বিভাগীয় মামলার দীর্ঘসূত্রতা

গতকাল সোমবার দেশ রূপান্তরে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে হওয়া বিভাগীয় মামলার দীর্ঘমেয়াদি তদন্ত নিয়ে যে তথ্য উন্মোচিত হয়েছে, তা অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। দেশ পরিচালনার কাজে যারা জড়িত, যাদের কাছে দেশের সাধারণ নাগরিকরা নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করে, উল্টো তাদের মধ্যেই বিচারহীনতায় ন্যায়বিচারপ্রত্যাশী মানুষের সমস্ত আশা-ভরসা শেষ হয়ে যায়।

গত বছর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বিভাগীয় মামলা বৃদ্ধির হার ছিল ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বিভাগীয় মামলা ছিল ১১ হাজার ৪৯৯টি। এর মধ্যে চাকরিচ্যুত বা বরখাস্ত হয়েছেন ৫২৫ জন। বিভিন্ন মেয়াদে দ- পেয়েছেন ৩ হাজার ৩৪৮ জন। বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন ১ হাজার ৬২৫ জন।

দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুলিশ থেকে শুরু করে প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা প্রায় নানা অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়েন। আবার প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তারা যে এই অপরাধমূলক কাজে জড়ান না, তা নয়। তাদের বিরুদ্ধেও দায়িত্বপালনে অনীহা থেকে শুরু করে কর্মস্থলে অনুপস্থিত, দুর্নীতি-অনিয়ম ও নৈতিক অধঃপতনের অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। তবে এসব ঘটনায় বিভাগীয় মামলার চলমান তদন্ত সহসা শেষ হয় না। দিনের পর দিন এসব বিভাগীয় মামলার তদন্ত চলে। সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব ও উপসচিবরা এসব তদন্ত করছেন। সময়মতো এসব তদন্ত শেষ না হওয়ার কারণে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হচ্ছে। প্রশাসন কর্মকর্তাদের নৈতিক অধঃপতন ও অপরাধপ্রবণতা যে এমন ভয়ংকর মাত্রা অর্জন করেছে, তা দেখে গভীর উদ্বেগ জাগে। তাদের বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাতে উল্টো সরকারের আরও সময় ও অর্থ অপচয় হয়। তারপরেও ফলাফল পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দূর হয় না। দীর্ঘকালব্যাপী তদন্ত বিচার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

প্রায়ই দেখা যায়, নানা রকম অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পরেও এসব অন্যায়-অপরাধের তথ্য বেরিয়ে আসার পরও তাদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, শুধু তাদের কর্মক্ষেত্র পরিবর্তন করা হয়েছে। কোনো বিভাগীয় মামলার পরে বিচার হয়েছে, এমন দৃষ্টান্ত এই দেশে অত্যন্ত বিরল। তৃণমূল পর্যায়ে দায়িত্বপালন করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে গুরুতর অপরাধপ্রবণতা আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও আইন প্রয়োগের ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। অভিযুক্ত সদস্যের বিচার নিশ্চিত করা না গেলে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর জনমুখিতা ও সেবাধর্মিতা গুরুতরভাবে হ্রাস পেতে পারে। এতে করে জনসাধারণের আস্থা ও বিশ্বাস আরও কমে  যেতে পারে। এ ধরনের ক্ষতিকর উপাদান থেকে দেশের প্রশাসন বিভাগকে মুক্ত করার জন্য শক্তিশালী জবাবদিহি ব্যবস্থা প্রয়োজন। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার তদন্ত বিলম্বিত হলে কর্মকর্তাদের পদোন্নতিসহ প্রাপ্য অনেক কিছু ঝুলে থাকে। যারা তদন্তের দায়িত্বে থাকেন তাদের নিজ নিজ দপ্তরের দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সরকারের কর্মঘণ্টাও নষ্ট হয়। আবার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিভাগীয় মামলায় যথাযথ শাস্তি হয় না। নানাভাবে প্রভাব খাটিয়ে ও কৌশল প্রয়োগ করে গুরুদণ্ডকে লঘুদণ্ড আর লঘুদণ্ডকে শাস্তির বাইরে রাখা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ প্রাথমিক তদন্তে সন্দেহাতীতভাবে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরই বিভাগীয় মামলা করা হয়। বিভাগীয় মামলায় কাউকে দোষী সাব্যস্ত করলে অভিযোগ গঠন করে জনপ্রশাসন সচিব কারণ দর্শানো নোটিস জারি করেন। অভিযুক্ত কর্মকর্তা চাইলে ব্যক্তিগত শুনানি গ্রহণ করেন। এরপর কাউকে শাস্তি বা অব্যাহতি দেওয়া হয়। কিন্তু দেখা যায় এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দীর্ঘ সময় চলে যায়। তিন মাস থেকে ত্রিশ মাসেও শেষ হয় না তদন্ত কাজ। সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে মনে হচ্ছে- বিভাগীয় এসব মামলার তদন্তকাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে স্বতন্ত্র তদন্ত কমিশন গঠন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এমন একটি তদন্ত কমিটি গড়ে তুলতে হবে যারা নিরপেক্ষভাবে দ্রুত তদন্তকাজ শেষ করবে। এই কমিটিকে স্বাধীনভাবে কাজ করার জন্য প্রয়োজনে আইনের সংস্কার করা যেতে পারে। 

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তদন্ত বছরের পর বছর ঝুলে থাকার কোনো সুযোগ  নেই। এমনও হতে পারে, তদন্ত শেষে নিরপরাধ প্রমাণ হলে পদোন্নতি দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পদোন্নতি দেওয়া হবে না এমন একটা বিষয় থেকেও তদন্ত ঝুলিয়ে রাখা হতে পারে। আরও নানা কারণে তদন্ত ঝুলিয়ে রাখা হয়। যদি কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি বা দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা চলমান থাকে সে ক্ষেত্রেও বিভাগীয় মামলা বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখা যাবে না। বিভাগীয় মামলা নিজস্ব নিয়মে চলতে থাকবে।

২০১৮ সালের সরকারি চাকরি আইনে এ সংক্রান্ত কোনো বাধা নেই, সরকারি চাকরি আইনের আগেও এ সংক্রান্ত কোনো বাধা ছিল না। প্রচলিত আইনে কোনো বাধা না থাকলেও তদন্তকাজের এই কচ্ছপ গতি একটি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক শুদ্ধতার জন্য হুমকি স্বরূপ। অচিরেই এই অচলাবস্থা দূর করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে পদক্ষেপ নিতে হবে।