নতুন দরিদ্রদের কাজে ফেরানোর চেষ্টা নেই

প্রস্তাবিত বাজেটে জীবন-জীবিকায় প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলা হলেও নতুন দরিদ্র মানুষগুলোর কাজের জন্য সুস্পষ্ট কোনো রূপরেখা অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের বক্তব্যের মধ্যে খুঁজে পায়নি সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)।  বেসরকারি এ গবেষণা সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, বাজেটে বড় ধরনের ব্যয়ের কথা বলা হলেও কর্মসৃজনের বিষয়ে প্রত্যক্ষভাবে কোনো কিছু বলা হয়নি। তাছাড়া কভিড পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতেও নতুন কিছু তারা দেখতে পাচ্ছেন না। অথচ বড় ধরনের ব্যয়ের জন্য জিডিপির ৬ শতাংশ ঘাটতি নিয়ে ৭ দশমিক ২ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রক্ষেপণ করছে সরকার। বাজেট বাস্তবায়নে দুর্বল এসব অনুমিতির কারণে এ প্রবৃদ্ধিও অর্জন হওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর লেকশোর হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর এমন প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেন সিপিডির কর্মকর্তারা। সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘কভিডকালীন বাজেট বলা হলেও স্বাস্থ্য বা শিক্ষা খাতে এর প্রতিফলন দেখা যায় না। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা বা মহামারীতে যারা নতুন করে দারিদ্র্যে পড়েছে, তাদের জন্যও বাজেটে তেমন কিছু নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাজেটে ব্যবসাবান্ধব পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা আছে, তাতে কর্মসংস্থান তৈরি করার পরোক্ষ একটি চেষ্টা হয়তো আছে, কিন্তু আমাদের দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের অগ্রিম কর, শুল্ক, মূসক কমিয়েও অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাঞ্চল্য সৃষ্টি করা যায় না। অর্থাৎ ব্যবসার প্রসারের মধ্য দিয়ে কর্মসংস্থানের তেমন কোনো আশা সিপিডি দেখছে না।’

স্বাস্থ্য খাত নিয়ে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘টিকা কেনার পেছনে অর্থমন্ত্রী কী পরিমাণ ব্যয় করতে প্রস্তুত রয়েছেন তা বলেননি। অথচ টিকা নিশ্চিত না করলে কভিড পরিস্থিতিতে অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা নিয়ে সংশয় রয়েছে।’ স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ কম মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘যে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে তা-ও সক্ষমতার অভাবে ব্যয় করা যাচ্ছে না। অথচ সারা দেশের ১৬ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিকের অবকাঠামো দিয়েও আমরা অর্থ ব্যয় করতে পারি। সরকার সেটাও করছে না।’

সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সরকারি কর্মকর্তাদের পেনশন যুক্ত করে বাজেট বড় দেখানো হয়েছে উল্লেখ করে এ প্রবণতার সমালোচনা করেন সিপিডির এ সম্মানীয় ফেলো। তিনি বলেন, ‘পেনশন বাদ দিলে এ খাতে থাকে মাত্র বাজেটের ২ দশমিক ৪ শতাংশ। এ বরাদ্দ করোনা মহামারীর এ সময়ে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার সমাধান করতে পারবে বলে মনে করি না।’

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আয় বৈষম্য, ভোগ বৈষম্য এবং সম্পদ বৈষম্য দূর করাই বাজেটের দর্শন। সেটাই প্রস্তাবিত বাজেটে অনুপস্থিত।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাজেটে বৈধ কিন্তু অপ্রদর্শিত আয়কে সাদা করার সুযোগ দেওয়া যায়। তবে অবৈধ আয়কে সাদা করার সুযোগ না দেওয়ার নজির অনেক দেশেই আছে। সেদিক দিয়ে এবারের বাজেট অনেকটা ইতিবাচক।’

মূল বক্তব্য উপস্থাপনকালে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘মহামারীর সময়ে প্রণীত এ বাজেটে সামষ্টিক অর্থনীতির কাঠামোটা দুর্বল। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাস (জুলাই-এপ্রিল) পর্যন্ত অর্থনীতির যে গতিপ্রকৃতি দেখা গেছে, সেটাকে মাথায় রেখে আসন্ন অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন করা হয়নি।’

সরকারের চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট প্রণয়নও বাস্তবসম্মত হয়নি বলে মনে করছে সিপিডি। আর এ সংশোধিত বাজেটের ওপর ভিত্তি করে প্রক্ষেপণ করা আগামী বাজেট বাস্তবায়নও চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়বে বলে মনে করছেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা।

সিপিডি বলছে, চলতি অর্থবছরে সরকারের ৬ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য রয়েছে। এ প্রক্ষেপণের ওপর ভিত্তি করে আগামী অর্থবছরে ৭ দশমিক ২ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের যে লক্ষ্যমাত্রা সরকার নিয়েছে তা বাস্তবসম্মত নয়। তবে এর থেকেও বেশি প্রবৃদ্ধির পরিকল্পনা করা যেত। সেজন্য যে ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আনা দরকার ছিল তা প্রস্তাবিত বাজেটে নেই।

ফাহমিদা খাতুন তার বক্তব্যে বলেন, ‘আগামী অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটের ১০ শতাংশ রাজস্ব আদায় বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। তবে বাস্তবে যে পরিমাণ রাজস্ব আহরণ হবে সেই তুলনায় প্রস্তাবিত বাজেটের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ৩০ শতাংশের বেশি ধরা হয়েছে। কভিড পরিস্থিতিতে এই পরিমাণ রাজস্ব বাড়ানো কঠিন। ফলে ঘাটতি বাড়াতে হবে।’

গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে আসছে অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি পরিকল্পনা তুলে ধরেন। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা আয়ের কথা বলা হয়। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে রাজস্ব আয় ৩ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছ। তবে অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত ১ লাখ ৯৭ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা আদায় হয়েছে।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেটে যাদের জন্য বরাদ্দ প্রয়োজন তাদের দেওয়া হয়নি। আবার যার দরকার নেই, তাকেও দেওয়া হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত কয়রার হাজার হাজার মানুষ বাঁধের জন্য আন্দোলন করলেও তাদের বাঁধের জন্য বরাদ্দ না দিয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ১৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলো। অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমরা যথেষ্ট ভালো অবস্থানে আছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘খাতভিত্তিক বরাদ্দ পর্যাপ্ত নয়। বিসিকের অনেক প্রকল্প পড়ে রয়েছে। সেখানে বরাদ্দ বাড়ালে কর্মসংস্থান বাড়ত। এছাড়া কর্মসংস্থানের জন্য আরও যে খাতগুলো রয়েছে সেখানেও পর্যাপ্ত বরাদ্দ নেই।’

এ পরিচালক বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেটে সাধারণ মানুষের জন্য কিছু (বরাদ্দ) রাখা উচিত ছিল সরকারের। কারণ সাধারণ মানুষের হাতে টাকা দিলে তারা সেটা খরচ করত। এতে অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসত। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারেও সেই অর্থ কিছুটা কাজে লাগত। সেজন্য এখনো যে সময় আছে তার মধ্যে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর দাবি করছে সিপিডি, যা প্রস্তাবিত বাজেটে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।’

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, ‘বাজেট ঘাটতিতে বিদেশি সাহায্য বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। তবে বিদেশি ঋণ আরও বেশি পাওয়া যেত। এ ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত হয় এর বাস্তবায়নের ওপর। সেই দিকটিতে জোর দিতে হবে।’ প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়ে তিনি বলেন, ‘এগুলোর ৮৫ শতাংশই ঋণ হিসেবে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ঋণের বাইরেও প্রণোদনা বাড়ানো দরকার ছিল। মানুষের কাছে অর্থ পৌঁছানো দরকার ছিল।’