কভিড প্রতিরোধক টিকা না নিয়ে যেসব প্রবাসী বাংলাদেশি সৌদি আরব যাচ্ছেন, তাদের কাছ থেকে কোয়ারেন্টাইনের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে বিমান। অবস্থানভেদে অতিরিক্ত টাকার পরিমাণ ১১ হাজার থেকে ২১ হাজার টাকা পর্যন্ত। অতিরিক্ত টাকা ব্যয়ের পরও প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিম্নমানের ফার্নিশড অ্যাপার্টমেন্টে রাখা হচ্ছে। এসব অ্যাপার্টমেন্টের পরিবেশ এবং খাবার মান অত্যন্ত নিম্নমানের। এমনকি ঠিকভাবে পানীয়জল সরবরাহ করা হয় না। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মস্থান মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য গতকাল সোমবার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চিঠি দিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোকাম্মেল হোসেন গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ধরনের কিছু অভিযোগ আমরা পেয়েছি। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু অনেক কিছু আমাদের হাতে নেই। ওই দেশের সিস্টেম অনুসরণ করতে হয়।’ সচিব বিষয়টি নিয়ে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
পরে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও আবু সালেহ মো. মোস্তফা কামালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সৌদি আরবের বিষয়গুলো বাস্তবায়নের জন্য আইসিডিএস নামে একটা সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া আছে। তাদের মাধ্যমেই যেতে হবে। সৌদি এয়ারলাইনসও তাদের সেবা নিচ্ছে। শুরুতে ওরা যে রেট দেখায় একপর্যায়ে তা বেড়ে যায়। কম রেটের হোটেলগুলো দ্রুত শেষ হয়ে যায়। শুধু বিমানই নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী এয়ারলাইনসগুলোও তাদের সেবা নেয়। কাজেই যারা আগে বুকিং দিতে পারে, তারাই কম দরের হোটেল পায়। আমাদের যাত্রীদের বেশির ভাগই শ্রমিক শ্রেণির হওয়ায় তারা কম দামেরটিই চায়। কিন্তু দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলেই আর কম দামের রুম পাওয়া যায় না। টিকিট করার সময় বিষয়টি যাত্রীদের অনলাইনেই দেখানো হয়। আমরা অনুভব করি আমাদের শ্রমিকদের জন্য এই খরচটা অত্যন্ত বেশি। কিন্তু অপাতত আমাদের কিছু করার নেই। বিকল্প কিছু করার থাকলে আমরা অবশ্যই করব।’
বৈশি^ক মহামারী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে কোয়ারেন্টাইন ইস্যুতে কঠিন শর্ত জুড়ে দিয়েছে সৌদি সরকার। ঢাকা থেকে সৌদি আরবের দাম্মাম, রিয়াদ ও জেদ্দা রুটে চলাচল করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। এসব রুটে চলে সৌদি এয়ারলাইনস বা সাউদিয়া। এসব রুটের একমুখী প্লেন (ওয়ান ওয়ে) ভাড়া সর্বনিম্ন ৪৫ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৫৭ হাজার টাকা। রুটগুলোর যাত্রীদের টিকিটের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে সাত দিনের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনের খরচ। সৌদি সরকারনির্ধারিত হোটেলে এই কোয়ারেন্টাইনের খরচ ৬৫ হাজার ৭০০ টাকা, যা টিকিটের মূল্যের চেয়েও প্রায় ২০ ভাগ বেশি। টিকিটের চেয়ে ২০ ভাগ বেশি এই খরচে দিশেহারা যাত্রীরা; বিশেষ করে শ্রমিকরা এই টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। টিকিটের মূল্যের সঙ্গেই কেটে নেওয়া হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনের এই খরচ।
৩ জুন সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাস স্থানীয়ভাবে যারা কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন তাদের সম্পর্কে প্রতিবেদন পাঠায়। সেই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করে গতকাল।
সৌদি সরকার গত ২০ মে নিয়ম করে দেশটিতে যেতে হলে কভিড টিকা নেওয়া বাধ্যতামূলক। কেউ টিকা না নিয়ে সেখানে গেলে তাকে সাত দিনের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। এই নির্দেশনার ফলে বাংলাদেশি কর্মীরা কোয়ারেন্টাইন বাবদ ৬২ হাজার ৩০০ থেকে ৬৩ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত বিমানকে পরিশোধ করেন। প্রবাসীকলাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, বাংলাদেশি শ্রমিকদের কোয়ারেন্টাইনে যে হোটেলে রাখা হয় তার ভাড়া ৪০ হাজার ৬০০ থেকে ৫১ হাজার ৮৬৫ টাকার বেশি না। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোয়ারেন্টাইন বাবদ ৭৮ হাজার ৩১৫ টাকা দিতে বাধ্য করা হয়। কোয়ারেন্টাইন বাবদ ৭৮ হাজার ৩১৫ টাকা পরিশোধ করা হলেও তাদের অত্যন্ত নিম্নমানের ফার্নিশড হোটেলে রাখা হয়। যার কক্ষপ্রতি দৈনিক ভাড়া সর্বোচ্চ ১০০ থেকে ১৫০ সৌদি রিয়াল। এসব অ্যাপার্টমেন্টের পরিবেশ অত্যন্ত নিম্নমানের। সরবরাহ করা খাবারও নিম্নমানের। এমনকি পানীয়জল ঠিকমতো সরবরাহ করা হয় না। অর্থ পরিশোধের সময় বিমান বাংলাদেশি শ্রমিকদের তিন তারকা হোটেলে রাখার প্রতিশ্রুতি দিলেও নিম্নমানের হোটেলে রাখা হচ্ছে।
সৌদি সরকারের বিধিনিষেধ : সম্প্রতি এক আদেশে ২০ মে থেকে বাংলাদেশ থেকে সৌদিগামী প্রবাসী শ্রমিকদের প্রবেশে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করে সৌদি সরকার। যারা করোনাভাইরাসের টিকা নেননি, সৌদি প্রবেশ করলে তাদের সাত দিন হোটেলে বাধ্যতামূলক প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। সে ক্ষেত্রে হোটেলের খরচ নিজেকেই বহন করতে হবে। সৌদি সরকার জানায়, সে দেশে যাওয়ার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পিসিআর পদ্ধতিতে করোনা নেগেটিভ রিপোর্ট এলেই কেবল ঢাকা থেকে যাত্রীরা ফ্লাইটে উঠতে পারবেন। সৌদিতে পৌঁছানোর পর আরও দুইবার করোনা টেস্ট করাতে হবে। প্রথমবার টেস্ট করাতে হবে পৌঁছানোর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। ষষ্ঠ দিনে আবারও করোনা টেস্ট করা হবে। টেস্টের খরচ যাত্রীকেই বহন করতে হবে। টেস্টে নেগেটিভ রিপোর্ট এলে হোটেলে কোয়ারেন্টাইনে থেকে ৭ম দিনে নিজের বাসায় যাওয়া যাবে। তা ছাড়া যারা পূর্ণ ডোজ টিকা নিয়েছেন, তাদের টিকা নেওয়ার প্রমাণপত্র সঙ্গে রাখতে হবে। সে ক্ষেত্রে ফাইজার-বায়োএনটেকের দুই ডোজ, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার দুই ডোজ, মডার্নার দুই ডোজ এবং জনসন অ্যান্ড জনসনের টিকার এক ডোজ যারা নিয়েছেন, তারা হোটেলে বাধ্যতামূলক প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে থাকার বদলে বাসায় কোয়ারেন্টাইনে থাকার সুবিধা পাবেন। প্রথমবারের মতো প্রবাসীকে সৌদি যাওয়ার আগে হেলথ ইনস্যুরেন্স করাতে হচ্ছে। করোনা আক্রান্ত হলে ইনস্যুরেন্স প্রতিষ্ঠান তার চিকিৎসা ব্যয় বহন করবে এমন বিষয়টি এতে স্পষ্ট উল্লেখ থাকতে হবে। ভ্রমণসংক্রান্ত ক্ষেত্রে মিথ্যা তথ্য দিলে শাস্তি হিসেবে দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার কথাও বলেছে সৌদি সরকার। কেউ যদি করোনাভাইরাস ছড়ায় তাকে ৫ বছরের জেল এবং সর্বোচ্চ ৫ লাখ সৌদি রিয়াল জরিমানা করবে দেশটির সরকার। যদি সেই ব্যক্তি অন্য দেশের হয়, সে ক্ষেত্রে তাকে শাস্তি দেওয়ার পর সৌদি থেকে বিতাড়িত করা হবে এবং তিনি আর কোনো দিন সৌদি আরবে যেতে পারবেন না।