বেসরকারি স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে ২০১৪ সালে টিউশন ফি ছিল ২ লাখ টাকা। ছয় বছর পর এই বিভাগে পড়তে শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় করতে হচ্ছে প্রায় ৫ লাখ টাকা। এই সময় দ্বিগুণের বেশি টিউশন ফি বাড়লেও শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়নে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয়টি। বর্তমানে এই বিভাগে পড়াশোনা করছেন মাজহারুল হক তামিম। ব্যয়বহুল শিক্ষার অর্থ তার পরিবার বহন করতে পারে না। সেজন্য ঢাকার একটি সংবাদ মাধ্যমে চাকরি করছেন তিনি। তামিমের আশঙ্কা, প্রস্তাবিত বাজেটে বেসরকারি-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ১৫ শতাংশ করারোপের যে প্রস্তাব সরকার করেছে সেটি বাস্তবায়ন হলে খরচ নাগালের বাইরে চলে যাবে। মাঝপথে বন্ধ হয়ে যেতে পারে পড়াশোনা।
তামিমের আশঙ্কার সঙ্গে দ্বিমত নেই স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ফারাহ নাজ ফিরোজের। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেছেন, সরকার যদি আমাদের থেকে কর নেয় তাহলে এর চাপ শিক্ষার্থীদের ওপর গিয়েই পড়বে। করোনাকালে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আর্থিক দুর্দশায় আছে। নতুন এই সিদ্ধান্ত বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। যার ভুক্তভোগী হবে মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা।
ক্ষতির শিকার মধ্যবিত্তের চাপ বাড়বে
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২১-২২ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এই বাজেটকে ব্যবসায়ীবান্ধব বলে আখ্যা দিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডি বলেছে, করোনায় আর্থিক চাপে থাকা মধ্যবিত্ত ও ৬ কোটি দরিদ্র মানুষের জন্য বাজেটে তেমন কিছু নেই। ফলে এ বাজেট ধনীদের অতি ধনী করার সুযোগ দেবে। সংস্থাটির মতে, করোনার কারণে আয় কমে যাওয়ায় মধ্যবিত্তের হাতে টাকা নেই। কিন্তু বাজেটে বেশিরভাগ জিনিসের দাম বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবিত্তের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষার নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বা ইউজিসি। এই প্রতিষ্ঠানের হিসাব বলছে, বর্তমানে দেশে ১০৭টি সরকার অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। যেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৫ লাখ। এর বাইরে বেসরকারি কলেজগুলোতে আরও কয়েক লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। এসব শিক্ষার্থীর পরিবার অর্থনৈতিক মানদণ্ডে মধ্যবিত্ত। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়গুলোতে চার বছরের স্নাতক কোর্স শেষ করতে ৪ লাখ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয়। প্রতি বছর এই ফি বাড়ানো হয়। আইন অনুযায়ী যদিও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ট্রাস্ট বা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হওয়ার কথা। এরপরও নানা অসাধু কায়দায় শিক্ষার্থীদের থেকে টাকা আদায় করে ট্রাস্টি বোর্ড।
বেসরকারি উচ্চ শিক্ষায় করারোপের প্রস্তাবে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। গতকাল তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, সরকারের রাজস্ব দরকার। তারা বড় বড় ব্যবসায়ীদের কর ছাড়, ভ্যাট ছাড় দিয়েছে। এখন তারা চাইছে যেকোনো উপায়ে রাজস্ব আদায় করতে। এজন্য মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ দেওয়া হলো। যা নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত।
শিক্ষায় করারোপ আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ অনুযায়ী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ট্রাস্টের অধীনে চলার কথা। সে হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হবে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। ব্রিটিশ আমলে প্রণীত ট্রাস্ট আইন ১৮৮২ অনুযায়ী ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত হওয়ায় অলাভজনক প্রতিষ্ঠান করযোগ্য নয়। এর আগে ২০১০ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর কর ধার্য করা হলে হাইকোর্ট সেটি খারিজ করে দেয়। তার কয়েক বছর পরে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেটে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাটের প্রস্তাব করেন। সেবার এর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা ঢাকায় ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তুললে পরে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়।
বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির সভাপতি শেখ কবির হোসেন গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইউনিভার্সিটির ওপর করারোপ করার অর্থ শিক্ষার্থীদের ওপর করের বোঝা চাপানো। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলে শিক্ষার্থীদের টাকায়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর বসাতে হলে আইন পরিবর্তন করে এগুলো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ঘোষণা করতে হবে। তার আগে করা হলে এটা সম্পূর্ণ বেআইনি।
ওপরে ট্রাস্ট ভেতরে লাভ
আইন অনুযায়ী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তার খরচ মেটানোর পর যে টাকা উদ্বৃত্ত থাকবে সেটি শিক্ষার উন্নয়নে ব্যয় করার কথা। তবে বাস্তবতা হলো শিক্ষা ও শিক্ষার্থীর মানোন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পদক্ষেপ নেই বললেই চলে। তাদের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়গুলো নানা সময় ইউজিসির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। নানা অসাধু কায়দায় তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকা অন্য খাতে সরিয়ে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ইউজিসির সদস্য ড. দিল আফরোজা বেগম গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনটি এমনভাবে তৈরি এই আইনের ফাঁক গলে তারা হাজার হাজার কোটি টাকা নিজেদের পকেটে ভরছে। অথচ শিক্ষার উন্নয়নে তারা ন্যূনতম ব্যয় করছে। করোনায় আমরা তাদের বলেছি শিক্ষার্থীদের ছাড় দিতে, কাউকে ছাঁটাই না করতে অথচ তারা কোনো সুপারিশ মানেনি। তাদের এসব ভুল সংশোধনের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে পদক্ষেপ নিতে হবে। কর বসালে তো তারা আবার শিক্ষার্থীর গলা কাটবে। গণসাক্ষরতা অভিযানের উপপরিচালক কে এম এনামুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ট্রাস্টি বোর্ড নানা অনিয়মে যুক্ত। তারা শিক্ষার্থীদের টাকা নিজেদের পকেটে ভরছে। এখন তারা অসৎভাবে আয় করছে বলে তো সরকার তাদের অসৎ আয়ে ভাগ বসাতে পারে না।
ক্ষোভে ফুঁসছে শিক্ষার্থীরা
বেসরকারি উচ্চ শিক্ষায় ১৫ শতাংশ কর বসছে এমন খবরে গত বৃহস্পতিবার বাজেট ঘোষণার দিনই প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন। পরদিন শুক্রবার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের কয়েকটি সংগঠন সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন করে। বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতিও বিষয়টির প্রতিবাদ জানিয়েছে। ইতিমধ্যে শিক্ষার্থীরা ঘোষণা দিয়েছে অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা না হলে বড় কর্মসূচি গড়ে তোলা হবে। যেমনটা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। সে সময় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভ্যাট আরোপ করার প্রতিবাদে ঢাকায় লাগাতার কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের চাপে সেবার ভ্যাট বাতিল করতে বাধ্য হয় সরকার। ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কামরুল হাসান বলেন, করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার শিক্ষার্থী, তরুণ যুবক, মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ। কাজের অভাবে শিক্ষিত যুবকরা হাহাকার করছে। এই সময় সরকার এই শ্রেণির ওপর খড়গ বসাল। যা মৌলিক অধিকার পরিপন্থী।