প্রতি সপ্তাহেই আগুন লাগে সাততলা বস্তিতে

নয় বছরে পাঁচবার ভয়াবহ আগুনে পুড়েছে মহাখালী সাততলা বস্তি। ছোটখাটো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে শতাধিকবার। ফায়ার সার্ভিস কর্র্তৃপক্ষ প্রতিবারই তদন্ত করে বলছে, ঘটনাগুলো ঘটছে শর্টসার্কিট কিংবা ত্রুটিপূর্ণ গ্যাসলাইনের লিকেজ থেকে। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতি সপ্তাহেই আগুন লাগে সেখানে। এই আগুনে প্রতিবারই বস্তিবাসী ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়। তারা আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে ফায়ার সার্ভিসের তথ্য বিশ্বাস করতে চায় না। তাদের দাবি, এসবের সঙ্গে রয়েছে দখলবাজি, চাঁদাবাজিসহ আধিপত্য বিস্তারের। তবে স্থানীয় কাউন্সিলরও ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে এক মত।  তার মতে, বিদ্যুৎ ও গ্যাসলাইনের চুলা থেকে এসব আগুন লাগে।

গতকাল সোমবার ভোররাত ৪টার দিকে সাততলা বস্তিতে আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রথমে ফায়ার সার্ভিসের ৪টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। আগুন ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করলে ফায়ার সার্ভিসের মোট ১৮টি ইউনিট আড়াই ঘণ্টার চেষ্টায় সকাল ৬টা ৩৪ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বস্তির পশ্চিম-দক্ষিণ কোণে গ্যাসের লাইন থেকে আগুনের সূত্রপাত। প্রথমে বালিচাপা দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন তারা। তবে আগুন না নিভে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বস্তির উত্তর-পূর্ব দিকে। আগুনে পুড়ে যায় দেড় শতাধিক ঘর। পরে দাউ দাউ আগুনে দুই শতাধিক ঘর পুড়ে যায়।

বস্তিবাসীর ভাষ্য, আগুন লাগার পর অধিকাংশ মানুষই সন্তান কোলে এককাপড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে জীবন রক্ষা করেন।

আগুনের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক নূর হাসান আহম্মেদকে সভাপতি করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, অবৈধ গ্যাসের লাইন বা বিদ্যুতের লাইনের ত্রুটি থেকে এই আগুন লেগে থাকতে পারে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে। তিনি বলেন, বস্তির ত্রুটিপূর্ণ গ্যাস ও বৈদুতিক লাইন থেকে এর আগেও কয়েকবার আগুন লাগার তথ্য আমরা জানতে পেরেছি।

সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, বস্তিতে টিনের ঘর অনেক বেশি ও কাছাকাছি হওয়ায় আগুন নেভাতে বেগ পেতে হয়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আমাদের ১৮টি ইউনিট কাজ করেছে। এখন পর্যন্ত আগুনে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা এখনই বলা সম্ভব নয়। তবে শতাধিক ঘর পুড়ে গেছে বলে আমরা ধারণা করছি। ঘরে থাকা আসবাব পুড়ে গেছে।

আগুনের কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, এখানে প্রচুর পরিমাণে অবৈধ গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন রয়েছে। আমরা প্রাথমিকভাবে মনে করছি, এই দুটির যেকোনো একটির কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। ঘনবসতি, দাহ্য বস্তু বেশি থাকায় আগুন বেশি ছড়িয়েছে।

তিনি বলেন, আগুনের কারণ অনুসন্ধানে একজন ডেপুটি ডিরেক্টরের (ডিডি) নেতৃত্বে চার সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানে আগুনের প্রকৃত কারণ বেরিয়ে আসবে বলে আমরা আশা করছি।

বস্তির বাসিন্দা বগুড়ার সারিয়াকান্দির হোসেন মিয়া জানান, তারা কয়েকজন পাঁচ বছর থেকে থাকেন বস্তিতে। বাস্কেট, ফুলদানি, খেলনা, পাপস, জায়নামাজ তৈরি করে বাজারে বিক্রি করেন। বড় একটা কুঠিরশিল্প গড়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের। তবে গতকাল ভোরের আগুনে মাল-সামানা, কাঁচামাল সব পুড়ে ছাই। করোনার মধ্যে দুই লাখ টাকার পণ্য ও নগদ প্রায় এক লাখ টাকা পুড়ে গেছে তাদের।

পুড়ে কালো রং ধারণ করা ঘরে দাঁড়িয়ে ছিলেন পটুয়াখালীর বাউফলের কোহিনূর বেগম। তার স্বামী হারুন রিকশা চালান। কোহিনূর বাসাবাড়িতে কাজ করেন। শাশুড়ি, সন্তান আর স্বামীসহ ঘুমিয়েছিলেন তিনি। আগুনে ঘর থেকে এককাপড়ে বেরিয়ে আসেন। এখন সবার ঠাঁই খোলা আকাশের নিচে।

আগুনের কারণ সম্পর্কে বাসিন্দাদের কেউ কেউ বলেন, অবৈধ গ্যাসসংযোগের লিকেজ থেকে আগুন লেগেছে। বস্তির বাসিন্দা মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘রাত সাড়ে ৩টার দিকে বস্তির দক্ষিণ পাশে একটি ঘরে রান্নার কাজ চলছিল। চুলা থেকে হঠাৎ করে গ্যাস লিকেজ হয়ে আগুন ছড়ি পড়ে সারা ঘরে। আগুন লাগার পর ঘরের মানুষজন আগুন আগুন বলে চিৎকার শুরু করলে কোনো মতে জীবনটা নিয়ে বের হই।’

আরেক বাসিন্দা নজরুল বলেন, বস্তির সব থেকে খারাপ জিসিস হচ্ছে গ্যাসের লাইন। দুই দিন পর পর শোনা যায় বস্তির ভেতরে ওই জায়গায় গ্যাস লিকেজ হইছে, ওই ঘরের গ্যাসলাইন থেকে গ্যাস বের হচ্ছে। পরে যারা গ্যাস দিয়েছে তাদের অভিযোগ দিলে তারা এসে কোনোমতে প্লাস্টিক দিয়া জোড়াতালি দিয়ে লিকেজ বন্ধ করে যায়। পরে আবার সেই প্লাস্টিক উঠে গেলে আবার লিকেজ শুরু হয়।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বস্তির এক বাসিন্দা বলেন, বস্তিটি পরিচালিত হয় স্থানীয় রাজনৈতিক লোকদের দ্বারা। যখন যে দলের সরকার থাকে, তখন সেই দলের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা বস্তিটি নিয়ন্ত্রণ করে। তারাই মূলত বিদ্যুৎ অফিস ও তিতাস গ্যাসের সঙ্গে যোগসাজশ করে বস্তিতে অবৈধ সংযোগ দেয়। মাঝেমধ্যেই গ্যাসলাইনে লিকেজ হয়। আমরা খবর দিলে স্থানীয় নেতারা মেকানিকস এনে রাবার দিয়ে লাইন ঠিক করে যায়। কয়েক বছর বারবার আগুন লাগায় গ্যাসলাইনের সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবি করলে তারা নিজেদের গুণ্ডাবাহিনী দিয়ে আমাদের হুমকি দেয়। আবার অনেক সময় মারধরও করে। বস্তিবাসী অধিকাংশই খেটে খাওয়া মানুষ। ভয়ে কেউ কিছু বলে না। আর সরকারের পক্ষ থেকেও কেউ আসে না অবৈধ গ্যাসসংযোগের খোঁজ নিতে।’

বস্তির বাসিন্দা আয়নাল মিয়া জানান, ২০১২ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট পাঁচবার পুড়েছে সাততলা বস্তি। ২০১২, ২০১৫ ও ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে এবং ২০২০ সালের ২৪ নভেম্বর রাজধানীর এ বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। প্রতিবারই গ্যাস অথবা বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে তারা জেনেছেন। তবে বস্তির অপর বাসিন্দা সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আধিপত্য বিস্তার ও ভাড়া তোলাকে কেন্দ্র করেও প্রতিপক্ষ আগুন দেয় বস্তিতে।

সাততলা বস্তিটি পড়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২০ নম্বর ওয়ার্ডে। স্থানীয় কাউন্সিলর মোহাম্মদ নাছির বস্তিতে নাশকতাজনিত কারণে আগুন লাগানোর অভিযোগ নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, গ্যাসলাইনের লিকেজ থেকে এই আগুন লেগেছে। গ্যাসের চুলার ওপর কাপড় শুকাতে দেওয়ায় এই আগুন লেগেছে বলে আমরা প্রাথমিকভাবে শুনেছি। গ্যাস-বিদ্যুতের ত্রুটিপূর্ণ লাইন থেকে প্রতি সপ্তাহেই ছোটখাটো আগুন লাগার কথা স্বীকার করেন তিনি। নাসির বলেন, আগুন লাগার পর বস্তিবাসীদের পুনর্বাসন করার কাজ চলছে। গতকালই ৯৫০ পরিবারকে ত্রাণসহায়তা দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে চার ট্রাক ত্রাণসামগ্রী এসেছে। ওয়ার্ড কাউন্সিলরের উদ্যোগে সবার জন্য তিন বেলা রান্না করা খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও স্যালাইনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বসানো হয়েছে ভ্রাম্যমাণ টয়লেট। বানানো হয়েছে শেল্টার।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেছেন, অগ্নিদুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত সাততলা বস্তির কেউই অভুক্ত থাকবে না। তাদের সহায়তায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রাজধানীর মহাখালীতে অগ্নিদুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত সাততলা বস্তি সরেজমিনে পরিদর্শনকালে তিনি এসব কথা বলেন। ডিএনসিসির মেয়র বলেন, সাততলা বস্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারের জন্য নগদ ৫ হাজার করে টাকা, তিন বেলা খাবার, ঢেউটিন এবং প্রায় ২ হাজার টাকার শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মেয়র বলেন, বস্তিবাসী আমাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই তাদের উচ্ছেদ নয় পুনর্বাসনের লক্ষ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা মোতাবেক কাজ করা হচ্ছে।