পর্যটন রাজধানী খ্যাত বিশ্বের দীর্ঘতম সৈকত নগরী কক্সবাজারে পর্যটকদের বিনোদন দিয়ে ঘোড়ার মাধ্যমে হাজার হাজার টাকা আয় করে স্বাবলম্বী হয়েছেন অনেকে। কিন্তু করোনা মহামারির ফলে পর্যটকহীন সৈকতে ঘোড়ার মালিকদের রোজগার বন্ধ হয়ে যায়।
এ পরিস্থিতিতে আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার অজুহাতে দায়িত্ব না নিয়ে খাবারের জন্য অসহায় ঘোড়াগুলোকে পথে ছেড়ে দেন মালিকেরা। পথে পথে ঘুরে, খাবার না পেয়ে, অবহেলা, পুষ্টিহীনতা ও রোগে ভুগে বেশ কয়েকটি ঘোড়ার মৃত্যুও ঘটে। অনেকে ঘোড়ার মালিকদের দোষারোপ করে বলেন, সুদিনে এই ঘোড়াগুলোর মাধ্যমে আয়েশি জীবন যাপন করলেও মহামারিকালে প্রাণীগুলোর দায়িত্ব না নিয়ে পথে ছেড়ে দিয়ে তারা অমানবিক আচরণ করেছেন।
ঘোড়ার মালিক সমিতির দাবি, চলমান করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় দেয়া লকডাউনে ৬টি ও গত বছরের করোনাকালীন লকডাউনে ২৪টি ঘোড়া মারা গেছে। এদিকে করোনাকালে ৩০টি ঘোড়া মারা গেলেও এ বিষয়ে কিছুই জানেন না প্রশাসন।
ঘোড়ার মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করলেও গণমাধ্যম এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশের পর জেলায় সৃষ্টি হয়েছে চাঞ্চল্য। ঘোড়ার মালিকদের দাবি, আয় বন্ধ হওয়ায় ঘোড়ার খাবার দেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে ঘোড়া রাস্তায় ছেড়ে দিয়েছেন। তবে ঘোড়ার প্রতি মালিকদের আচরণ অমানবিক দাবি করে তাদের আইনের আওতায় আনার দাবিও জানিয়েছেন অনেক সচেতন ব্যক্তি।
জানা যায়, কক্সবাজার সৈকতে বেড়াতে আসা পর্যটকদের বিনোদনে দীর্ঘদিন ৫৫টি ঘোড়া ব্যবহার হয়ে আসছে। একটি ঘোড়ার দাম ৩০ থেকে ৫০ হাজার পর্যন্ত। এসব ঘোড়ার মালিকদের নিয়ে ২২ সদস্য বিশিষ্ট ‘কক্সবাজার ঘোড়া মালিক সমিতি’ গঠিত। এই সমিতির বাইরে ১০ টিসহ সৈকতে মোট ৬৫টি ঘোড়া আছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, প্রতি বছর পর্যটন মৌসুমে টানা ৪ মাসে (ডিসেম্বর, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ) প্রতিদিন গড়ে একটি ঘোড়া দিয়ে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত মালিকরা আয় করে থাকেন। গড়ে ৩ হাজার টাকা হিসেব করা হলেও চার মাসে একটি ঘোড়া দিয়ে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা আয় করেন মালিকরা। বাকি মাস গুলোতে প্রতিদিন গড়ে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত ঘোড়া প্রতি আয় হয়ে থাকে।
সে হিসেবে মালিকরা একটি ঘোড়া দিয়ে বছরে কমপক্ষে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করতে সক্ষম। এর বাইরেও ঘোড়ার গাড়ি, বিয়ে ও বিভিন্ন উৎসবে ঘোড়াগুলোর ব্যবহার হয়। যার বিনিময়ে ঘোড়া মালিকরা পান অর্থ।
ঘোড়ার মালিকরা জানান, আয় থেকে একটি ঘোড়ার খাবারের পেছনে প্রতিদিন ২শ থেকে আড়াই শ টাকা করে বছরে ৭২ হাজার টাকা থেকে ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত সর্বোচ্চ ব্যয় করতে হয়।
কিন্তু চলতি বছরের ১ এপ্রিল থেকে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ঠেকাতে লকডাউন ঘোষণা করে সৈকত বন্ধ করে দেয় জেলা প্রশাসন। ফলে অন্যান্য পর্যটন ব্যবসায়ীদের মতো বেকায়দায় পড়েছেন বলে দাবি করেন ঘোড়া মালিকরা।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ঘোড়ার মালিক বলেন, হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া সবারই ঘোড়াকে খাবার দেওয়ার সামর্থ্য রয়েছে। এরপরও মালিকরা ঘোড়ার প্রতি অমানবিক আচরণ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
ঘোড়ার মালিক সমিতির সভাপতি আহসান উদ্দীন নিশান স্বীকার করেছেন ঘোড়ার আয় দিয়ে অনেকেই জায়গা কিনে বাড়ি-ঘর করেছেন, অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন।
তিনি বলেন, আমি নিজেও ঘোড়ার আয় দিয়ে সংসারের খরচ বহনের পাশাপাশি এক ভাইকে বিয়ে করিয়েছি, বোনের বিয়ে দিয়েছি।
পর্যটন মৌসুমে টানা ৪ মাস একটি ঘোড়া আড়াই হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা আয়ের কথা অকপটে মেনে নিলেও সত্যিকার অর্থে আয় বন্ধ থাকায় বেশির ভাগ মালিকের ঘোড়াকে খাবার জোগান দেওয়ার সামর্থ্য নেই বলে দাবি করেন তিনি। ৩০টি ঘোড়া মারা গেলেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে কেন অবগত করা হয়নি এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তখন বিষয়টা এতটা গুরুত্বসহকারে ভাবা হয়নি।
কক্সবাজার জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডা. অসীম বরণ সেন বলেন, ঘোড়ার মৃত্যু নিয়ে মিথ্যাচার করা হচ্ছে। খাদ্যের অভাবে ঘোড়া মারা যাওয়ার বিষয়টি সত্য নয়। আমার জানামতে গত এক বছরে তিনটি ঘোড়া মারা গেছে। তাও বার্ধক্যজনিত ও নানা অসুস্থতার কারণে। কারণ আমরা ঘোড়া মালিকদের খাদ্য সহায়তা দিয়েছি। ভবিষ্যতেও এ সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
তিনি আরও বলেন, এরপরও বিভিন্ন মিডিয়ায় খবরটি আসার পর প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। উক্ত কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য বলা হয়েছে। কমিটিতে কক্সবাজার প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. নেবু লাল দত্তকে প্রধান করা হয়েছে। কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেন কক্সবাজার প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের উপ-সহকারী কর্মকর্তা ডা. মিজবাহ উদ্দিন কুতুবী ও ডা. এহসানুল হক।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের (পর্যটন ও প্রটোকল) সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মুরাদ ইসলাম বলেন, সৈকতে পর্যটকদের বিনোদনের জন্য ২২ জন ঘোড়া মালিককে অনুমতি দেয়া রয়েছে। যে পরিমাণ ঘোড়ার মৃত্যু হয়েছে বলে প্রচার করা হচ্ছে এর কোন তালিকা আমাদের কাছে নেই। মালিকরাও কখনো এ বিষয়ে আমাদের জানায়নি।
তিনি বলেন, করোনা সংক্রমণ রোধে সৈকত ও বিনোদনকেন্দ্রগুলো বন্ধ রাখায় ঘোড়া মালিকদের আয় বন্ধ হয়ে যায় এবং ঘোড়াগুলো খাদ্য সংকটে পড়ে। এজন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে খাদ্য (ভুসি ও ছোলা) বিতরণ করা হয়। তাই খাদ্য সংকট থাকার কথা নয়।
‘আমরা কক্সবাজারবাসী’ সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন বলেন, ঘোড়াগুলোর মালিক পক্ষের অমানবিক আচরণে আমরা ক্ষুব্ধ। মালিকরা এত দিন ধরে ঘোড়াগুলো দিয়ে টাকা আয় করেছে। আজ করোনা সংকটে ঘোড়াগুলোকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। তাই ঘোড়ার মালিকদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।
এসব রোগাক্রান্ত ঘোড়া করোনাসহ বিভিন্ন রোগ ছড়ায়, সমুদ্র সৈকত দূষিত করে উল্লেখ্য করে ঘোড়াগুলো সরকারি হেফাজতে বা কোন পার্কে রাখার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ঘোড়ার মালিকদের বিচার দাবি করেছেন অনেকেই। তারা পশুগুলোর প্রতি অমানবিক আচরণ করা হচ্ছে জানিয়ে দ্রুত ঘোড়ার মালিকদের গ্রেপ্তারের দাবিও জানান।
এদিকে, কক্সবাজার সৈকতের ঘোড়াগুলোর খাদ্য সংকটের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর ৫৫টি ঘোড়ার জন্য মালিকদের এক মাসের খাদ্য সহায়তা দিয়েছেন এসিআই মোটরস। এছাড়া আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কয়েক দিনের খাবার দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
অন্যদিকে, এ ঘটনায় পরিবেশ ও প্রাণিসম্পদ কাজ করা তিনটি সংগঠন আইনি নোটিশ দিয়েছেন ২ সচিবসহ বিভিন্ন দপ্তরের ১৩ জন কর্মকর্তাকে।
সংগঠন তিনটি হলো- বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি ও পিপল ফর অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন।
বেলার আইনজীবী সাঈদ আহমেদ কবীর স্বাক্ষরিত নোটিশটির জবাব দিতে বলা হয়েছে ৫ দিনের মধ্যে। ডাকযোগে নোটিশ পাঠানোর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন ইয়েসের প্রধান নির্বাহী ইব্রাহিম খলিল মামুন।
যাদের কাছে নোটিশ পাঠানো হয়েছে, তারা হলেন- মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ভেটেরিনারি কাউন্সিলের সভাপতি, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক, কক্সবাজারের পুলিশ সুপার, কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র, জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।