খুলনায় সংক্রমণ উদ্বেগজনক মৃত্যু বাড়ছে রাজশাহী অঞ্চলে

করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় দেশের ভারত সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ক্লাস্টারভিত্তিক ‘লকডাউনের’ সুপারিশ করেছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ কমিটি। সেই আলোকে ইতিমধ্যে সীমান্তবর্তী কয়েকটি জেলা, উপজেলা ও বেশকিছু গ্রাম লকডাউন ঘোষণা ছাড়াও কিছু কিছু এলাকায় কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এমনসব পদক্ষেপের মধ্যেও সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে করোনা সংক্রমণের ঊর্ধŸগতি অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। এর মধ্যে খুলনা বিভাগের বাগেরহাটের মোংলার সংক্রমণ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক অবস্থায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। গত শনিবার সকাল থেকে গতকাল রবিবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় বাগেরহাট জেলায় করোনা শনাক্ত হয়েছে ৫৭ জনের।  এর মধ্যে শুধু মোংলাতেই শনাক্ত হয়েছে ৩৪ জন। অন্যদিকে করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বাড়ছে রাজশাহী অঞ্চলে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের করোনা ইউনিটে সর্বশেষ গত ১৪ দিনে মারা গেছে ১০৭ জন। এমন পরিস্থিতিতে রাজশাহীতে করোনা সংক্রমণের মাঠের প্রকৃত চিত্র জানতে রাস্তায় রাস্তায় করানো হচ্ছে করোনা পরীক্ষা। দিনাজপুরেও করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। সেখানে শনাক্তের তুলনায় মৃত্যুহার বেড়ে ৪.৪০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিস্তারিত দেশ রূপান্তরের সংশ্লিষ্ট জেলার প্রতিনিধি ও নিজস্ব প্রতিবেদকদের পাঠানো খবরে

বাগেরহাটে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে নতুন করে একজনের মৃত্যু হয়েছে। গত শনিবার সকাল থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় বাগেরহাট জেলায় ১৫৪ জনের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষায় করোনা শনাক্ত হয়েছে ৫৭ জনের। এর মধ্যে মোংলাতেই শনাক্ত হয়েছে ৩৪ জন। এ নিয়ে জেলায় করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে ৬৯২ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হলো। এছাড়া গত তিন মাসে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ২০ জনের।

বাগেরহাট সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. সুব্রত দাস জানান, মোংলা উপজেলায় একজন করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় জেলায় আক্রান্তের হার ৩৭ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে মোংলায় ৩৪ জন। এরপর রয়েছে মোরেলগঞ্জে ৯, ফকিরহাটে ৮, বাগেরহাট সদরে ৪ এবং মোল্লাহাটে ২ জন। জেলার করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে বর্তমানে ভর্তি রয়েছে ১২ জন।

বাগেরহাটের সিভিল সার্জন ডা. কেএম হুমায়ুন কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর পর গত ৮ মার্চ থেকে জেলায় ৬৯২ জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। আর মারা গেছে ২০ জন। যা প্রথম ঢেউয়ের তুলনায় বেশি।’ তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে মোংলা উপজেলায় উদ্বেগজনকহারে করোনা রোগী বাড়ছে। নমুনা সংগ্রহের হার অনুযায়ী প্রতিদিন করোনা রোগী শনাক্তের হার ৬০ থেকে ৭০ ভাগ ওঠানামা করছে। এছাড়াও শরণখোলা ও মোরেলগঞ্জ উপজেলাতেও সংক্রমণের হার বাড়তে শুরু করেছে। এ দুই উপজেলাতে যাতে সংক্রমণের বিস্তার বাড়তে না পারে সেজন্য ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

সংক্রমণের বিস্তার বাড়লেও সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের অনেকেই স্বাস্থ্যবিধি মানছে না জানিয়ে সিভিল সার্জন বলেন, ‘স্বাস্থ্যবিধি মানতে বাধ্য করার জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত ও চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। জেলাজুড়ে যাতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বিস্তার লাভ না করতে পারে সেজন্য প্রশাসন সতর্ক রয়েছে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে স্বাস্থ্যবিধি মানার বিকল্প নেই।’

মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জীবিতেষ বিশ্বাস বলেন, ‘মোংলায় গত শনিবার করোনা শনাক্তের হার ছিল শতকরা প্রায় ৭১ ভাগ। গতকাল তা দাঁড়ায় প্রায় ৫৩ ভাগে। এর আগে সপ্তাহ দুই ধরে এখানে শনাক্তের হার ছিল ৫৫ থেকে ৭১ শতাংশ পর্যন্ত। তবে চলতি সপ্তাহের নমুনা সংগ্রহ প্রক্রিয়া শেষ না হলে সংক্রমণের হার ঊর্ধ্ব নাকি নিম্নগামী তা বলা সম্ভব নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘গত ৪ এপ্রিল থেকে ৬ জুন পর্যন্ত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩৭২ জন নমুনা পরীক্ষা করিয়েছে। তার মধ্যে ২০৯ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। বিশেষ করে গত দুই সপ্তাহ ধরে এখানে করোনা শনাক্তের হার বাড়তে থাকে। যাদের করোনা শনাক্ত হচ্ছে তারা ঠিকমতো বিধিনিষেধ মানছে না। আমরা এবং প্রশাসনও তাদের মানাতে পারছি না। সংক্রমণ রোধে আক্রান্ত কিংবা শনাক্তদের চিহ্নিত করে হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। এজন্য অবশ্যই স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কঠোর হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। আক্রান্তদের আটকাতে না পারলে সংক্রমণ আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।’

রামেক হাসপাতালে আরও ৬ মৃত্যু : রামেক হাসপাতালের করোনা ইউনিটে এক দিনে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। গত শনিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টার মধ্যে তাদের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে দুজন করোনা পজিটিভ ছিল আর চারজন করোনা উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।

রামেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সাইফুল ফেরদৌস জানান, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মৃতদের মধ্যে একজন রাজশাহীর আর তিনজনের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। এছাড়া নাটোরের একজন এবং একজনের বাড়ি চুয়াডাঙ্গায়। গত ২৪ মে থেকে ৬ জুন পর্যন্ত ১৪ দিনে রামেক হাসপাতালের করোনা ইউনিট ও আইসিউতে এ নিয়ে মারা গেল ১০৭ জন। গতকাল সকাল পর্যন্ত হাসপাতালটির করোনা ইউনিটে রোগী ভর্তি ছিল ২৩৫ জন।

সংক্রমণের মাঠের চিত্র জানতে ভ্রাম্যমাণ টেস্ট : রাজশাহীতে করোনা সংক্রমণের মাঠের প্রকৃত চিত্র জানতে রাস্তায় রাস্তায় করানো হচ্ছে করোনা পরীক্ষা। গতকাল সকাল থেকে ভ্রাম্যমাণ এ টেস্ট ক্যাম্পেইন শুরু হয়। এজন্য রাজশাহী নগরীর পাঁচটি স্থানে বুথ বসানো হয়। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এবং জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সহযোগিতায় এ ফ্রি র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন করোনা টেস্ট করানো হয়। রাস্তায় চলমান সাধারণ মানুষকে ডেকে এনে এ করোনা পরীক্ষা করানো হচ্ছে।

ঈদের পর থেকে রাজশাহীর করোনা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। সর্বশেষ গত শনিবার রাজশাহীর দুটি ল্যাবে ৫৪২ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ২৯২ জনের করোনা শনাক্ত হয়। এর মধ্যে রাজশাহীর ৩৬৬ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ১৮৪ জনের করোনা পজিটিভ রিপোর্ট আসে। আর চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১৭৬ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ১০৮ জনের করোনা পজিটিভ এসেছে।

রাজশাহীর জেলা সিভিল সার্জন কাইয়ুম তালুকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের পাঁচটি টিম নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে করোনার টেস্ট করছে। সব পয়েন্টে ১ হাজার ২০০ টেস্ট করা যাবে। এগুলো করা হচ্ছে আমাদের সংক্রমণের যে হার সেটির প্রকৃত চিত্র দেখার জন্য। এ ফলাফল পর্যালোচনা করে আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারব লকডাউন বা বিধিনিষেধের বিষয়ে পরবর্তী নির্দেশনা কী দেওয়া হবে।’

এদিকে করোনা পরিস্থিতির অবনতি ঘটনায় রাজশাহীতে চলমান ‘লকডাউন’ আরও কঠোর করা হয়েছে। প্রতিদিন বিকেল ৫টা থেকে পরের দিন সকাল ৬টা পর্যন্ত সব দোকানপাট বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ সময়ে অটোরিকশাসহ নগরীতে যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মানুষজনকে বাড়ি থেকে বের না হওয়ার জন্য বলা হয়েছে। আজ সোমবার বিকেল থেকে এ নির্দেশনা কার্যকর হবে। গতকাল বিকেলে রাজশাহীর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে করোনা পরিস্থিতি নিয়ে পর্যালোচনা সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে সাংবাদিকদের সামনে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানান রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন।

করোনা পরিস্থিতির অবনতির কারণে এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাত্রিকালীন কঠোরতা আরোপ করে রাজশাহী জেলা প্রশাসন। ওই নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টা থেকে পরবর্তী দিন সকাল ৬টা পর্যন্ত কঠোর ‘লকডাউন’ পালিত হয়ে আসছিল।

দিনাজপুরে করোনায় মৃত্যুহার বেড়ে ৪.৪০ শতাংশ : দিনাজপুরে করোনায় আক্রান্ত হয়ে নতুন করে আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে জেলায় মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ১৩৬ জনে। সব মিলিয়ে চলতি মাসের ছয় দিনে আটজনের মৃত্যু হলো।

দিনাজপুর সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় দিনাজপুরে ১৬৪টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়, যার মধ্যে করোনা শনাক্ত হয় ৪০ জনের। শনাক্তের হার ২৪.৩৯ শতাংশ। সর্বশেষ ছয় দিনে জেলায় মোট করোনা আক্রান্ত হয়েছে ১৮২ জন। শনাক্তের বিবেচনায় মৃত্যুহার ৪.৪০ শতাংশ। গত মাসেও এ জেলায় শনাক্তের বিবেচনায় মৃত্যুহার ছিল ৪.৩৬ শতাংশ। অর্থাৎ এ  জেলায় মৃত্যুহার দিন দিন বাড়ছে।

এখন পর্যন্ত জেলায় যে ১৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে তার মধ্যে ৬৫ জনই সদরের। অর্থাৎ জেলার ১৩টি উপজেলার মধ্যে এ উপজেলায় মৃত্যুহার ৪৭.৮০ শতাংশ। আর ৫ হাজার ৯৮৮ জন আক্রান্তের মধ্যে ৩ হাজার ৩৮৫ জনই সদর উপজেলার। সেই হিসাবে এ উপজেলার আক্রান্তের হার ৫৬.৫৩ শতাংশ। দিনাজপুরে বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে ৩৯ জন রোগী আর হোম আইসোলেশনে ২৮৫ জন।

চুয়াডাঙ্গার ১০ গ্রামে ‘লকডাউন’ শুরু : চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার ভারত সীমান্তঘেঁষা ১০টি গ্রামে শুরু হয়েছে ‘লকডাউন’। গতকাল সকাল থেকে গ্রামগুলোতে ‘লকডাউন’ কার্যকর করা হয়েছে। এর আগে গত শনিবার উপজেলাপর্যায়ের করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কমিটির জরুরি সভায় গ্রামগুলো ‘লকডাউনের’ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এছাড়া গত ২ জুন থেকে উপজেলার কার্পাসডাঙ্গা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী সাতটি গ্রামে ‘লকডাউন’ চলমান রয়েছে। দুই দফায় এ নিয়ে দামুড়হুদা উপজেলার ১৭টি গ্রাম ‘লকডাউনের’ আওতায় এলো।