করোনার মহামারীতেও থামছে না অপরাধ। ঢাকাসহ সারা দেশে অপরাধ বেড়েছে উদ্বেকজনকভাবে। প্রতিদিনই ঘটছে হত্যা, ধর্ষণ, ছিনতাই, ডাকাতি, পারিবারিক অপরাধসহ নানা রকমের অপরাধমূলক কর্মকান্ড। গত কয়েকদিনে দেশে বেশ কয়েকটি নৃশংস হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটনায় আরও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। হত্যার পর লাশ কয়েক টুকরা করার ঘটনাও ঘটেছে ঢাকায়। অপরাধ বিশ্লেষক ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলেছেন, করোনা মহামারীর সংকটে মানুষের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বেড়েছে। একই সঙ্গে অপরাধের ধরন ও নৃশংসতাও উদ্বেগজনক। হঠাৎ অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় পুলিশের কর্তাব্যক্তিরা বৈঠক করছেন। অপরাধ ঠেকাতে পুলিশের ইউনিট প্রধান ও জেলার এসপিদের নানা দিকনির্দেশনা পাঠিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। গতকালও পুলিশ সদর দপ্তরে আইজিপিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা একটি বিশেষ বৈঠক করেছেন বলে পুলিশ সূত্র দেশ রূপান্তকে জানিয়েছে।
এদিকে, অপরাধ বেড়ে যাওয়ায় দেশের কারাগারগুলোতে চাপ বেড়ে গেছে। তারপরও গত দেড় মাসে অধস্তন আদালতে ভার্চুয়াল শুনানিতে ৫১ হাজারের বেশি হাজতি জামিন হয়েছে। একদিকে হাজতিদের জামিন মিলছে চাপ কমছে না কারাগারে অপরদিকে বিভিন্ন অপরাধে প্রায়ই একই সংখ্যক আসামিকে কারাগারে পাঠানো হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, করোনা মহামারীর কারণে বেকারত্বে বেড়েছে সামাজিক অপরাধ। পাশাপাশি বেড়েছে সামাজিক অস্থিরতা। গৃহকর্মীরাও হয়ে উঠছে ভয়ংকর। তাদের কাছেও নিরাপদ থাকছে না শিশুরা। রাস্তায় ছিনতাইকারীরাও আগের চেয়ে অনেকটা বেপরোয়া। প্রতারণা, চুরি, ডাকাতি, ধর্ষণ ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে পুলিশ ও র্যাবকে। প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়ে সর্বস্ব হারানোর ঘটনা ঘটছে অহরহ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারের হাইকমান্ড থেকে সম্প্রতি বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে পুলিশসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থাকে। মহামারীর সময়ে চাঁদাবাজির ঘটনাও ঘটেছে একাধিক। এমনকি শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নামে চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসী শাহাদাত ও আরমান পরিচয় দিয়ে রূপালী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের কাছে চাঁদা দাবি করা হয়েছিল।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী-২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ১৭১৮টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। তারমধ্যে ৯৮৬টি মামলা হয়েছে। নারী ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১৬২৭টি। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ১১৪০টি। ধর্ষণের কারণে মৃত্যু ঘটেছে ৫৩টি। স্বামী কর্তৃক স্ত্রী খুনের ঘটনা ঘটেছে ২৪০টি। গৃহকর্মী নির্যাতন হয়েছে ৪৫টি। তারমধ্যে ৩ জন মারা গেছে। আর এ সময়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮ জন। নির্যাতন সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন ২ জন। ২০২১ সালেও একই ধরনের অপরাধ বেড়েছে বলে জানা গেছে। গত বছর ঢাকায় ২১টি ডাকাতি, ১৭৬টি দস্যুতা, ২১৯টি হত্যাকান্ড-, ৫৬৯টি ধর্ষণ, ২১৯৮টি নারী ও শিশু নির্যাতন, ৪৪টি অপহরণ, ৫৪ জন পুলিশ আক্রান্ত, ৬৪৮টি সিঁধেল চুরি, ১২১৭টি গাড়ি চুরি, ১২ হাজার ৮৪৬টি অস্ত্র ও বিস্ফোরক-মাদকসহ মামলা হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত প্রায় একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তারা আরও বলেছেন, ঢাকার বাহিরেও একই অবস্থা। তারমধ্যে সিএমপিতে বেশি অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। কয়েকজন পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, করোনায় অপরাধ বেড়েছে তা সত্য। তবে অপরাধ রোধ করতে সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বিশেষ নির্দেশনা পাঠিয়েছে। এমনকি পুলিশের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। দিনে-রাতে পুলিশের টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে কয়েকগুণ।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছি। করোনার মধ্যে পুলিশ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে। এই সময়ে কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ অপরাধীদের গ্রেপ্তার করছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, করোনায় একদিকে অপরাধ বাড়ছে আরেক দিকে জামিন বেড়েছে। আমরা অপরাধীদের গ্রেপ্তার করছি। পরে আদালত তাদের কারাগারে পাঠাচ্ছে। করোনায় অপরাধ ঠেকাতে পুলিশের সবকটি রেঞ্জের ডিআইজি, মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, জেলা পুলিশ সুপারদের বেশ কিছু নির্দেশনা পাঠিয়েছেন আইজিপি। যেসব এলাকায় অপরাধ বাড়বে সংশ্লিষ্ট কর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। তিনি আরও বলেন, গতকালও আইজিপি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি বৈঠক করেছেন। বৈঠকে সম্প্রতি কিছু হত্যাকান্ডের ধরন নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছে। তারপরও পুলিশ যেকোনো অপরাধের বিষয়ে সতর্ক আছে।
গত রবিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর তেজগাঁওয়ে খোদ পরিকল্পনামন্ত্রীর মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়েছে ছিনতাইকারীরা। এই ঘটনায় তোলপাড় চলছে প্রশাসনে। এখনো মোবাইল সেটসহ ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। গত সোমবার রাজধানীর কলাবাগানের একটি ফ্ল্যাট থেকে কাজী সাবিরা রহমান লিপি (৪৭) নামের এক চিকিৎসকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার পিঠে ও গলায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন আছে। তাকে হত্যার পর লাশ পুড়িয়ে ফেলার চেষ্টা করেছিল দুর্বৃত্তরা। এই ঘটনায় এখনো মূল ঘাতককে আইনের আওতায় আনতে পারেনি পুলিশ। ২৭ মে রাজধানীতে কদমতলী ও বঙ্গবাজারে সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বে খুন হয়েছে কিশোর ইয়াসিন আরাফাত ও আখের রস ও তরমুজ বিক্রেতার মধ্যে বিরোধে খুন হয়েছেন তরমুজ বিক্রেতা মো. সেলিম। দক্ষিণখানে মসজিদের ইমাম ও তার প্রেমিকা মিলে আজহার নামে এক ব্যক্তিকে হত্যা করে লাশ ৬ টুকরা করে মসজিদের পানির ট্যাংকিতে লুকিয়ে রাখে।
দেড় মাসে ৫১ হাজারের বেশি হাজতির জামিন : সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, গত ১২ এপ্রিল থেকে ৩১ কার্যদিবসে (৩০ মে পর্যন্ত) সারা দেশের অধস্তন আদালতগুলোতে ৯৮ হাজার ১৮৯টি ফৌজদারি মামলায় ভার্চুয়াল শুনানির মাধ্যমে ৫১ হাজার ৫৮৪ জন হাজতি জামিন পেয়ে বিভিন্ন জেলার কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। জামিনপ্রাপ্তদের মধ্যে ৭৫৯ জন শিশু রয়েছে। আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত শিশুদের কারাগারে না রেখে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে রাখা হয়। সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে গাজীপুরের টঙ্গী ও কোনাবাড়ী এবং যশোরে তিনটি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র রয়েছে। তারমধ্যে টঙ্গী ও যশোরের কেন্দ্র দুটি বালক শিশুদের জন্য নির্ধারিত। করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের মধ্যে মানুষের চলাচল ও কার্যক্রমের ওপর গত ৫ এপ্রিল থেকে সরকার ঘোষিত বিধিনিষেধের পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গত ১২ এপ্রিল থেকে দ্বিতীয় দফায় সারা দেশে অধস্তন আদালত এবং ট্রাইব্যুনালে শারীরিক উপস্থিতি ছাড়া ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে জামিন শুনানি হচ্ছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ এপ্রিল অধস্তন আদালতগুলোতে ১ হাজার ৬০৪ জন, ১৩ এপ্রিল ৩ হাজার ২৪০ জন, ১৫ এপ্রিল দুই হাজার ৩৬০ জন, ১৮ এপ্রিল ১ হাজার ৮৪২ জন, ১৯ এপ্রিল ১ হাজার ৬৩৫ জন, ২০ এপ্রিল ১ হাজার ৫৭৬ জন, ২১ এপ্রিল ১ হাজার ৩৪৯ জন, ২২ এপ্রিল ১ হাজার ৫৯২ জন, ২৫ এপ্রিল ১ হাজার ৮৩৯ জন, ২৬ এপ্রিল ১ হাজার ৫৯৩ জন, ২৭ এপ্রিল ১ হাজার ৩৯৫ জন, ২৮ এপ্রিল ১ হাজার ৪২২ জন, ২৯ এপ্রিল ১ হাজার ৪১২ জন, ২ মে ১ হাজার ৭২১ জন, ৩ মে ১ হাজার ৭১৪ জন, ৪ মে ১ হাজার ৫৩৬ জন, ৫ মে ১ হাজার ৪৪৭ জন, ৬ মে ৩ হাজার ৯১৭ জন, ৯ মে ২ হাজার ৬৪২ জন, ১১ মে ৩ হাজার ১৫০ জন, ১২ মে ২ হাজার ৪১৮ জন, ১৬ মে ৫৮৬ জন, ১৭ মে ৮৪৭ জন, ১৮ মে ৯৯৮ জন, ১৯ মে ৯৭৮ জন, ২০ মে ১ হাজার ২৫৩ জন, ২৩ মে ১ হাজার ৭২২ জন, ২৪ মে ১ হাজার ৩৯৯ জন, ২৫ মে ১ হাজার ২৯৭ জন এবং ২৭ মে ১ হাজার ৪০৭ জন, ৩০ মে ১ হাজার ৬৭৯ জন হাজতি জামিন পেয়ে দেশের বিভিন্ন জেলার কারাগার থেকে মুক্তি পান।
ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতের প্রধান কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আবু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কারাগারে থাকা হাজতিদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত লঘু অপরাধের মামলার আসামিদের জামিন শুনানি হচ্ছে এবং অনেকে জামিন পাচ্ছেন। অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রে যারা গুরুতর অসুস্থ এবং দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে রয়েছেন তাদেরও অনেকের জামিন হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘আদালতের নিয়মিত কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বিচারকাজ হচ্ছে না। মামলার রায় হচ্ছে না। রায় হলে আসামি যেমন সাজা পান তেমনি অনেকে খালাসও পান। ফলে কারাগারে অনেকেই বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন। আবার যে সংখ্যক আসামি জামিনে বেরিয়ে যাচ্ছেন নানা অপরাধের অভিযোগে প্রায় সেই সংখ্যক আসামিকে কারাগারে পাঠানো হচ্ছে। যে কারণে কারাগারে বন্দির চাপ কমছে না।’
মাত্র দেড় মাসের কিছু বেশি সময়ে ভার্চুয়াল আদালতে প্রায় ৫০ হাজারের বেশি হাজতির জামিন এবং কারামুক্তি একটি বিশাল ব্যাপার মন্তব্য করে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও আইন সাময়িকী ঢাকা ল’ রিপোর্টস (ডিএলআর) এর সম্পাদক অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনাকালীন এই দুঃসময়েও বিচার বিভাগ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। মানুষ বাড়ছে। সংগত কারণে মানুষের অপরাধ প্রবণতাও বেড়েছে। করোনাকালের এই সংকটেও অপরাধ থেমে নেই। যে কারণে উল্লেখ করার মতো জামিনের আবেদন হচ্ছে। আদালতগুলো মামলার গুরুত্ব (মেরিট) অনুযায়ী জামিন দিচ্ছে কিংবা আবেদন না-মঞ্জুর হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘করোনাকালীন সংকট, দক্ষ তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশনের ঘাটতির কারণে আসামিদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে কষ্ট হচ্ছে। সব মিলিয়ে এই সমস্যা হচ্ছে। আমি মনে করি কারাবন্দিদের কষ্ট লাঘবে আরও কারাগার ও জনবল বাড়ানো উচিত। সঙ্গে কারাগারকে আরও বেশি সংশোধনাগারে রূপান্তরিত করা উচিত।’
কারা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আদালতের নির্দেশে হাজতিদের মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। অপরদিকে, প্রতিদিনই নতুন হাজতির সংখ্যা বাড়ছে। এই ক্ষেত্রে আমাদের কিছুটা হিমশিম খেতে হচ্ছে। তারপরও বন্দিদের বিষয়ে সতর্ক আছি।