আয়-ব্যয়ের ঘাটতিকে বড় করে দেখছেন বিরোধী রাজনীতিকরা

২০২১-২২ অর্থবছরের যে বাজেট প্রস্তাবনা অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জাতীয় সংসদে তুলে ধরেছেন, তা প্রত্যাখ্যান করেছেন সরকারবিরোধী রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি, গণফোরাম, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), নাগরিক ঐক্যসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা। গতকাল বুধবার গণমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতি ও দেশ রূপান্তরকে দেওয়া তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় দলগুলোর শীর্ষ নেতারা বলেন, অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বিশাল ঘাটতির যে বাজেট প্রস্তাব করেছেন, তাতে করে ঋণের বোঝা গিয়ে পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হলেও দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণে তার সুফল জনগণ পাবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে ধনী-গরিবের বৈষম্য কমানোর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।

বাজেটের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই বাজেট গণবিচ্ছিন্ন। দেশে চলমান কভিড-১৯ মোকাবিলায় কোনো বরাদ্দ নেই। দিন আনে দিন খায় এমন লোকদের জন্য বাজেটে কিছু নেই।’

তিনি বলেন,  ‘করোনার এই মহামারীকালে নতুন অর্থবছরের জন্য রেকর্ড ঘাটতি রেখে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বাজেট দিয়েছেন। বাজেটের ছয় লাখ কোটি টাকা খরচ করতে হলে অর্থমন্ত্রীকে এক-তৃতীয়াংশই ঋণ করতে হবে; যার বোঝা গিয়ে পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে আওয়ামী লীগ সরকার দেশকে এমন একটি বাজেট উপহার দিয়েছে, যেখানে এক-তৃতীয়াংশের বেশিই হলো ঘাটতি। এ ঘাটতি পূরণে সরকার দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেবে। এভাবে ঋণের বাড়তি বোঝা জনগণের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে সরকার।’ তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে আওয়ামী লীগ সরকার দেশকে এমন একটি বাজেট উপহার দিয়েছে, যা একটি আধা মণের বাজেট। মোট বাজেটের ৩৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ, অর্থাৎ এক-তৃতীয়াংশের বেশিই হলো ঘাটতি, যা বৈদেশিক অথবা অভ্যন্তরীণ সোর্স থেকেই ঋণের মাধ্যমে পূরণ করতে হবে। বিএনপি অতীতে দেশকে বৈদেশিক ঋণনির্ভরতা থেকে বারবার বের করে আনার চেষ্টা করেছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ তাদের বিশৃঙ্খল মেগা প্রকল্প ও মেগা দুর্নীতির কারণে দেশের অর্থনীতিকে বারবার বৈদেশিক নির্ভরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এতে করে দেশের প্রতিটি শিশুর মাথায় জন্মের আগেই হাজার হাজার টাকার ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। এবারের বাজেট তারই চরম বহিঃপ্রকাশ।’

সাধারণ মানুষের জন্য সৃষ্টি হবে মহাসংকট, ড. কামাল হোসেন : বাজেটের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাজেটে রেকর্ড পরিমাণ ঘাটতি রয়েছে, যা দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিয়ে সরকার বাজেট বাস্তবায়ন করবে। এতে ঋণের বোঝা গিয়ে পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর। সাধারণ মানুষের জন্য সৃষ্টি হবে মহাসংকট। তা ছাড়া করোনা মহামারীর কারণে দেশের অনেক মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে নেমে গেছে, তাদের সহায়তায় সরকারের কোনো পদক্ষেপ বাজেটে দেখা যায়নি।’

করোনায় দারিদ্র্য সীমার নিচে নেমে যাওয়া মানুষ বাঁচানোর কোনো নির্দেশনা নেই, মান্না : গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে গতানুগতিক উল্লেখ করে বাজেট প্রত্যাখ্যান করেছেন নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না। তিনি বলেন, ‘ঋণনির্ভর ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার বাজেট দিয়েছে সরকার। বরাবরের মতোই উন্নয়ন বাজেটে অতিরিক্ত বরাদ্দ রেখে সামাজিক সুরক্ষার ব্যাপারে সরকারের অনীহা প্রকাশ পেয়েছে। করোনা মোকাবিলায় কোনো ধরনের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের নির্দেশনা নেই। উপরন্তু বেসরকারি চিকিৎসা খাতকে কর মওকুফসহ বিভিন্নভাবে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। এতে নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত এমনকি মধ্যবিত্তদের চিকিৎসা সুবিধা পাওয়ার সুযোগ আরও সীমিত করা হলো।’

মান্না বলেন, ‘অভ্যন্তরীণ উৎস, বিশেষ করে দেশীয় ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের যে লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে সরকার তাতে দেশের ব্যাংকিং খাতে তারল্যসংকট দেখা দেবে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে যাবে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি তো হবেই না; বরং অনেক মানুষ কর্মহীন হবে। করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত নিম্ন আয়ের মানুষ বাঁচানোর কোনো উদ্যোগ নেই বাজেটে। করোনায় নতুন করে দারিদ্র্য সীমার নিচে নেমে যাওয়া মানুষদের বাঁচানোর ব্যাপারে কোনো দিক নির্দেশনা নেই।’

প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক বৈষম্য নিরসনের কোনো উদ্যোগ নেই, আ স ম আবদুর রব : গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতি আ স ম রব বলেছেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা হলেও কয়েক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং বৈষম্য নিরসনসহ বর্তমান দুঃসময়ের প্রত্যাশা পূরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম হবে না। জিডিপির ১ শতাংশ বরাদ্দ দিয়ে বিরাজমান স্বাস্থ্য খাতের ঝুঁকি মোকাবিলা করতে পারবে না। প্রজাতন্ত্রের পঞ্চাশতম বাজেটে সামাজিক বৈষম্য নিরসন করার কোনো পরিকল্পনার প্রতিফলন হয়নি; বরং এ বাজেট বৈষম্য বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।’

তিনি বলেন, ‘করোনার কারণে বহু কর্মজীবী মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে এবং কয়েক কোটি মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে নেমে গেছে। বিশাল কর্মক্ষম যুবক, শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বাজেটে অগ্রাধিকার প্রদান করা হয়নি, এদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে স্থায়ী ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়নি।’

বিগত বাজেটগুলোর মতো এ বাজেটও লক্ষ্যহীন, সুব্রত চৌধুরী : প্রস্তাবিত বাজেটের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় গণফোরামের সাবেক নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেছেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেটে নতুনত্ব নেই। দেশের টাকা লুটে নিয়ে যাচ্ছে অথচ তা বন্ধে কোনো পদক্ষেপ নেই। ঋণনির্ভর এ বাজেটে কোনো চমক নেই। মেগা প্রজেক্ট করে মেগা দুর্নীতির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। দেশ ও জনগণের প্রতি এ সরকারের কোনো দরদ নেই।’

প্রস্তাবিত বাজেট জনপ্রত্যাশা পূরণ করবে না, এলডিপি : গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি আবদুল করিম আব্বাসী ও মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটকে জনবিরোধী হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করবে না। করোনা মহামারীতে মানুষের জীবন রক্ষা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে গিয়ে জীবিকার ওপর আঘাত এসেছে। অথচ সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটে সে বিষয়ে পরিষ্কার কোনো প্রস্তাবনা নেই।’

তারা আরো বলেন, “স্বাস্থ্যখাতে বিশাল বরাদ্দ এবং করোনা মোকাবেলায় ১০হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ কি আসলেই জনকল্যাণে কাজে লাগবে, নাকি দুর্নীতিবাজ ও লুটেরাদের পেটে যাবে সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। লুটপাট ও দুর্নীতি বন্ধ করতে না পারলে এই বরাদ্দ জনগনের কোন কাজে লাগবে না।”