২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট প্রণয়নে বাস্তবতা আমলে নেওয়া হয়নি। এতে ফুটে ওঠেনি জীবন ও জীবিকার বাস্তব চিত্র। প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগের হিসাবের মধ্যেও নেই সমন্বয়। এছাড়া ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির যে প্রাক্কলন করা হয়েছে তাও বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)। গতকাল শনিবার ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এই মূল্যায়ন তুলে ধরে প্রতিষ্ঠানটি।
সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘বাজেটে বর্তমান জীবন ও জীবিকার বাস্তবতার সঠিক কোনো মূল্যায়ন করা হয়নি। আমরা যদি সমস্যাকে সঠিকভাবে তুলে আনতে না পারি, তবে এর সমাধান করব কীভাবে। সমস্যা যদি সঠিকভাবে না পাই, এর সমাধান সঠিক হবে না।’
তিনি বলেন, ‘বাজেটে বর্তমান অবস্থার মূল্যায়ন থাকা উচিত। সমস্যা খাটো করা হলে সমাধানও যথাযথ হবে না। দারিদ্র্য, শ্রমবাজার, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এসব বিষয়ে কভিডের বাস্তবতা অস্বীকার করা হয়েছে এবারের বাজেটে।’ তিনি মনে করেন, নীতিপ্রণেতারা আত্মতুষ্টিতে থাকতে চান। এ সময় তথ্য-উপাত্ত যখন খুব জরুরি, অথচ সরকারি সংস্থাগুলো অতটা সক্রিয় নয়।’
মাঠবাস্তবতা নীতিপ্রণেতাদের কাছে পৌঁছেছে বলে মনে করেন না সেলিম রায়হান। বিশেষ করে দারিদ্র্যের পরিসংখ্যানের সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই। সানেম, বিআইজিডি, পিপিআরসি সবার জরিপেই দেখা গেছে এ সময় আড়াই থেকে সাড়ে তিন কোটি মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। কিন্তু তাদের কথা বাজেটে উঠে আসেনি। এমনকি এই পরিস্থিতির স্বীকৃতিও নেই। এটা নীতি প্রণয়নের জন্য ভালো নয় বলেই মনে করেন তিনি।
অন্যদিকে বাজেটে প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির ফারাক আছে বলে মন্তব্য করেন সানেমের গবেষণা পরিচালক সায়েমা হক। কৃষি খাত বা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় কর ছাড় দেওয়ার যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তা ইতিবাচক হলেও নিম্ন আয়ের মানুষ তার কতটা সুবিধা পাবে, সেটা পরিষ্কার নয় বলে মনে করেন তিনি। ব্যবসাবান্ধব বাজেটের কথা বললেন অর্থমন্ত্রী, কিন্তু ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা সুবিধা পাবে, তাও স্পষ্ট নয়।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা সুবিধা পাবে, তা স্পষ্ট নয়। অন্যদিকে বাজেটে যে বড় ধরনের সংস্কারের প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ হলো না বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেন সায়েমা হক।
সায়েমা হকের মত, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি রোডম্যাপ থাকা উচিত। তবে এই বরাদ্দ বৃদ্ধি উন্নয়নের অভিযাত্রার সঙ্গে কতটা সঙ্গতিপূর্ণ, সে প্রশ্ন তোলেন তিনি। আর এবার বাজেটে যে বড় ধরনের সংস্কারের প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ হলো না বলে আক্ষেপ প্রকাশ করেন সায়েমা হক।
এদিকে চাহিদা না বাড়লে বিনিয়োগ বৃদ্ধির সম্ভাবনা কতটা এবং ব্যবসাবান্ধব বাজেট মানুষের কতটা কাজে আসবে, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে সেলিম রায়হান বলেন, ‘সরবরাহের দিকে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে, কিন্তু চাহিদার দিকেও তা থাকা দরকার। উন্নত দেশের মতো সক্ষমতা আমাদের নেই, অত প্রণোদনা আমরা দিতে পারব না, কিন্তু এই পরিস্থিতির স্বীকৃতি থাকা দরকার। তা না হলে পুনরুদ্ধার শ্লথ হয়ে যাবে। আবার সব ব্যবসাও সমানভাবে প্রণোদনা পাচ্ছে না।’
অর্থনীতিবিদরা সাধারণত কখনো একমত হন না। তবে এবার সব অর্থনীতিবিদই একমত, বাজেট ঘাটতি বাড়ানো উচিত। নতুন বাস্তবতায় এই ঐকমত্য গড়ে উঠেছে বলে মনে করেন সেলিম রায়হান। প্রস্তাবিত এই বাজেটে করোনাভাইরাসের অবস্থার যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে সেটি ‘সঠিক নয়’ ও ‘অপরিপূর্ণ’ মন্তব্য করে সানেমের নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘বাজেটে দারিদ্র্য নিয়ে, কর্মসংস্থান নিয়ে, শ্রমবাজার নিয়ে, এসএমই নিয়ে এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধার নিয়ে যে আলোচনা করা হয়েছে সেটা অপরিপূর্ণ আলোচনা। আর এই ধরনের অপরিপূর্ণ আলোচনার বিপদ যেটা হচ্ছে, নীতিনির্ধারণের মধ্যে এক ধরনের শৈথিল্য কাজ করে। নীতিনির্ধারকরা যদি কমফোর্ট জোনে থাকেন এ রকম একটা সংকটের সময় তাহলে কিন্তু যথার্থ নীতি প্রণয়ন করা এবং সে নীতি বাস্তবায়ন করার যে একটা তাগিদ কাজ করা উচিত, সেটা তারা কিন্তু অনুভব করবেন না।’
তিনি বলেন, যেহেতু সব বিষয়ের সঠিক চিত্র বাজেটে ছিল না, তাই করোনাভাইরাস পরিস্থিতি থেকে মুক্তির সমাধান আমরা এই বাজেটে পাইনি। যদিও সরকারের সদিচ্ছার কোনো অভাব ছিল না। সমস্যা সমাধানের সামগ্রিক কোনো পরিকল্পনা আমরা দেখিনি।’
তার মতে, ‘প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তায় খরচ আরও বাড়ানো উচিত ছিল।’
এই তিন খাতে জিডিপির ৪ শতাংশ ব্যয় ধরার কথা উল্লেখ করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘শুধু শিক্ষাতেই ২ থেকে ৪ শতাংশ খরচ করা দরকার। অর্থাৎ স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তায় জিডিপির ৮ থেকে ১২ শতাংশ বরাদ্দ রাখা উচিত।’