পাকিস্তানের ভারত নীতি নিয়ে কিছু কথা

পাকিস্তানের ভারত সম্পর্কিত নীতি নিয়ে টানাপড়েন কম হয়নি। এর সাধারণভাবে দুটি দিক রয়েছে। একদিকে শুধুমাত্র আইনগত ও নৈতিক যুক্তির ভিত্তিতে ইতিবাচক অগ্রগতির প্রত্যাশা। অন্যদিকে জাতীয়, আঞ্চলিক ও বৈশি^ক পর্যায়ের ক্ষমতার রাজনীতির বাস্তবতার বাধ্যবাধকতা। ভারতনীতির রশি টানাটানি চলেছে এ দুই প্রান্তকে নিয়ে। আমাদের প্রকৃত নীতি এই দুই মেরুর মধ্যে ঘুরপাক খেয়েছে যা সৃষ্টি করেছে বিভ্রান্তি, উদ্দেশ্যের ধারাবাহিকতাহীনতা আর দিকনির্দেশনার অভাবের বোধ।

ভারত এবং কাশ্মীর (মূল বিরোধ) বিষয়ে আমাদের সরকারি অবস্থান এবং বক্তব্য সাধারণভাবে একান্তই কৌশলগত। প্রকৃতিগত দিক থেকে তা স্বল্পমেয়াদি। দৈনন্দিন ঘটনার ভিত্তিতে ঠিক হয় এসব বক্তব্য। এ অবস্থানের মধ্যে ক্ষমতার রাজনীতির বাস্তবতার ভিত্তিতে এবং বৃহত্তর কর্মকৌশলের আওতায় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক মাত্রাগুলোর সমন্বয়ে প্রস্তুত সুচিন্তিত কোনো দীর্ঘমেয়াদি নীতির প্রতিফলন নেই। কেবল এমনটি হলেই নীতিটি সার্বিক রূপ পেতে পারত। এ কারণে আমাদের প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি আর কর্মকৌশল যা আমাদের ভারত সংক্রান্ত নীতিকে দেবে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা আর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের স্থিরতা। 

আমাদের ভারত সংক্রান্ত দীর্ঘমেয়াদি নীতি অবশ্যই এ অঞ্চলে ভারতের কৌশলগত লক্ষ্য, পাকিস্তানের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির দাবি এবং আঞ্চলিক ও বৈশি্বক কৌশলগত পরিবেশকে নিখুঁতভাবে পর্যালোচনার ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হবে। ভারতের প্রধান কৌশলগত লক্ষ্য হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করা। দেশটি স্বাধীন ও শক্তিশালী পাকিস্তানকে দেখে তার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার উচ্চাভিলাষ পরিপূর্ণ করার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে। ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক সি রাজামোহনের মতে, পাকিস্তানের সৃষ্টি হওয়া ভারতকে তখন থেকে দেশটির সঙ্গে নিরন্তর দ্বন্দ্বে লিপ্ত রেখেছে। সেই সঙ্গে দেশবিভাগ ভারতে সৃষ্টি করেছিল অভ্যন্তরীণ, বিভাগ-উত্তর এক নতুন হিন্দু-মুসলিম বিভাজন। ভারতকে তা ভৌগোলিকভাবে আফগানিস্তান ও ইরান থেকে পৃথক করেছিল। এছাড়া মুসলিমপ্রধান মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ব্যাপক সমস্যার সৃষ্টি করেছিল পাকিস্তানের জন্মলাভ। এ অঞ্চলে ভারতের প্রাধান্যপ্রতিষ্ঠার উচ্চাভিলাষ কাশ্মীর, স্যার ক্রিক, সিয়াচেন ও পাকিস্তান-ভারত সমুদ্রসীমা বিরোধ ছাড়াও পাকিস্তানের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কল্যাণের প্রতি এক স্থায়ী হুমকি। এসব নিয়ামক দু দেশের মধ্যে সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধক। ভারত অদূর ভবিষ্যতে প্রাধান্যপ্রতিষ্ঠার উচ্চাভিলাষ ত্যাগ করবে বা কাশ্মীর সমস্যার একটি ন্যায্য সমাধানে সম্মত হবে তার কোনো ইঙ্গিত আমরা দেখছি না। তাই আগামী দশকগুলোতেও এই দুই রাষ্ট্রের মধ্যে আমরা অব্যাহত উত্তেজনা ও বৈরিতা দেখতে পাব। অন্য যে কোনো কিছুর চেয়ে ক্ষমতার ভারসাম্যই পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যকার ভবিষ্যৎ সম্পর্ক ও তাদের আজ পর্যন্ত অমীমাংসিত বিরোধগুলোর (বিশেষ করে কাশ্মীর নিয়ে) চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণ করবে। কাজেই পাকিস্তানের জন্য প্রতিবেশী ভারতের বিপরীতে জাতীয় সামর্থ্য গড়ে তোলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে এটা ধরে নেওয়া যায় যে ভারতও পাকিস্তানকে রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করার জন্য প্রকাশ্য ও গোপন সব ধরনের কৌশল ও নীতি অবলম্বন করবে। এ অঞ্চলে নিজের একচ্ছত্র প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা ও তাদের সুবিধামতো অমীমাংসিত বিরোধগুলোর ফয়সালা করার জন্য পাকিস্তানকে নত করাই হবে ভারতের লক্ষ্য। দেশটি পাকিস্তানের ভেতরে সন্ত্রাসবাদে উসকানি দেওয়া থেকেও বিরত হবে না, ২০১৬ সালের মার্চে বেলুচিস্তানে ভারতীয় গুপ্তচর কুলভূষণ যাদবের গ্রেপ্তার যার চূড়ান্ত প্রমাণ। দীর্ঘমেয়াদি ভারত নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের অবশ্যই উচিত হবে এই বিশ্লেষণ এবং দক্ষিণ এশীয় ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে সীমিত রাখতে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার কৌশলগত অংশীদারত্বতে মাথায় রাখা। এটি দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখতে পাকিস্তানকে অনিবার্যভাবে চীনের দিকে আরও বেশি ঠেলে দেবে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে পাকিস্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে প্রধানত তার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত শক্তি এবং নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তাগত সামর্থ্যরে ওপর। একইসঙ্গে আমাদের উচিত বড় ধরনের সশস্ত্র সংঘাত এড়াতে একটি কম ঝুঁকির ও অবেপরোয়া পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা। এতে করে পাকিস্তান তার সম্পদের বড় অংশটি অর্থনৈতিক উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করতে পারবে। ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য পরিচালনা করা উচিত সমান সুযোগ-সুবিধার ভিত্তিতে যাতে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কল্যাণ নিশ্চিত হবে। এই কাঠামোর ভিত্তিতে পাকিস্তানের উচিত ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে উত্তেজনা প্রশমিত করা ও আস্থা গঠনকারী ব্যবস্থা গ্রহণ করা। পাশাপাশি কাশ্মীর, স্যার ক্রিক ও সিয়াচেনের মতো অমীমাংসিত বিরোধের ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিগত অবস্থান বজায় রাখা।

ভারতের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার উচ্চাভিলাষ ও একগুঁয়েমির প্রেক্ষাপটে কাশ্মীর সমস্যা সমাধানের বিষয়ে অদূর ভবিষ্যতে কোনো বড় অগ্রগতি হওয়ার সম্ভাবনা নিঃসন্দেহে নাকচ করে দেওয়া যেতে পারে। স্বল্পমেয়াদে সবচেয়ে ভালো যা ঘটার আশা করা যেতে পারে তা হচ্ছে নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর বৈরিতার অবসান এবং ভারতঅধিকৃত কাশ্মীরের অসামরিকীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে কাশ্মীরিদের মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন করার প্রচেষ্টা। দীর্ঘ মেয়াদে পাকিস্তানের উচিত তার জাতীয় সক্ষমতাবিশেষ করে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সামর্থ্যবৃদ্ধি করা এবং যথাসময়ে একটি স্থায়ী সমাধানের জন্য সচেষ্ট হওয়া।

লেখক : পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও লেখক। লাহোর কাউন্সিল ফর ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স-এর প্রেসিডেন্ট।

পাকিস্তানের ‘ডন’ অনলাইন থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ