সুস্থ হয়েও মৃত্যু বাড়ছে করোনা জটিলতায়

চট্টগ্রামে করোনামুক্ত হওয়ার পরও অনেকেই করোনা-পরবর্তী (পোস্ট কভিড) শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। এর মধ্যে বয়স্ক রোগীদের অবস্থা বেশি জটিল। যাদের মধ্যে কারও কারও মৃত্যুও হচ্ছে। পোস্ট কভিডে আক্রান্তদের ফুসফুসের সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি। মোট করোনাক্রান্তদের মধ্যে ১০ শতাংশ রোগীই করোনা-পরবর্তী বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছেন বলে জানিয়েছেন জেলার সিভিল সার্জন।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পোস্ট কভিড সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি, তাই ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের নিয়মিত ও বাধ্যতামূলক ফলোআপ করালে পোস্ট কভিডজনিত মৃত্যু অনেকাংশে কমবে।

জানা গেছে, চট্টগ্রামে করোনা আক্রান্ত অনেক রোগী নেগেটিভ রিপোর্ট আসার পরও পরবর্তী বিভিন্ন জটিলতায় মারা যাচ্ছেন। চট্টগ্রামে এক দিনের ব্যবধানে দুই চিকিৎসকের মৃত্যু হয়েছে করোনা-পরবর্তী জটিলতায়। যদিও এমন জটিলতায় কতজন মারা গেছে তার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই কোথাও। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব হিসাব রাখা গেলে পোস্ট কভিডে মৃত্যুর সঠিক চিত্র উঠে আসত।

সর্বশেষ গত ৩০ মে রবিবার রাতে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ডা. ফরিদুল আলম (৬৭)। করোনা-পরবর্তী বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে এ চিকিৎসকের মৃত্যু হয়। তিনি চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১৭তম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন তিনি।

চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের পরিচালক ডা. নুরুল হক বলেন, ‘প্রায় দুই মাস আগে ডা. ফরিদুল করোনায় আক্রান্ত হন। মাসখানেক পর করোনা নেগেটিভ আসে। কিন্তু পোস্ট কভিডে শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। উনার ফুসফুসের সংক্রমণ ছিল বেশি। করোনা-পরবর্তী বিভিন্ন জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা গেছেন।’

এর আগে গত ২৮ মে রাতে নগরীর সিএসসিআর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) চট্টগ্রাম জেলা শাখার সাবেক সভাপতি ডা. গোলাম মর্তুজা হারুন (৭০)। এর আগে গত ১২ মে তার করোনা শনাক্ত হয়। এর ১০ দিন পর ২২ মে করোনা নেগেটিভ রিপোর্ট আসে। বিএমএ চট্টগ্রামের সভাপতি ডা. মুজিবুল হক খান বলেন, ‘করোনা-পরবর্তী শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন ডা. গোলাম মর্তুজা। উনার ফুসফুসের সংক্রমণ বেশি ছিল, কিডনি জটিলতায়ও ভুগছিলেন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গত ২৭ মে তাকে সিএসসিআর হাসপাতালে আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।’

শুধু মৃত্যু নয়, করোনায় আক্রান্তদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, রিপোর্ট নেগেটিভ আসার পরও রোগীরা বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। এর মধ্যে অধিকাংশই ভুগছেন দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক দুর্বলতায়। তাদের মধ্যে ঘন ঘন জ¦র, মাথাব্যথা, ফুসফুসের সংক্রমণ বাড়ছে। কভিড নেগেটিভ রিপোর্ট আসার পর কারও শুকনো কাশি, কারও বুকে ব্যথা কিংবা শ্বাসকষ্ট বাড়ছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলার সাবেক সিভিল সার্জন মুক্তিযোদ্ধা ডা. সরফরাজ খান চৌধুরী বাবুল বলেন, ‘করোনা-পরবর্তী জটিলতা এখন দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এর সঙ্গে নিত্যনতুন আরও নানা জটিলতা বেড়ে যাচ্ছে। মাথাব্যথা, গলাব্যথা, শ্বাসকষ্ট, বেশিক্ষণ হাঁটলে হাঁপিয়ে ওঠা, দীর্ঘদিন পর স্বাদ-গন্ধ ফিরে আসা এবং অনিদ্রাজনিত সমস্যায় বেশি ভুগছে।’

প্রবীণ এ চিকিৎসক আরও বলেন, ‘কভিড-পরবর্তী জটিলতায় ফুসফুসের সংক্রমণ বেশি হচ্ছে। বর্তমানে অনেক শিশু পোস্ট কভিড অসুস্থতা নিয়ে ভুগছে। গত দুদিনে ছয়জন শিশুরোগীকে চিকিৎসা দিয়েছি, যারা করোনা-পরবর্তী জটিলতায় শ্বাসকষ্টে ভুগছে। সংক্রমণের পর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের ঝুঁকি খুব বেড়ে যায়। তাই কভিড-পরবর্তী রোগীদের কোনো ধরনের জটিলতা সৃষ্টির আগেই চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।’

গতকাল সোমবার নগরীর বিভিন্ন ল্যাব ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার ঘুরে দেখা গেছে, করোনা-পরবর্তী বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে এসেছে রোগীরা। নগরীর সতীশ বাবু লেন থেকে আসা ৬০ বছর বয়সী বিশু তালুকদার বলেন, ‘গত এপ্রিলে কভিডমুক্ত হই। এরপর থেকে প্রেসার নিয়ন্ত্রণে নেই। নতুন করে হার্টের ডাক্তার দেখাতে হচ্ছে। পাশাপাশি শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেছে।’ মো. বখতেয়ার নামে আরেকজন বলেন, ‘আট বছর বয়সী আমার ছেলের কাশি কমছে না। অথচ গত বছর কভিডমুক্ত হয়েছে। কিছুদিন আগেও পরীক্ষা করিয়েছি, নেগেটিভ এসেছে। এখন চিকিৎসক বলছে, এটি দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা। ধীরে ধীরে সব ঠিক হবে।’

চসিক করোনা আইসোলেশন সেন্টারের সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক বিশ্লেষক ডা. সুশান্ত বড়ুয়া বলেন, ‘করোনা-পরবর্তী শারীরিক জটিলতায় যারা ভুগছে তাদের মধ্যে বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। করোনা-পরবর্তী জটিলতায় যারা মারা যাচ্ছে তাদের বেশিরভাগই মূলত আগে থেকেই নানা ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত। তাই অন্যদের চেয়ে অধিকমাত্রায় তাদের সতর্ক থাকা জরুরি। পোস্ট কভিডে অনেকের ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ছে, আবার অনেকের উচ্চরক্তচাপের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। যেসব বয়স্কের জটিল রোগ ছিল সেসবের উপসর্গ আরও বেড়ে যাচ্ছে। এজন্য সচেতনতা ও নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।’

চট্টগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ‘করোনা-পরবর্তী জটিলতা শরীরে অনেক বছর পর্যন্ত থাকতে পারে। এসব রোগীকে নিয়মিত ফলোআপে রাখতে হবে। চমেক ও জেনারেল হাসপাতালে পোস্ট কভিড ইউনিটও আছে। কভিড থেকে মুক্ত হয়েছে বলে নিরবচ্ছিন্ন লাগামহীনভাবে চলাফেরা করার সুযোগ নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘ফুসফুসে যে সংক্রমণ এটি দীর্ঘস্থায়ী হয়। তাই কভিড নেগেটিভ হওয়ার পরও নিয়মিত চেকআপে থাকতে হবে। কেননা এসব রোগীর শারীরিক অবস্থা যেকোনো সময় পরিবর্তন হয়।’

করোনা আক্রান্তদের কত শতাংশ পোস্ট কভিডে ভুগছে এমন প্রশ্নের উত্তরে জেলার সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ‘চট্টগ্রামের ১০ শতাংশের কাছাকাছি রোগী করোনা-পরবর্তী জটিলতায় ভুগছে। বিশেষ করে যারা হাসপাতালে ভর্তি ছিল, আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিল এদের হারটা বেশি। চিকিৎসকের পরামর্শ সঠিকভাবে মেনে চলার বিকল্প নেই। এসব রোগীর চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি। আক্রান্তদের সেরে ওঠার পর বেপরোয়া ভাব বিপজ্জনক। মাস্ক পরা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে এবং কোনো শারীরিক জটিলতা হলেই চিকিৎসকদের পরামর্শ নিতে হবে।’