কেরানীগঞ্জেও অসচ্ছল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নেওয়া বীর নিবাস প্রকল্পে বাড়ি বরাদ্দ পাওয়ার ছয় বছর পরও ৩০ মুক্তিযোদ্ধা বুঝে পাননি তাদের স্বপ্নের ঘর। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজেদের প্রাপ্য বাসস্থান আদায়ে সরকারি দপ্তরে দপ্তরে ঘুরছেন তারা। তারপরও কাটছে না অনিশ্চয়তা।
জানা যায়, অসচ্ছল বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের জন্য ২০২১ সালে সারা দেশে ৩০ হাজার বীর নিবাস নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। প্রতিটি বাড়িতে রাখা হয় দুটি শয়নকক্ষ, একটি ড্রয়িং রুম, রান্নাঘর ও বাথরুম। শুরুতে প্রতিটি বাড়ি নির্মাণে বরাদ্দ ছিল ১৪ লাখ ১০ হাজার টাকা, যা পরে আরও বৃদ্ধি করা হয়।
ঢাকার কেরানীগঞ্জে এই প্রকল্পের আওতায় বরাদ্দ দেওয়া হয় ৭০টি বীর নিবাস। এসব বাড়ি নির্মাণের দায়িত্ব পায় সাতটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ৫টি করে বাড়ি নির্মাণের কাজ পেলেও মেসার্স কিংডম বিল্ডার্স নামক প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে একাই ৩৫টি বাড়ি নির্মাণের কাজ বাগিয়ে নেয়।
কার্যাদেশ অনুসারে ২০২২ সালের মধ্যেই সম্পূর্ণ কাজ শেষ করে মুক্তিযোদ্ধাদের বুঝিয়ে দিতে বলা হয়। কিন্তু কিংডম বিল্ডার্স ৩৫টি বাড়ির মধ্যে মাত্র পাঁচটি বাড়ি হস্তান্তর করলেও, বাকি ৩০টি বাড়ির কাজ অসম্পূর্ণ রেখে পালিয়ে যায়।
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ৩০টি বাড়িতে যতটুকু নির্মাণকাজ হয়েছে তার খরচের বড় অংশ বিভিন্ন অজুহাতে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকেই সংগ্রহ করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কিংডম বিল্ডার্স। এ ছাড়া স্থানীয় ইট, বালু ও নির্মাণসামগ্রী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও বাকিতে সব মালামাল নেওয়া হয়। এসব কাজের বিল বাবদ প্রায় ৯০ শতাংশ টাকা সরকারি কোষাগার থেকে উঠিয়ে নেওয়ার পরও কাজ অসমাপ্ত রেখে পাওনাদারদের টাকা পরিশোধ না করেই ২০২৩ সাল থেকেই লাপাত্তা রয়েছে কিংডম বিল্ডার্স। সেই হিসেবে ৩০টি বীর নিবাস বাবদ ১৪ লাখ ১০ হাজার টাকা করে প্রায় ৪ কোটি টাকার বেশি অর্থ হাতিয়ে নেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি।
এদিকে, দীর্ঘদিন ধরে কাজ বন্ধ থাকায় নির্মাণাধীন বাড়ি-ঘরের অবস্থাও দিন দিন নাজুক হয়ে পড়ছে। সরেজমিন কেরানীগঞ্জের কলাতিয়া ইউনিয়নের একাধিক বীর নিবাস প্রকল্প ঘুরে দেখা যায়, কোথাও দেওয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে, কোথাও শেওলা জমেছে। অনেক স্থানে নির্মাণসামগ্রীও নষ্ট হতে শুরু করেছে। একটি ঘরেও দরজা বা জানালা লাগানো হয়নি। দেওয়ালে করা হয়নি পলেস্টর, মেঝেতেও ঢালাই করা হয়নি। কোনোমতে ছাদ ঢালাই দিয়ে ইটের গাঁথুনি করা হয়েছে। টয়লেট, রান্নাঘরের কাজে হাত দেওয়া হয়নি।
প্রকল্প নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা হতাশা ব্যক্ত করেছেন। মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সোবাহান জানান, সেই ২০২২ সাল থেকে সরকারের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি। একটি আশ্রয়ের আশা পেলেও বাস্তবে পাচ্ছি না।
মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন কচি বলেন, বীর নিবাসের জন্য গত চার বছরে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসে যেতে যেতে ক্লান্ত হয়ে গেছি আমরা। তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করানোর জন্য আমরাও সরল মনে টাকা দিই। সবাই আমাদের জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বলে সম্মান করে। কিন্তু আমাদের সঙ্গেও যে প্রতারণা করবে সেটা ভাবিনি।
মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রবের ছেলে রবি বলেন, আমার বাবার খুব ইচ্ছা ছিল বীর নিবাসে উঠবে। কিন্তু তার আর সেই সৌভাগ্য হয়নি। গত বছর আব্বা মারা যায়।
এ বিষয়ে কেরানীগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা রাসেদ খান জানান, বীর নিবাস প্রকল্পের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কিংডম বিল্ডার্সের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়েছে। কীভাবে কাজটি পুনরায় শুরু করা যায়, সে বিষয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এ বিষয়ে কিংডম বিল্ডার্সের হয়ে বীর নিবাস প্রজেক্টের দায়িত্বে থাকা ফেরদৌস খানের সঙ্গে কথা হলে তিনি ৭৫ শতাংশ বিল নিয়ে ৯০ শতাংশ কাজ সম্পাদন হয়েছে বলে দাবি করেন। ইট বালুর বিল বাকি থাকার বিষয়টি স্বীকার করলেও মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি। সেই সঙ্গে কাজ সম্পাদন করতে না পারার জন্য প্রকল্প অফিস দায়ী বলে অভিযোগ করেন।
যোগাযোগ করা হলে কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার উমর ফারুক নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে বলে দাবি করেন।
