১০ মাসে সংশোধিত লক্ষ্যের ১৫ শতাংশ বেশি ঋণ

চলতি অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্রের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি ঋণ এসেছে দশ মাসেই। ফলে অর্থবছর শেষে এ খাত থেকে সরকারের ঋণ আরও বাড়বে বলে আশা করছেন সঞ্চয় অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ৩৪ হাজার ৭২৮ কোটি টাকার বেশি নিট ঋণ করছে সরকার। অথচ গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল আসছে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট পেশের সময় চলতি অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটও উপস্থাপন করেন। এ সময় তিনি বাজেট ঘাটতি অর্থায়নের জন্য ব্যাংকঋণের লক্ষ্য কমিয়ে সঞ্চয়পত্রের ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর কথা বলেন।

চলতি অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটে ২০ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে সঞ্চয়পত্র থেকে ৩০ হাজার ৩০২ কোটি টাকা নিট ঋণ নেওয়ার আশা প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত এ খাত থেকে সংশোধিত লক্ষ্যের ১৪ দশমিক ৬০ শতাংশ ঋণ করেছে সরকার।

সম্পূরক বাজেটে লক্ষ্য পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে এ ধরনের দুর্বলতাকে ভালো দৃষ্টিতে দেখছেন না অর্থনীতির বিশ্লেষকরা। এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সংশোধিত বাজেটের অনেক জায়গাতেই এমন দুর্বলতা রয়েছে। এ কারণে সংশোধিত বাজেটের ওপর ভিত্তি করে আগামী অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়বে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সঞ্চয়পত্রে নতুন করে বিনিয়োগ এসেছে ৯১ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা। এই সময়ে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের মুনাফা ও মূল টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে সরকারের ব্যয় হয়েছে ৫৭ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা। নিট ঋণ দাঁড়ায় ৩৪ হাজার ৭২৮ কোটি ৬৪ লাখ টাকা।

এর মধ্যে সবশেষ এপ্রিল মাসে এ খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ আসে ১ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা। এর আগে মার্চ মাসে নিট ঋণ এসেছিল ৩ হাজার ৮৯১ কোটি টাকা। ফেব্রুয়ারিতে ৩ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা, জানুয়ারিতে ৫ হাজার ২১৫ কোটি টাকা, ডিসেম্বরে ১ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা, নভেম্বরে ৩ হাজার ৪০২ কোটি টাকা, অক্টোবরে ৪ হাজার ৩৪ কোটি টাকা, সেপ্টেম্বর মাসে ৪ হাজার ১৫২ কোটি টাকা, আগস্টে ৩ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা এবং অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ৩ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা নিট ঋণ এসেছিল সঞ্চয়পত্র থেকে।

প্রতি বছর দেশের উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন প্রকল্পে সরকার যে পরিমাণ খরচ করে সেই অনুপাতে আয় না হওয়ায় বাধ্য হয়েই দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ করতে হয় সরকারকে। এ ধরনের বাজেট ব্যবস্থাপনাকে অর্থনীতির পরিভাষায় ‘ঘাটতি বাজেট’ বলা হয়। উন্নয়শীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে এ ধরনের বাজেট বেশি দেখা যায়।

বাংলাদেশেও স্বাধীনতার পর থেকে এ ধরনের ঘাটতি বাজেট পরিচালনার জন্য অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থার পাশাপাশি জাতীয় সঞ্চয় স্কিমগুলো থেকে ঋণ করছে সরকার।

ব্যাংক ও সঞ্চয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত কয়েক বছর ধরেই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বাড়ছে। কেননা, ব্যাংকের আমানতের সুদহারের চেয়ে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা অনেক বেশি আকর্ষণীয় ছিল। গত বছরের এপ্রিল থেকে ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনতে আমানতের সুদহার কমিয়ে আনে ব্যাংকগুলো। ফলে এখন আমানতের ওপর ৬ শতাংশের কম মুনাফা পাওয়া যায়। অন্যদিকে সঞ্চয়পত্রে ১০-১১ শতাংশের মতো মুনাফা দিচ্ছে সরকার।

এ কারণে নিরাপদ বিনিয়োগ ও বাড়তি মুনাফার আসায় ক্ষুদ্র সঞ্চয়ীরা জাতীয় সঞ্চয় স্কিমগুলোতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন বলে মনে করছেন ব্যাংক কর্মকর্তারা।

আবার কভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রভাবে অর্থনীতির গতিও কিছুটা থমকে গেছে। উন্নয়ন ব্যয়ের গতি কমে যাওয়ায় সরকার ব্যাংকঋণ নেওয়ার তুলনায় পরিশোধ করছে বেশি। যে কারণে আগামী অর্থবছরে সরকার ব্যাংকঋণের লক্ষ্য কমিয়ে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ বেশি নিতে চাচ্ছে।

অর্থমন্ত্রীর পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ১ জুলাই থেকে শুরু হতে যাওয়া নতুন অর্থবছরে ২ লাখ ১১ হাজার ১৯১ কোটি টাকার ঘাটতিতে পড়বে সরকার। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণপ্রাপ্তির লক্ষ্য ৯৭ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ আসবে মোট ৭৬ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। সঞ্চয়পত্র থেকে আসবে ৩২ হাজার কোটি টাকা। সঞ্চয়পত্র থেকে এভাবে ঋণ বাড়তে থাকায় গত এপ্রিল পর্যন্ত এ খাত থেকে সরকারের পুঞ্জীভূত ঋণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৮৬৩ কোটি টাকা।

এই ঋণ পরিশোধ করতে প্রতি বছর বড় অঙ্কের অর্থ সুদব্যয় বাবদ খরচ করছে সরকার। আগামী অর্থবছরেও এই খাতে বড় ধরনের ব্যয় করবে সরকার।

জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ ঋণ পরিশোধে ৬২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। এর মধ্যে ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা ও মূল্য পরিশোধে।

এদিকে সঞ্চয়পত্রে ২ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। তবে এর আগে থেকেই সঞ্চয়পত্রে ৫০ হাজার টাকা বেশি বিনিয়োগে টিআইএন নেওয়ার নির্দেশনা দিয়ে রেখেছিল সঞ্চয় অধিদপ্তর।

এছাড়া পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র এখন কেবল জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের আওতাধীন সঞ্চয় ব্যুরো থেকে কেনার নিয়ম করা হয়েছে। আগে বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ডাকঘর থেকে এটি কেনা যেত। গত ১৮ মে এই পরিবর্তন আনে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ।

তাছাড়া সঞ্চয় অধিদপ্তরের নির্দেশনা রয়েছে একজন ব্যক্তি সব ধরনের সঞ্চয়পত্রে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে পারবেন। যেকোনো একটি স্কিমে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা যায়। তবে পেনশনাররা একক নামে এক কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে পারেন। পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাপ্ত মুনাফার ওপর উৎসে কর ৫ শতাংশ। এর বেশি সঞ্চয়পত্র থাকলে উৎসে কর ১০ শতাংশ।