কবির আত্মবিশ্বাসের কথা খুব জোর দিয়ে উল্লেখ করতেন কবি আল মাহমুদ। অভিজ্ঞতা, প্রেরণা, মননশক্তির যে যৌথ অনুরণন ও অনুলেপন একজন কবির কবিতার মধ্যে আমরা দেখতে পাই, তার সবটাই বিফলে যেতে পারে এই আত্মবিশ্বাসের অভাবে। প্রশ্ন হয়তো উঠবে, একজন কবিকে এই আত্মবিশ্বাসের শক্তি জোগায় কে? এর উত্তর নানারকম হতে পারে। তবে কবির দার্শনিক অবস্থান, তার কাব্যিক ও রাজনৈতিক প্রত্যয় এ ক্ষেত্রে একটি প্রধান ভূমিকা পালন করে থাকে। এই ভূমিকা, যা কি না কবির অবস্থানকেও একজন পাঠকের পক্ষে বুঝে নিতে সুবিধা হয়। তাতে করে পাঠক সব সময়ই যে কবির ওই অবস্থানের সঙ্গে সামীপ্য বোধ করবেন, তা কিন্তু না-ও হতে পারে। কিন্তু পাঠকের দিক থেকে ওই কবির কবিতাপাঠের ক্ষেত্রে সেটি তেমন কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে না। পারে না, যদি কবি ও পাঠকদুই পক্ষই পরস্পরের মর্ম সন্ধানী হয়ে থাকেন।
২. যাকে আমরা আজ বাংলাদেশের সাহিত্য হিসেবে চিহ্নিত করে থাকি, সেই সাহিত্যের ধারায় আত্মবিশ্বাসী ও মর্ম সন্ধানী বলতে যেসব কবির নাম প্রথমেই আমাদের অভিজ্ঞতায় এসে পৌঁছোয়, তাদের মধ্যে ফররুখ আহমদ (জন্ম : ১০ জুন, ১৯১৮) অন্যতম। চল্লিশের দশকে যাদের কবিতায় এক ধরনের জনজাগরণ আমরা দেখতে পেয়েছি, তাদের মধ্যে সামনের কাতারেই তার অবস্থান। কবিতা তার কাছে কোনো শিল্প-নির্মিতি কিংবা নিছক নির্মাণ-প্রকরণ ছিল না, বরং তিনি তার ব্যক্তিগত বিশ্বাসে ভর দিয়ে যে-মুক্তির পথ খুঁজে চলেছিলেন, তারই একটি নিশ্চিত অবলম্বন ছিল। সে-কারণে, তার দার্শনিক বিশ্বাস ও আদর্শকে বাদ দিয়ে ফররুখের কবিতার শিল্পরসের স্বাদ যেমন আমরা আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করতে পারি না, তেমনই তাকে বিশ্লেষণ করতে গেলেও পদে-পদে বাধাগ্রস্ত হই।
৩. ফররুখের বেলায় এই ব্যাপারটি তার কবি-জীবনের শুরুতে অনেকেই ধরতে পারেননি। আবার কেউ-কেউ সেটি খেয়াল করতেও ভুল করেননি। চল্লিশের দশকের আরেকজন উল্লেখযোগ্য কবি, যিনি ফররুখ আহমদের সমসাময়িক ছিলেন, সেই আবুল হোসেন ঠিকই তার শৈল্পিক যথার্থতায় বলেছিলেন, ‘চল্লিশের দশকে আমাদের সমাজে কবিতার যে রূপান্তর... তিনি মুক্তির পথ খুঁজেছিলেন ভিন্ন পথে।’ কী সেই পথ? আর সেই পথের রূপরেখার বিবরণ দিতে গিয়ে আবুল হোসেন বলেছেন‘তিনি আমাদের মুক্তির পথ খুঁজেছিলেন ভিন্ন পথে। আমাদের সমাজে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিস্তার তার কাছে সামাজিক নবজাগরণের রূপ নিয়ে দেখা দিয়েছিল। তার মধ্যে তিনি দেখেছিলেন অনন্ত আশার আলো, পেয়েছিলেন অফুরন্ত উদ্দীপনা।’ আর তার সেই ‘আলো’, সেই ‘উদ্দীপনা’ ফররুখের কবিতায় এক নতুন স্বর ও সুরের ব্যঞ্জনা এনে দিয়েছিল, সেটি উল্লেখ করতেও আবুল হোসেন ভোলেননি, ভোলার কথাও নয়। কারণ, তাদের যাত্রার সূচনাবিন্দু তো ছিল সংলগ্ন, যা পরবর্তীকালে স্বাভাবিকভাবেই ভিন্ন-ভিন্ন হয়ে যায়; আর হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। একটি সমাজের সব কবি যখন একই সুরে কথা বলতে থাকেন, বুঝতে হবে যে, সেই সমাজের মধ্যে যেমন দুর্গতির ধারা চলছে, তেমনি সাহিত্যের মধ্যেও অবনতি ঘটেছে। ফররুখ আহমদ কিংবা আবুল হোসেন বা আহসান হাবীবতারা কেউ-ই কবিতাকে এতটা পরাজিত হতে দিতে রাজি ছিলেন না। আর সেই কারণে আমাদের কবিতার ইতিহাসে তাদের একটি বিরাট ত্যাগ যেমন রয়েছে, সেই সঙ্গে সেই ত্যাগের একটি মূল্যও রয়েছে। আমরা হয়তো সব সময়ই তাদের সেই শৈল্পিক ত্যাগের কথা মনে রাখতে পারিনি। সেই অক্ষমতা আমাদের, চল্লিশের সেই কবিদের নয়।
৪. ফররুখ আহমদের ‘সাত সাগরের মাঝি’ (প্রকাশ : ১৯৪৪) কাব্যের প্রকাশ ছিল সেই সময়ের পূর্ববাংলার কবিতার ধারায় একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এর বছর-চারেক আগে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘পদাতিক’ বেরিয়ে গিয়েছে। সেটিও ছিল বাংলা কবিতার ইতিহাসে একটি বড় মাপের ঘটনা। ফররুখ সম্ভবত ‘পদাতিকে’র কবির জীবনদর্শন, তার আত্মবিশ্বাসে মুগ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু তার কাব্যিক পথটি ছিল ‘পদাতিকে’র চেয়ে একেবারেই আলাদা। অন্যের তৈরি করা পথে নতুন কোনো গন্তব্যের দিকে যাত্রা নয়, বরং ফররুখের অন্বিষ্ট ছিল নিজস্ব পথেই নিজস্ব গন্তব্যের সন্ধান। আর এভাবে তাদের দুজনের সেদিনের কাব্যিক চেতনায় সাযুজ্য থাকলেও গন্তব্য ঠিক-ঠিকই আলাদা হয়ে গিয়েছিল। ফররুখের অভিপ্রায়ও ছিল সেটিই। শুধুই ফররুখের কথা কেন বলছি, যেকোনো আত্মসচেতন কবির অভিপ্রায়ই সে রকমই হওয়া উচিত, যা কি না পূর্বসূরিদের চেয়ে ভিন্ন, আলাদা। আর সেই আলাদা ধরনটির অনন্যতা বুঝতে পেরেই মুজীবর রহমান খাঁ লিখেছিলেন, ‘ফররুখ আহমদ যেমন জরিন-কলম, তেমনি শিরিন-কলম কবি।’ সেই সঙ্গে এটিও উল্লেখ করতে তিনি দ্বিধা করেননি, ‘ফররুখ আহমদের কবিতায় আমরা রং-এর তীক্ষè পরিচয় পাই আর পাই শব্দের নিবিড় স্বাদ।’ এই যে এত রং সেটি এলো কোত্থেকে? আবুল হোসেন যে-আলো, যে-উদ্দীপনার কথা বলেছিলেন, এ হচ্ছে তারই প্রতিফলন, এ সেই আলোরই এক উদ্দীপক রং। ফররুখের ‘সাত সাগরের মাঝি’ থেকে একরাশ উদ্দীপনা আর একগুচ্ছ রং যদি তুলে নিই, তাহলে দেখব
ক. ‘জড়ো করি লাল, পোখরাজ আর ইয়াকুত ভরা দিন’
খ. ‘তারার আগুনে পথ বেছে নেয় স্বপ্নেরা সারারাত’
গ. ‘সফেদ পলকে চমকে বিজুরী, চমকে বর্ণধনু
সোনালি, রূপালি রক্তিম রংগিন।’
ঘ. ‘দিগন্ত নীল পর্দা ফেলে সে ছিঁড়ে
সাত-সাগরের নোনা পানি চিরে চিরে।’
ঙ. ‘নারঙ্গী বনে কাঁপছে সবুজ পাতা’
ফররুখের কবিতায় এসব কারণেই কবি শামসুর রাহমান পেয়েছিলেন এক ‘সমৃদ্ধ জমি’র সন্ধান। তার ভাষায়‘যে জমির ফসল দেখে চোখ জুড়োবে সাহিত্য পথযাত্রীদের।’ শামসুর রাহমানের এই অনুমানে কোনো দ্বিধা ছিল না, ছিল না কোনো বিভ্রান্তি। ফররুখের কাব্যিক শক্তিকে তিনি মর্মজ্ঞ পাঠকের দৃষ্টি দিয়ে ঠিকই শনাক্ত করতে পেরেছিলেন।
৫. ফররুখ আহমদের যে-কাব্যিক শক্তির কথা আমরা নানাভাবে বলতে চেয়েছি, তার সেই শক্তির, সেই সামর্থ্যরে উৎস কোথায়? ‘সাত সাগরের মাঝি’র পরবর্তী পর্বে আমরা দেখতে পাই যে, সহযাত্রীদের সঙ্গে তার মত ও পথের পরিবর্তন তত দিনে পরিস্ফুট হতে শুরু করেছে। কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যায় যে, তাতে করেও তার কাব্যিক সামর্থ্যে কোনো ভাটা পড়েনি। এরই-বা নেপথ্যের কারণটা কী? এক কথায় এর উত্তর হচ্ছেধ্রুপদি সাহিত্যের প্রতি ফররুখের অনুরাগ, অনুরাগের পাশাপাশি তার নিরন্তর চর্চার ফল, যা কি না ফররুখের কাব্যের মেরুদণ্ড নির্মাণে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছিল। অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম বলেছিলেন, ফররুখের ‘প্রিয় কবি মধুসূদন। ক্ল্যাসিকের উৎস থেকে, মধুসূদনের চর্চা থেকে একটি বিশেষ ক্ষমতা তিনি অর্জন করেন। তা হচ্ছে কবিতা রচনায় কবজির জোর। এ জোর ছিল তার সহজ দখলে।’ এ তো গেল একটি দিক। এখান থেকে আমরা আরেকটি তথ্য আবিষ্কার করি যে, তিনি ইসলামি চেতনায়, মূল্যবোধে বিশ্বাস স্থাপন করলেও বাংলা সাহিত্যকে ভাগাভাগি করেননি। এটি তার আবহমান বাংলা, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি এক অপূর্ব দরদেরই নমুনা, অবারিত ভালোবাসার এক জ্বলন্ত প্রমাণ। এই ভালোবাসার শক্তি দিয়েই তিনি তার কাব্যের জগৎ একেবারে নিজের মতো করে নির্মাণ করতে পেরেছিলেন। এই সক্ষমতাই ফররুখ আহমদের কাব্যিক বিশিষ্টতা।
৬. আবদুল মান্নান সৈয়দ জানিয়েছিলেন, ‘ইসলামের বহিরাচার বা আধ্যাত্মিকতা ফররুখকে তত আকর্ষণ করে না, যত করে তার সাম্যবাদী ও মানবতা-উদ্বোধক ভূমিকা।’ আমরা দেখি, মার্কস-অ্যাঙ্গেলস তাদের ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার’-এ (১৮৪৮) বলেছিলেন, ‘যেসব বৃত্তিকে লোকে এত দিন সম্মান করে এসেছে, সশ্রদ্ধ বিস্ময়ের চোখে দেখেছে, বুর্জোয়া শ্রেণি সেই সবগুলিরই মাহাত্ম্য ঘুচিয়ে দিয়েছে। চিকিৎসক, ব্যবহারজীবী, যাজক, কবি, বিজ্ঞানীসকলকেই এরা নিজেদের মজুরি-ভোগী শ্রমজীবীতে পরিণত করেছে।’ শুধু তা-ই নয়, ইশতেহারের ভাষায়, ‘বুর্জোয়া শ্রেণি পরিবার প্রথা থেকে ভাবালু ঘোমটাকে ছিঁড়ে ফেলেছে, পারিবারিক সম্বন্ধকে পরিণত করেছে নিছক আর্থিক সম্পর্কে।’ ইসলামের সাম্যবাদী মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন বলেই, মার্কসবাদের এই কথাগুলো ফররুখ আহমদকে সম্ভবত আকৃষ্ট করেছিল। আর সে কারণেই জড় সভ্যতার, শোষক সমাজের তিনি খোলাখুলি ধ্বংস কামনা করেছিলেন। ধ্বংস কামনা করেছিলেন তার কবিতার শৈল্পিক মর্যাদা ক্ষুন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও। স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন‘তারপর আসিলে সময়/ বিশ্বময়/ তোমার শৃঙ্খলগত মাংসপিণ্ডে পদাঘাত হানি/ নিয়ে যাব জাহান্নাম দ্বার-প্রান্তে টানি;/ আজ এই উৎপীড়িত মৃত্যু-দীর্ণ নিখিলের অভিশাপ বও :/ ধ্বংস হও/ তুমি ধ্বংস হও।’ চল্লিশের দশকের গোড়ায় এইভাবে বুর্জোয়া সমাজের ধ্বংস কামনা করাএটি কবি ফররুখ আহমদের শুধু রাজনৈতিক সচেতনতারই নয়, তার কাব্যিক সচেতনতারও এক অপূর্ব শৈল্পিক নমুনা।
লেখক : অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়