ডান প্রান্তের সাইক্লোন
ফরাসি ফুটবলে কিলিয়ান এমবাপ্পে যদি হন মাঠের প্রধান আকর্ষণ, তবে উসমান দেম্বেলে এমন এক তারকা যিনি মাঠের ডান প্রান্তে যেকোনো রক্ষণভাগের জন্য এক জীবন্ত আতঙ্ক। দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে দিদিয়ের দেশমের ফ্রান্স দল পরিচিত ছিল এক ধরনের কঠোর ও হিসেবি ফুটবলের জন্য। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে এসে ফরাসি কোচ তার তারকাদের পায়ে ছেড়ে দিয়েছেন পুরো নিয়ন্ত্রণ, যা দলটিকে আরও বেশি আক্রমণাত্মক করে তুলেছে। আর সেই স্বাধীন ফুটবল সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী ২৯ বছর বয়সী উইং জাদুকর উসমান দেম্বেলে।
বিগত দুটি বিশ্বকাপে (২০১৮ ও ২০২২) ১১টি ম্যাচ খেলেও কোনো গোল না পাওয়া দেম্বেলের কার্যকারিতা নিয়ে খোদ ফরাসি সংবাদমাধ্যমেই প্রশ্নের পাহাড় জমেছিল। দেশের জার্সিতে ৬১ ম্যাচে (এই বিশ্বকাপে নরওয়ের বিপক্ষের ম্যাচের আগে) মাত্র ৮ গোল করা এই উইঙ্গার ক্লাব ফুটবলের ফর্ম কেন জাতীয় দলে দেখাতে পারেন না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছিল একরাশ সংশয়। কিন্তু চলমান বিশ্বকাপে যেন এক পুনর্জন্ম হয়েছে এই পিএসজি তারকার। গ্রুপ পর্বে ইরাকের বিপক্ষে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে খাতা খোলার পর আসল তাণ্ডবটা তিনি দেখালেন বোস্টন স্টেডিয়ামে নরওয়ের বিপক্ষে। ম্যাচের প্রথম আধঘণ্টায় চলল নিখাদ এক ‘ওয়ান ম্যান দেম্বেলে শো’। মাত্র ২৫ মিনিটের ঝড়ে (৭, ২০ এবং ৩২ মিনিটে) নরওয়ের রক্ষণভাগকে তছনছ করে তুলে নিলেন নিজের প্রথম বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিক। ১৯৫৪ সালের পর এটি বিশ্বকাপের ইতিহাসের দ্বিতীয় দ্রুততম হ্যাটট্রিকের রেকর্ড। জাস্ট ফন্টেইন ও এমবাপ্পের পর তৃতীয় ফরাসি হিসেবে বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিকের কীর্তি গড়া দেম্বেলের এই বর্তমান ফর্ম ফ্রান্সকে বসিয়ে দিয়েছে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লিওনেল মেসির ঠিক পাশে। এই দুর্দান্ত ফিনিশিং ও ফর্মের পেছনে রয়েছে তার সাম্প্রতিক ক্লাব ফুটবলের অভিজ্ঞতা। পিএসজির হয়ে টানা দুবার (২০২৫ ও ২০২৬) উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতা দেম্বেলে এখন দাঁড়িয়ে আছেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে অনন্য এক কীর্তির সামনে। আগামী ১৯ জুলাই নিউ জার্সির ফাইনালে যদি ফ্রান্স ট্রফি উঁচিয়ে ধরতে পারে, তবে ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে দুটি বিশ্বকাপ এবং দুটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতার অবিশ্বাস্য ডাবল রেকর্ডের মালিক হবেন তিনি। কাফু, রবার্তো কার্লোস বা রাফায়েল ভারানের মতো কিংবদন্তিরা যা করতে পারেননি, দেম্বেলের সামনে এখন সেই ইতিহাস নিজের নামে লিখে নেওয়ার সুযোগ। মাঠে দেম্বেলের উপস্থিতি মানেই প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের পিছু হটা। একসময় বার্সেলোনায় থাকার সময় ইনজুরি যাকে বারবার ছিটকে দিত, সেই দেম্বেলে এখন শতভাগ ফিট এবং আত্মবিশ্বাসে টইটম্বুর। ইরাক ম্যাচে এমবাপ্পেকে দিয়ে গোল করানো কিংবা নরওয়ের বিপক্ষে বল জালে জড়ানো সবখানেই দেম্বেলে দেখিয়েছেন পরিণত মানসিকতা ও ট্যাকটিক্যাল ম্যাচিউরিটি। দেশমের নতুন ৪-৩-৩ বা ৪-২-৩-১ সিস্টেমে সে নিজেকে দারুণভাবে মানিয়ে নিয়েছে। যখন সে ডান প্রান্ত দিয়ে ওয়ান-অন-ওয়ান ড্রিবলিংয়ে ডিফেন্ডারদের পরাস্ত করে ইনসাইড কাট করে, তখন যেকোনো দলের রক্ষণভাগ ভেঙে পড়ে। কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর জমাট ডিফেন্স এবং আশরাফ হাকিমিদের কঠিন বাধা ভাঙার জন্য ফ্রান্সের সবচেয়ে ধারালো অস্ত্রের নাম তাই উসমান দেম্বেলে, যার আক্রমণ রুখতে ভিন্ন ধারার ছক কষতে হচ্ছে মোহামেদ ওয়াহবির দলকে।
মরুঝড়ের চতুর স্থপতি
ফিফা বিশ্বকাপে মরক্কোর ইতিহাস নতুন করে লেখার পেছনে মূল কারিগরদের একজন ব্রাহিম দিয়াজ। রিয়াল মাদ্রিদের এই ২৬ বছর বয়সী উইঙ্গার ও অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারকে ঘিরে মরক্কোর ফুটবল এখন এক অভূতপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখছে। স্পেনের মালাগায় জন্ম নেওয়া দিয়াজ যখন ২০২৪ সালে নিজের আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ হিসেবে পিতৃভূমি মরক্কোকে বেছে নেন, তখনই ফুটবল বিশ্ব এক বড় পরিবর্তনের আভাস পেয়েছিল। এই বিশ্বকাপে সেই সাহসী সিদ্ধান্তকে তিনি মাঠের পারফরম্যান্সে রূপ দিয়েছেন ইতিহাস-জাগানো এক অধ্যায়ে। মাঠের এই জাদুকরী রূপের সমান্তরালে দিয়াজের ব্যক্তিজীবন কিন্তু একেবারেই সাদামাটা। মাঠের বাইরে তিনি অত্যন্ত শান্ত ও অন্তর্মুখী। কোটি টাকার গ্ল্যামার দুনিয়ায় থেকেও এখনো শতভাগ পারিবারিক মানুষ; ম্যাচের পর তার মা-বাবা ও চার বোন তাকে গাড়ি করে বাসায় নিয়ে যান, যা তার চিরচেনা লাইফস্টাইল। স্প্যানিশ সংস্কৃতির মধ্যে বড় হলেও বাবার মরক্কো বংশোদ্ভূত ঐতিহ্যকে তিনি সবসময় মনেপ্রাণে ধারণ করেছেন। এই পারিবারিক বন্ধন আর শেকড়ের প্রতি টানই সম্ভবত মাঠের চরম চাপের মুহূর্তেও তাকে রাখে অবিচল ও শান্ত। এই শান্ত মানসিকতার প্রতিফলন দেখা যায় তার খেলার ধরনেও। দিয়াজের মূল শক্তি তার দুর্দান্ত পায়ের কাজ এবং ‘অ্যাম্বিডেক্সট্রাস’ (দুই পায়েই সমান দক্ষ) ক্ষমতা। মাত্র ১.৭০ মিটার উচ্চতার এই প্লে-মেকার যখন লো-সেন্টার অফ গ্রাভিটি নিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে হানা দেন, তখন তাকে আটকানো যেকোনো ডিফেন্ডারের জন্যই এক দুঃস্বপ্ন। ২০২৫ সালের আফ্রিকান কাপ অব নেশনসে ৫ গোল করে গোল্ডেন বুট জিতলেও ফাইনালে পেনাল্টি মিসের একটা ক্ষত তার মনে রয়ে গিয়েছিল। এই বিশ্বকাপে প্রতি ম্যাচে জাদুকরী সব অ্যাসিস্টে তিনি যেন সেই ক্ষতের মধুর এক উপশম খুঁজছেন। তার সেই সৃজনশীলতার ধার কতখানি, তা টের পাচ্ছে এবারের বিশ্বকাপের দলগুলোও। চলমান আসরে পাঁচ ম্যাচে চারটি অ্যাসিস্ট করে এই মুহূর্তে টুর্নামেন্টের শীর্ষ ক্রিয়েটরদের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন দিয়াজ। রাউন্ড অফ ১৬-এর ম্যাচে কানাডাকে ৩-০ গোলে গুঁড়িয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করার রাতে দিয়াজ যা করেছেন, তা আফ্রিকার ফুটবল ইতিহাসে আগে কেউ করতে পারেনি। প্রথম আফ্রিকান ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপের এক সংস্করণে চারটি অ্যাসিস্টের রেকর্ড এখন তার নামের পাশে। কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের মতো বিশ্বসেরা দলের মুখোমুখি হওয়ার আগে দিয়াজই এখন মরক্কোর সবচেয়ে বড় ট্রাম্প কার্ড। কারণ মাঠের সেন্ট্রাল পজিশনে বল পায়ে দাঁড়িয়ে আছেন এমন একজন ফুটবলীয় ব্রেন, যিনি হাফ-স্পেসগুলো দারুণভাবে ব্যবহার করে বিদ্যুৎগতির ট্রানজিশন তৈরি করতে পারেন। বোস্টনের কোয়ার্টার ফাইনালে তিনি যখন মাঠে নামবেন, তখন কোটি ভক্তের একটাই চাওয়া থাকবে, তার দুই কনুই উঁচিয়ে চিরচেনা উদযাপনের দৃশ্যটি আরও একবার দেখা; যা মুখ ফুটে যেন সবাইকে মনে করিয়ে দেয়, কঠোর পরিশ্রমে সব কঠিন কাজই সহজ হয়ে যায়।