মেহেরপুরে স্ট্যাম্প জালিয়াতি

সপ্তাহে সরকার পায় ১০ লাখ সিন্ডিকেটের পকেটে ১ কোটি!

মেহেরপুরে ১৪ কোটি টাকার স্ট্যাম্প জালিয়াতির আলোচিত ঘটনায় মামলা হলেও এখনো অধরা প্রধান অভিযুক্তরা। একই সঙ্গে থেমে নেই স্ট্যাম্প জালিয়াত চক্রের কারবার। জেলায় ভূমি রেজিস্ট্রিসংক্রান্ত কাজে ব্যবহৃত বৈধ নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প বিক্রি হয়ে সপ্তাহে সরকারের গড়ে রাজস্ব আয় হয় ১০ লাখ টাকা। অথচ জালিয়াতির মাধ্যমে অবৈধ নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প বিক্রি করে প্রতি সপ্তাহে ১ কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র। ফলে শুধু মেহেরপুর জেলা প্রশাসকের ট্রেজারি শাখা থেকে প্রতি মাসে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।

অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ এ কাজকে ‘বৈধ’ করতে কিছু সরকারি কর্মকর্তা, প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধি ও ব্যক্তিদের মাসোহারা দিতে হয়। ক্ষমতার পালাবদল হলে বদলায় এ তালিকা। কিন্তু বদলায়নি সিন্ডিকেট। রফিকুল, সুফল ও তহমিনাসহ সাত-আটজনের এ সিন্ডিকেট একযুগ ধরে নিয়ন্ত্রণ করছে ট্রেজারি শাখা। জালিয়াতি করে শত কোটিপতি হওয়া এদের অধিকাংশই মেহেরপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের কর্মচারী।

যেভাবে রাজস্বের কোটি টাকা যাচ্ছে সিন্ডিকেটের পকেটে : সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি ও কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মেহেরপুর জেলায় জমি বেচাকেনা ও চুক্তিনামা কাজে প্রতি সপ্তাহে গড়ে এক থেকে দেড় কোটি টাকার স্ট্যাম্প ব্যবহৃত হয়। সেই হিসাবে শুধু নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প বিক্রি করে মাসে ৪ থেকে সাড়ে ৪ কোটি টাকার রাজস্ব আয় হওয়ার কথা। অথচ ট্রেজারি শাখা থেকে প্রতি সপ্তাহে গড়ে মাত্র ১০ লাখ টাকার স্ট্যাম্প ও রেভিনিউ টিকিট বিক্রি হয়। তাহলে বাকি ৯০ লাখ টাকার স্ট্যাম্প কোথা থেকে আসে বা কীভাবে বিক্রি হয় সে প্রশ্নের উত্তর নেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে।

মেহেরপুরের জেলা রেজিস্ট্রার সফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা বেশি এই জেলার মানুষের। তাই জমি বেচাকেনা বেশি হয়। সপ্তাহে গড়ে এক কোটি টাকার বেশি দলিল হয়।’ অথচ ট্রেজারি অফিসার (এনডিসি) রাকিবুল ইসলামের দেওয়া তথ্যমতে, ট্রেজারির মাধ্যমে সপ্তাহে গড়ে মাত্র ১০ লাখ টাকার স্ট্যাম্প বিক্রি হয়।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভূমি রেজিস্ট্রির একটি দলিলের মোট ১০ পাতার মধ্যে সবচেয়ে ওপরের ও সবচেয়ে নিচের দুই পাতা বৈধ স্ট্যাম্পের হয়। বাকিগুলো চোরাই পথে আসা অবৈধ স্ট্যাম্প। অর্থাৎ ১০ পাতার একটি দলিলে সরকার রাজস্ব পায় মাত্র ২০০ টাকা (প্রতিটি ১০০ টাকা মূল্যমানের দুটি স্ট্যাম্প) আর সিন্ডিকেটের পকেটে যায় ৮০০ টাকা। এভাবে সিন্ডিকেট সদস্যরা প্রতি মাসে সরকারি রাজস্বের ৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। আগে এসব কাজে জাল স্ট্যাম্প ব্যবহার হতো। ঝুঁকি নিয়ে গোপন স্থানে মেশিন বসিয়ে তৈরি হতো জাল স্ট্যাম্প। তবে এখন সরিষার মধ্যেই ভূত থাকায় জাল স্ট্যাম্প আর তৈরি করা লাগে না। এখন সরকারি প্রকৃত স্ট্যাম্পই ডুপ্লিকেট (একই ক্রমিক নম্বরের বিপরীতে জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি একাধিক স্ট্যাম্প) হয়ে চোরাই পথে কমমূল্যে বিক্রি হয়ে ঢুকে পড়ছে দলিলে। সরকারি চাহিদাপত্র ও ভুয়া চাহিদাপত্র দুভাবে কেন্দ্রীয় ডাক ভবন থেকে পাচার হয় এই স্ট্যাম্প। যা মেহেরপুর হয়ে বিভিন্ন জেলায় যায়। পরে বৈধ-অবৈধ সব স্ট্যাম্প মিলেমিশে ভেন্ডারদের মাধ্যমে বাজারজাত হয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে দলিলে।

জানা গেছে, সরকারি ডিওর স্ট্যাম্প ডাক ভবনের বিভিন্ন শাখা হতে অনুমোদন হয়ে ট্রেজারিতে আসতে এক মাস সময় লাগে। কিন্তু ভুয়া চাহিদাপত্রের মাধ্যমে অবৈধ ডুপ্লিকেট স্ট্যাম্প পেতে সময় লাগে মাত্র সাত-আট দিন। সরকারি ডিওর স্ট্যাম্প বিনা খরচায় জেলা প্রশাসকের ট্রেজারি শাখায় পৌঁছে যায়, যা রেজিস্টারভুক্ত হয়ে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে ভেন্ডারদের কাছে বিক্রি হয়। কিন্তু ভুয়া চাহিদাপত্রের স্ট্যাম্প পেতে ডাক ভবনের অসাধু চক্রকে টাকা আগাম পরিশোধ করা লাগে। এ ক্ষেত্রে ডুপ্লিকেট স্ট্যাম্পের গায়ে উল্লিখিত দামের মাত্র ৩০ শতাংশ টাকা ঢাকায় গিয়ে আগাম পরিশোধ করতে হয়। এভাবে যেকোনো মূল্যের স্ট্যাম্প জালিয়াত সিন্ডিকেট কিনতে পারে। একইভাবে আলোচিত ১৪ কোটি টাকার সেই স্ট্যাম্প কিনতে সিন্ডিকেট সদস্যদের গুনতে হয়েছে ৪ কোটি ২০ লাখ টাকা।

মেহেরপুর সদরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্ট্যাম্প বিক্রেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ১০ হাজার টাকার ট্রেজারি চালান করে ট্রেজারি শাখায় গেলে ওরা (সিন্ডিকেট সদস্য) আমাদের হাতে ৫০ হাজার টাকার স্ট্যাম্প ধরিয়ে দেয়। কীভাবে দেয় জানি না।’ অর্থাৎ বাকি ৪০ হাজার টাকার স্ট্যাম্প ভুয়া চাহিদাপত্রের মাধ্যমে আসা ডুপ্লিকেট স্ট্যাম্প। গত ৬ মে ভুয়া চাহিদাপত্রে ১৪ কোটি টাকার স্ট্যাম্প মেহেরপুর পৌঁছেছিল। কিন্তু সিন্ডিকেট সদস্যদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ওই চালান আসার খবর ফাঁস হয়ে যায়।

অভিযোগ রয়েছে, স্ট্যাম্প জালিয়াতির মাধ্যমে রাজস্ব চুরির বড় ক্ষেত্র ভূমি রেজিস্ট্রি অফিস। আর এজন্য জেলা রেজিস্ট্রারকে বড় অঙ্কের মাসোহারা দিতে হয়। গত ১ ফেব্রুয়ারি জেলা রেজিস্ট্রি অফিসে হানা দিয়ে কার্যালয়ের এক ঝাড়ুদারের পকেট থেকে ঘুষের ৭৫ হাজার এবং রেজিস্ট্রারের ড্রয়ার থেকে ২ লাখ টাকা জব্দ করেছিল দুদক কর্মকর্তারা। দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করলে জেলা রেজিস্ট্রার উত্তর না দিয়েই মোবাইল ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে খুদে বার্তা পাঠিয়ে এবং একাধিকবার কল করেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে স্ট্যাম্প জালিয়াতি চক্রে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক মনসুর আলম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভুয়া চাহিদাপত্রের স্ট্যাম্প কীভাবে এলো সেটা ডাক বিভাগের বিষয়। তবে জাল জালিয়াতির মাধ্যমে সৃজিত এ স্ট্যাম্পগুলো তছরুপ করার অপচেষ্টা ছিল। এ ঘটনায় নাজির রফিকুলকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত চলছে। এখন মামলা হয়েছে। বেরিয়ে আসবে সবকিছু।’

সবশেষ চিত্র : অভিযোগ রয়েছে, স্ট্যাম্প জালিয়াতি করে রাজস্ব চুরি ও ফাঁকির কাজে মেহেরপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের বাইরেও অনেকে জড়িত আছেন। এসব তদন্ত ছাড়াও রফিকুল, তহমিনা ও সুফলের শত কোটিপতি হওয়ার রহস্যও খুঁজছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। অল্প কয়েক বছরের ব্যবধানে শত কোটিপতি হওয়া এসব ব্যক্তি তথ্য গোপন করে আয়কর দেন বলে অভিযোগ আছে। এ প্রসঙ্গে মেহেরপুর জেলা আয়কর অফিসের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, রফিকুলের নামে-বেনামে একাধিক ট্রাক, বাস, ইটভাটা, পেট্রোলপাম্প, মৎস্যবিল, শহরে ও গ্রামে বাড়িসহ শতবিঘা জমি, ফ্যাক্টরি আছে। তার প্রথম স্ত্রী মাহফুজা খাতুন বছরে ২ লাখ, ছেলে ৩ লাখ এবং দ্বিতীয় স্ত্রী তহমিনা খাতুন ৬-৭ লাখ টাকা আয়কর দেন। অথচ রফিকুলের বাৎসরিক আয়কর মাত্র ৩ হাজার টাকা। আর সুফল হোসেনের আয়কর ফাইলই নেই। জালিয়াত চক্রের এসব সদস্যদের রক্ষায় এলাকার রাঘববোয়ালরা এখন মরিয়া। তারা অর্থ ব্যয় করে ও হুমকি দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের কৌশল খুঁজতে এক নেতার বাড়িতে সম্প্রতি বৈঠকও করেছেন।

১৪ কোটি টাকার স্ট্যাম্প জালিয়াতি মামলার প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তা রাসুল সামদানী আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওই ঘটনার সঙ্গে অনেকেই জড়িত। তদন্তে সবই বেরিয়ে আসবে। মামলাটি এখন সিআইডিতে গেছে।’

পরে মামলাটি তদন্তের বর্তমান দায়িত্বে থাকা সিআইডির কর্মকর্তা আলী আকবরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘তদন্ত চলছে। অপরাধ ও অর্থবিত্তের সঙ্গে যুক্ত সবাইকেই খুঁজে বের করা হবে।’