমিল্লায় এর সংক্রমণ ঠেকাতে জেলাজুড়ে সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে। আমরা সকল বিষয়ে সতর্ক রয়েছি।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. মীর মোবারক হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন বলেন, আমাদের জেলায় এখন পর্যন্ত করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয়নি। আমরা বিষয়টি নিয়ে সতর্ক রয়েছি।
তিনি আরও জানান, শনিবার পর্যন্ত কুমিল্লায় মোট নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে ৭৪হাজার ৬৫৮জনের। এর মধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন ১২ হাজার ৭৫৪ জন। মোট মারা গেছেন ৪৩২জন। আর এখন পর্যন্ত সর্বমোট সুস্থ হয়েছেন ১০ হাজার ৪৫৩ জন।
কুমিল্লার বিবিরবাজার স্থলবন্দরের কাস্টমস ও শুল্ক স্টেশনের রাজস্ব কর্মকর্তা এস এম সালাউদ্দিন জানান, বিবিরবাজার স্থলবন্দরে আমদানি-রপ্তানি চালু থাকলেও গত প্রায় ১৪ মাস ধরে এ বন্দর দিয়ে মানুষের আসা-যাওয়া বন্ধ রয়েছে। ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট অত্যন্ত বিপজ্জনক, এ জন্য বিষয়টি নিয়ে তারাও সতর্ক রয়েছেন বলে জানান তিনি।