ভয় বাড়ছে সীমান্ত এলাকায় রামেকে এক দিনে ১৬ মৃত্যু

করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় সপ্তাহখানেক আগে দেশের ভারত সীমান্তবর্তী সাত জেলায় ক্লাস্টারভিত্তিক ‘লকডাউনের’ সুপারিশ করেছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ কমিটি। সেই আলোকে ইতিমধ্যে সীমান্তবর্তী কয়েকটি জেলা, উপজেলা ও গ্রাম লকডাউন ঘোষণা ছাড়াও কিছু কিছু এলাকায় কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এমনসব পদক্ষেপের মধ্যেই সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর করোনা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। এর মধ্যে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের করোনা ইউনিটে এক দিনে সর্বোচ্চ ১৬ রোগীর মৃত্যু হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার দুপুরের পর থেকে গতকাল শুক্রবার ভোর পর্যন্ত সময়ে তাদের মৃত্যু হয়। করোনা শনাক্তের হার ও মৃত্যুর সংখ্যায় নাজুক অবস্থায় দিনাজপুর সদর উপজেলাও। এই উপজেলায় সর্বশেষ গতকাল পর্যন্ত করোনা শনাক্তের হার দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৯৮ শতাংশ। সীমান্তবর্তী আরেক জেলা ঝিনাইদহে ২৪ ঘণ্টায় ৬৯টি নমুনা পরীক্ষা করে ১৫ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। বিস্তারিত দেশ রূপান্তরের সংশ্লিষ্ট জেলার প্রতিনিধি ও নিজস্ব প্রতিবেদকদের পাঠানো খবরে :

রামেক হাসপাতালের করোনা ইউনিটে গত বৃহস্পতিবার দুপুরের পর থেকে গতকাল ভোর পর্যন্ত ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। তারা হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ড ও আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। হাসপাতালটির উপপরিচালক ডা. সাইফুল ফেরদৌস এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। রামেক হাসপাতালে এক দিনে করোনায় এটিই সর্বোচ্চ মৃত্যু। এর আগে গত বৃহস্পতিবার এখানে করোনা আক্রান্ত ৯ জনের মৃত্যু হয়। এ নিয়ে গত ২৪ মে থেকে ৪ জুন পর্যন্ত ১২ দিনে হাসপাতালের করোনা ইউনিট ও আইসিউতে মারা গেলেন ৯৩ জন। এই ৯৩ জনের মধ্যে ৫৬ জন করোনা পজিটিভ ছিলেন। বাকিরা করোনা উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

সাইফুল ফেরদৌস জানান, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মৃত্য হওয়া ১৬ জনের মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৯ জন, রাজশাহীর ছয়জন এবং একজনের বাড়ি নওগাঁ জেলায়। গতকাল সকালে হাসটির করোনা ওয়ার্ডে ভর্তি ছিলেন ২২৫ জন। আগের দিন সকাল থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে ৩২ জন। যাদের মধ্যে ১৩ জন রাজশাহীর, ১৫ জন চাঁপাইনবাবগঞ্জের, পাবনার ৩ এবং ১ জন নাটোর জেলার বাসিন্দা।

এদিকে রামেক হাসপাতালে প্রতিদিনই উদ্বেগজনক হারে করোনা রোগী ও করোনা উপসর্গের রোগী বাড়লেও হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে করোনা রোগীর চিকিৎসার জন্য যে শয্যা রয়েছে সেগুলো প্রায় শেষ।

হাসপাতালের উপপরিচালক সাইফুল ফেরদৌস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাসপাতালে করোনা ইউনিটে মোট বিছানা ২৩২টি। এর মধ্যে আজ (গতকাল শুক্রবার) সকাল ১০টার মধ্যেই ২২৫ রোগী ভর্তি আছেন। যেকোনো সময় বাকি সিটগুলো ফুরিয়ে যাবে।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জে করোনার ভারতীয় ধরন নিয়ে ধোঁয়াশা : সীমান্তবর্তী চাঁপাইনবাবগঞ্জে করোনার ভারতীয় ধরন শনাক্ত হওয়ার পর থেকে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়। এখন দেশজুড়েই আলোচনা চাঁপাইনবাবগঞ্জের করোনা নিয়ে। কিন্তু এখনো চিহ্নিতই করা সম্ভব হলো না কীভাবে এলো ভারতীয় ধরনের করোনা। স্থানীয় প্রশাসন এ নিয়ে বিভিন্নভাবেই জানার চেষ্টা করেছে যাদের শরীরে করোনার ভারতীয় ধরন শনাক্ত হয়েছে তারা কোনোভাবে ভারতীয় বা ভারতফেরত কারও সংস্পর্শে এসেছিল কি না। তদন্ত বলছে তারা এমন কারও সংস্পর্শেই আসেনি। তাহলে এই ধরন এলো কী করে? উত্তর মেলেনি। এখনো পর্যন্ত স্থানীয় প্রশাসন বা স্বাস্থ্য বিভাগ কিনারা খুঁজে পাচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত এই রহস্য খোঁজার কাজই বাদ দিয়ে দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, আর কারও শরীরে এই ধরন আছে কি না সেটিও আর জানার দরকার নেই।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ডা. ফারিহা রহমান করোনার ভারতীয় ধরনে আক্রান্ত। দেড় মাস বয়সী তার একটি শিশু সন্তান রয়েছে। ড. ফারিহার স্বামী নুরে আলম সিদ্দিকী বলেন, ৯ মে ফারিহার নমুনা পরীক্ষা করে করোনা ধরা পড়ে। পরে ২৩ মে আবার পরীক্ষা করার পরও পজিটিভ রেজাল্ট এসেছে। তবে তার শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক। কোনো সমস্যাই নেই। তবে আবারও একটি পরীক্ষা করানোর পর নিশ্চিত হওয়া যাবে নেগেটিভ হলো কি না।

তিনি বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি তার ভারতীয় ধরন শনাক্ত হয়েছে। এর পর স্থানীয় প্রশাসন জানার চেষ্টা করে যে, ফারিহার শরীরে ভারতীয় ধরনের করোনা কীভাবে আসতে পারে। ভারতফেরত কারও সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল কি না। আসলে এসব কিছুই ছিল না। আমরা জানিয়েছি।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের দুই ভাই সাকিব আহমেদ ও সাফিন আহমেদ ভারতীয় ধরনে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তাদের বাবা ওবায়দুল হক জানান, দুই ভাইই এখন সুস্থ। তিনি বলেন, ‘তাদের শরীরে ভারতীয় ধরনের বিষয়টি আমরা জানতে পেরেছি তারা সুস্থ হয়ে যাওয়ার পর। এটা খুব ভালো হয়েছে। আগেই এটা জানলে হয়তো তারা মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ত। ভেঙে পড়ত।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান বলেন, ‘জেলায় যে সাতজনের শরীরে করোনার ভারতীয় ধরন শনাক্ত হয়েছে তার পাঁচজনের বাড়িই সদর উপজেলায়। চিহ্নিতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এই ধরনটি তাদের শরীরে এলো কী করে সেটি নিয়ে কাজ করে উপজেলা প্রশাসন। তাদের বাড়ির সামনে লাল পতাকা টাঙ্গিয়ে দেওয়া হয়। যাতে আশপাশের মানুষ এটি নিয়ে সচেতন থাকেন। আমরা ভারতীয় ধরনের সূত্র খোঁজার চেষ্টা করেছি, কিন্তু কোনো কিছুই চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। আক্রান্তরা ভারতীয় কারও সংস্পর্শে থাকার কোনো প্রমাণ মেলেনি।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক মঞ্জুরুল হাফিজ বলেন, ‘আমরা ভারতীয় ধরনের সংক্রমণ নিয়ে অনুসন্ধান করেছি। কিন্তু এটির কোনো রুট খুঁজে পাচ্ছি না। কীভাবে এটি ঢুকল। আক্রান্তদের কন্ট্রাক ট্রেসিং করা হয়েছে। বাড়ির আশপাশেই তাদের চলাচল ছিল। তাদের কারও বাড়িও সীমান্তের কাছে না। আসলে তারা কাদের মাধ্যমে এই ধরন বহন করেছে সেটি স্পেসিফিক করে বলতে পারছি না।’

দিনাজপুর সদরে করোনা শনাক্তের হার ৩৬.৯৮ শতাংশ : করোনা শনাক্তের হার ও মৃত্যুর সংখ্যায় নাজুক অবস্থায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে দিনাজপুর সদর উপজেলা। এই উপজেলায় সর্বশেষ গতকাল পর্যন্ত করোনা শনাক্তের হার ছিল ৩৬ দশমিক ৯৮ শতাংশ। শুধু তাই নয়, এখন পর্যন্ত জেলার ১৩টি উপজেলায় যে পরিমাণে মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে তার অর্ধেকেরও বেশি শুধু এই একটি উপজেলাতেই। এই একটি উপজেলাতেই যে পরিমাণে মানুষ করোনায় মৃত্যুবরণ করেছেন তা অন্য ১২টি উপজেলার প্রায় সমান। অর্থাৎ ১২টি উপজেলায় যে পরিমাণে মানুষ মারা গেছে সেই পরিমাণ মানুষ মারা গেছে এই একটি উপজেলাতেই।

হিসাব বলছে, গত দশ দিনে জেলায় যে পরিমাণে করোনার রোগী শনাক্ত হয়েছে তার ৭৩ দশমিক ৬৯ শতাংশই সদর উপজেলার। যদিও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এখনো এই উপজেলা লকডাউনের সময় হয়নি।

দিনাজপুর সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গতকাল এই জেলায় মোট নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১৪০টি, যার মধ্যে করোনা শনাক্ত হয়েছে ৩২টি। করোনা শনাক্তের হার ২২.৮৫ শতাংশ। এর মধ্যে সদর উপজেলার নমুনা ছিল ৭৩টি, আর শনাক্ত হয়েছে ২৭টি। অর্থাৎ এই উপজেলায় করোনা শনাক্তের হার ৩৬.৯৮ শতাংশ।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার এই উপজেলায় করোনা শনাক্তের হার ছিল ৪৮.৩৩ শতাংশ। ওইদিন এই উপজেলায় করোনার নমুনা পরীক্ষা হয় ৬০টি, এর মধ্যে শনাক্ত হয় ২৯টি। ওইদিন পুরো জেলায় করোনার পরীক্ষা হয়েছিল ১৪০টি এবং শনাক্ত হয়েছিল ৩৫টি। করোনা শনাক্তের হার ছিল ২৫.০০ শতাংশ।

সদর উপজেলায় করোনার শনাক্তের হার বাড়ার বিষয়ে কথা হলে দিনাজপুরের সিভিল সার্জন ও জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটির সদস্য সচিব ডা আব্দুল কুদ্দুছ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখনো সদর উপজেলা লকডাউনের সময় হয়নি, দেরি আছে।’

ঝিনাইদহে ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত ১৫ : করোনাভাইরাস সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী বাউলী গ্রামে চলছে ৭ দিনের লকডাউন। সেই সঙ্গে সীমান্তবর্তী ৬টি ইউনিয়নে রাতে চলাচলের ওপরও বিধিনিষেধ রয়েছে। ইউনিয়নগুলো হলো বাঁবাড়িয়া স্বরূপপুর, নেপা, কাজীরবেড়, শ্যামকুড় ও যাদবপুর।

গতকাল সকালে মহেশপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাশ^তী শীল বাউলী গ্রাম পরিদর্শনে যান। সেখানকার বাসিন্দাদের কঠোর লকডাউন মেনে চলাচল ও জরুরি কাজে বাইরে বের হলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাচলের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী ৬টি ইউনিয়নের মানুষকে রাত ৮টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত চলাচল না করতে অনুরোধ করেন তিনি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাশ^তী শীল বলেন, ‘গ্রামটি থেকে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে যাওয়া ও বাইরে থেকে গ্রামটিতে প্রবেশের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। গ্রামটি প্রশাসনিক নজরদারিতে রাখা হয়েছে। এছাড়াও উপজেলার সীমান্তবর্তী ৬টি ইউনিয়নের মানুষকে রাত ৮টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত বাইরে চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এ নির্দেশ যারা অমান্য করবে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। লকডাউন কার্যকরে প্রশাসন নিয়মিত নজরদারি করছে।’

এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় ৬৯টি নমুনা পরীক্ষা করে জেলায় ১৫ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে জেলায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল ২ হাজার ৯৪১ জন।

সিভিল সার্জন অফিসের মেডিকেল অফিসার ডা. তালাস তাসনিম শুভ জানান, সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী জেলায় করোনা সংক্রমণের হার ২১%। বর্তমানে সদর হাসপাতাল করোনা ইউনিটে ভর্তি আছেন ১১ জন। জেলায় মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৫৬ জন।

খুলনায় ৪ থানা এলাকায় কঠোর বিধিনিষেধ : করোনা সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় খুলনার চার থানা এলাকায় সপ্তাহব্যাপী কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। গতকাল ভোর থেকে এই বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। আগামী ১০ জুন পর্যন্ত এই বিধিনিষেধ চলবে। কঠোর এ বিধিনিষেধের প্রথম দিন গতকাল সকাল থেকে খুলনা মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে নিরাপত্তা চৌকি বসিয়েছে প্রশাসন। বিধিনিষেধের কারণে নগরীর সদর, সোনাডাঙ্গা, খালিশপুর থানা ও রূপসা উপজেলায় জরুরি সেবা ব্যতীত সব দোকানপাট, মার্কেট ও শপিং মল বন্ধ রয়েছে।

গতকাল সকালে নগরীর বিভিন্ন বাজারে গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্রেতা-বিক্রেতার মুখে মাস্ক নেই। কেউ মানছেন না শারীরিক দূরত্ব। তবে শুক্রবার সরকারি ছুটি থাকায় নগরীর রাস্তাঘাটে লোক সমাগম ছিল কম। ইজিবাইক, সিএনজি চলাচল করলেও যাত্রীসংখ্যা খুব বেশি হয়নি।

খুলনা মহানগরীর সদরে করোনা সংক্রমণের হার শতকরা ৩৫, খালিশপুরে ২৫ এবং সোনাডাঙ্গাতে এই হার শতকরা ১৭ ভাগ। এছাড়া নগরীর পাশর্^বর্তী রূপসা উপজেলাতে করোনা সংক্রমণের হার শতকরা ৪ দশমিক ১৮ ভাগ। কিন্তু অন্যান্য উপজেলাতে এই হার শতকরা প্রায় এক ভাগ। অন্যান্য স্থানে সংক্রমণের হার নিম্নগামী।