বঙ্গবন্ধুর ৪ খুনির খেতাব বাতিল জিয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত পরে

জিয়াউর রহমানের ‘বীরউত্তম’ খেতাব বাতিলের বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী ও আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির আহ্বায়ক আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছেন, ‘তার (জিয়াউর রহমান) বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তথ্য-উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করতে হবে। তার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে প্রমাণ সাপেক্ষে নিতে হবে। কারণ বিষয়টি আদালতে চ্যালেঞ্জ হতে পারে। তখন সেখানে প্রমাণ করতে হবে।’ তবে বঙ্গবন্ধুর চার খুনির খেতাব বাতিল করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

গতকাল বুধবার আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

সভা শেষে মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত চার খুনি শরিফুল হক ডালিম, নূর চৌধুরী, রাশেদ চৌধুরী  ও মোসলেহ উদ্দিনের রাষ্ট্রীয় খেতাব ও পদক বাতিলের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। এখন আমরা গেজেট আকারে প্রকাশ করব। গেজেট প্রকাশ করলে আপনারা পাবেন। এর আগে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’

সংবিধান লঙ্ঘন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনিদের দেশত্যাগে সহায়তা এবং তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের অভিযোগে জিয়াউর রহমানের ‘বীরউত্তম’ খেতাব বাতিলেরও সুপারিশ করেছিল জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা)। এ বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা হয়তো জানি ও বিশ্বাস করি তিনি (জিয়াউর রহমান) বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের কথায়ও হয়তো এসেছে। তবে অনুধাবন করা এক জিনিস, তথ্য-উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করা আরেক জিনিস। তার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে প্রমাণ সাপেক্ষে করতে হবে। এর জন্য আমরা একটা সাব-কমিটি করেছি এ বিষয়গুলো নিয়ে প্রতিবেদন দিতে।’ কমিটির রিপোর্ট এখনো হাতে পাননি বলে জানান তিনি।

মন্ত্রীর মোবাইল ছিনতাই, নিঃসন্দেহে উদ্বেগের কথা : পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নানের ফোন ছিনতাইয়ের বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছেন, ‘মন্ত্রীর মোবাইল নিতে সাহস পেলে, তাহলে সাধারণ মানুষের অবস্থা কী? নিঃসন্দেহে এটা উদ্বেগের কথা।’

গত ৩০ মে পরিকল্পনা কমিশন থেকে বিজয় সরণি যাওয়ার পথে গাড়ির জানালা দিয়ে পরিকল্পনামন্ত্রীর মোবাইল ফোন ছিনতাই হয়। এ বিষয়ে জিডি হলেও পুলিশ এখনো মোবাইল উদ্ধার করতে পারেনি।

ব্রিফিংয়ের শুরুতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।’

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো বলছেন, কিন্তু পরিকল্পনামন্ত্রীর ফোন ছিনতাই হয়েছে এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মোজাম্মেল হক বলেন, ‘এটা একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। সামগ্রিক পরিস্থিতির প্রতিফলন নয়। আমরা বিক্ষিপ্তভাবে অনেক অপরাধের কথাও আলোচনা করেছি।’ তিনি বলেন, ‘দুর্বৃত্তায়ন, হত্যা, খুন সব দেশেই হচ্ছে। এর অর্থ এই নয় যে, সামগ্রিক চিত্র। আপনি যেটা বলেছেন সুনির্দিষ্ট একটা অভিযোগ। যেটা (মন্ত্রীর মোবাইল ছিনতাই) বলেছেন, অবশ্যই দুঃখজনক। এ বিষয়ে পুলিশকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে, এগুলোর তো একটা চক্র থাকে। নিয়ে কোথাও বিক্রি করে।’

‘অভিযোগ ছাড়া ভবিষ্যতে হেফাজতের কাউকে গ্রেপ্তার করা হবে না’ : সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া হেফাজতে ইসলামের কোনো নেতাকর্মীকে ভবিষ্যতে গ্রেপ্তার করা হবে না বলে জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভাপতি ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। হেফাজতে ইসলাম নিয়ে আলোচনা হয়েছে। খুবই নগণ্য সংখ্যক, কয়েকজন হাতেগোনা... গোয়েন্দা সংস্থা চিহ্নিত করেছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি, ভবিষ্যতেও কাউকে গ্রেপ্তার করা হবে না বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। অপরাধের সঙ্গে যারা জড়িত, প্রমাণ হলে ব্যবস্থা আমরা ব্যবস্থা নেব।’

মন্ত্রী বলেন, ‘কোনো ভুল মেসেজ যদি জাতির সামনে গিয়ে থাকে বোধহয় আলেম-ওলামাদের গ্রেপ্তার-হয়রানি করা হচ্ছে, তা সঠিক নয়। কোনো অবস্থায় সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া গ্রেপ্তার করা হবে না, সেরকম সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অপরাধের বিচার হবে, অপরাধী হিসেবে। কোনো দলীয় বা সম্প্রদায়ের পরিচয়ে আইনের অপব্যবহার না হয়, সে ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সচেতন থাকতে বলা হয়েছে।’ মোজাম্মেল হক বলেন, ‘কিছু বিদেশি নাগরিকের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। তারা দেশে যেতে পারছেন না। নানা অজুহাত দেখাচ্ছেন। বিমান বন্ধ, কেউ বলছেন টাকা নেই। কিন্তু গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, তাদের অধিকাংশই ক্রাইমের (অপরাধ) সঙ্গে জড়িত। তাদের আইনের আওতায় এনে সেইফ জোনে রাখা বা যদি টাকা না থাকে সরকারিভাবে টিকিট সংগ্রহ করে তাদের দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।’

অনলাইনে পণ্য বিক্রির ‘অস্বাভাবিক অফার’ নিয়ে উদ্বিগ্ন সরকার : মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী বলেছেন, ‘অনলাইনে পণ্য বিক্রির ‘অস্বাভাবিক অফার’ নিয়ে সরকার উদ্বিগ্ন। প্রচারণা রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ বিষয়ে নজর রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘অনলাইন ব্যবসা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন, এটা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরা লক্ষ করেছি, একটা ফ্রিজের দাম দেড় লাখ টাকা, কিন্তু অফার দেওয়া হচ্ছে আমি ৮০ কিংবা ৭৫ হাজার টাকায় দেব। হয়তো ১০-২০ জনকে দেয়ও। ৫০০ মানুষ আবেদন করবে, তাদের বলবে অমুক দিন দেব। আমরা আশঙ্কা করছি, হয়তো সে গা ঢাকা দেবে। যেটা যুবক (যুব কর্মসংস্থান সোসাইটি) করেছে।’

মন্ত্রী বলেন, ‘এটা আইন দিয়ে নিয়ন্ত্রণের জন্য আমরা আইন মন্ত্রণালয়কে বলেছি, একই সঙ্গে পুলিশ বাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এমন অস্বাভাবিক কথা যারা বলে তারা কারা? তাদের সুনির্দিষ্ট ডেটা রাখা, তারা যাতে টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়ে যেতে না পারে। অগ্রিম সতর্ক থাকার জন্য বলা হয়েছে। তারা যেন দেশ ছেড়ে যেতে না পারে।’

মোজাম্মেল হক বলেন, ‘অনেকে ২০ শতাংশ হারে সুদ দেওয়ার কথা বলে। এরা হয়তো ২০০-৩০০ মানুষকে দেবে, বাকিটা নিয়ে গা ঢাকা দেবে, আমরা এটা আশঙ্কা করছি। এ ধরনের অস্বাভাবিক কথা বলে যারা বিজ্ঞাপন দেয়, পুলিশ যেন তাদের নজরদারিতে আনে। সরকারি রেডিও-টেলিভিশনের মাধ্যমে আমরা এ বিষয়ে জনগণকেও সতর্ক করতে চাচ্ছি যে, এসব ফাঁদে পা দেবেন না।’

ভাসানচরে অনুমতি ছাড়া কেউ যেতে পারবে না : আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছেন, ‘এখন থেকে ভাসানচর এলাকায় কাউকে যেতে হলে, সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে। সাংবাদিকরা যেতে চাইলে তাদেরও অনুমতি নিয়ে যেতে হবে।’ মন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে ১৮ হাজার রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে নেওয়া হয়েছে। সেখানে তাদের জীবনযাত্রা নিয়ে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু গত দুদিন যাবৎ সেখানে তারা (রোহিঙ্গা) একটা পরিস্থিতি তৈরি করেছে। তারা দাবি করছে, ৫ হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়ার জন্য। ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধা দেওয়ার জন্য। কিন্তু পৃথিবীর কোনো দেশে কোনো শরণার্থী বা আশ্রয় প্রার্থীদের নাগরিক সুবিধা দেওয়া হয় না। শরণার্থীদের শুধু আশ্রয় দেওয়া হয়। তাদের দাবি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না, মেনে নেওয়া হবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘কক্সবাজার এলাকায় থাকা রোহিঙ্গাদের অনেকেই মাদক ব্যবসাসহ নানা অনৈতিক কাজের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। এসব বিষয়ে কঠোর নজরদারির জন্য ক্যাম্পের চারপাশে কাঁটাতারের বেড়ার কাজ চলছে। সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হচ্ছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে আশা করি এসব কাজ শেষ হয়ে যাবে।’

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর সভাপতিত্বে সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম, প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমদ, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীসহ কমিটির অন্য সদস্যরা উপস্থিত (ভার্চুয়ালি ও সশরীরে) ছিলেন।