৩৯ বছর বয়স, ক্যারিয়ারে সম্ভাব্য সব ট্রফি জেতা শেষ, খেলছেন নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। অথচ একটা পেনাল্টি মিস করার পর খাদের কিনারে চলে যাওয়া দলের জন্য তার মনের ভেতর যে তীব্র হাহাকার চলছিল, তা হয়তো কেবল তার পক্ষেই অনুভব করা সম্ভব। ম্যাচ শেষ হওয়ার মাত্র ১১ মিনিট আগেও যখন ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ২-০ গোলে পিছিয়ে, তখন কোটি ভক্তের হৃদয়ে বাজছিল বিদায়ের করুণ সুর। কিন্তু ফুটবল বিধাতা বোধহয় লিওনেল মেসির জন্য অন্য এক নাটকীয় চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিলেন। মাত্র ১৩ মিনিটের টর্নেডো ঝড়ে মিসরকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে আর্জেন্টিনার কোয়ার্টার ফাইনালে উঠার পর মাঠেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন এলএমটেন। আলবিসেলেস্তেদের এই প্রত্যাবর্তনের রাতে ম্যাচ ছাপিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনায় শুধুই মেসির সেই অকপটে নিজের দায় স্বীকার করে নেওয়া আর ফুটবলের প্রতি তার চিরসবুজ আবেগ।
ম্যাচের প্রথমার্ধে পেনাল্টি মিস করার পর তীব্র অনুশোচনায় ভুগছিলেন মেসি। সেই মানসিক যন্ত্রণার কথা প্রথমে তুলে ধরে বলেন, ‘সত্যি বলতে পেনাল্টিটা মিস করে আমি নিজের ওপর ভীষণ রেগে গিয়েছিলাম এবং চরম মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছিলাম। খারাপ শট নেওয়ার কারণে খুব খারাপ লাগছিল। কারণ আমার মনে হচ্ছিল ওই সময়ে গোলটা করতে পারলে ম্যাচের চিত্র পুরোপুরি বদলে যেত।’
২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পরও দলের ঘুরে দাঁড়ানো নিয়ে অধিনায়ক যোগ করেন, ‘বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচে এভাবে ঘুরে দাঁড়ানো আমাদের আত্মমর্যাদা আর চরিত্রকেই ফুটিয়ে তোলে। আজ কুটির (ক্রিস্টিয়ান রোমেরো) গোলটি ম্যাচের পুরো মোড় বদলে দেয়। আমরা বিশ্বাস করতে শুরু করি যে, ম্যাচটি ঘোরানো সম্ভব।’ এই জয়ের পথে করা গোলের মাধ্যমে কিলিয়ান এমবাপ্পে ও আর্লিং হালান্ডকে পেছনে ফেলে চলতি বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনটিও দখলে নিয়েছেন মেসি।
অধিনায়কের এই চরম মানসিক যন্ত্রণা ও মাঠের কান্না ড্রেসিংরুমেও ছুঁয়ে গিয়েছিল তার সতীর্থদের। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে জয়সূচক গোলের নিখুঁত অ্যাসিস্টটি জোগান দেওয়া লাউতারো মার্তিনেজ ম্যাচশেষে মেসিকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘লিও যেভাবে প্রতিদিন নিজেকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, তা সবার জন্য উদাহরণ। আমি ওকে বলেছি তুমি প্রাণভরে কেঁদে নাও। কারণ এই কান্না তোমার প্রাপ্য।’
ম্যাচের দ্বিতীয় হাইড্রেশন ব্রেকে ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকাবস্থায় কোচ লিওনেল স্কালোনির দেওয়া একটি বিশেষ বার্তার কথা স্মরণ করে লাউতারো আরও বলেন, ‘কোচ আমাদের বললেন আমাদের যা কিছু শক্তি আছে তা নিয়ে অল-আউট ঝাঁপিয়ে পড়তে। কারণ আমরা সুযোগ তৈরি করছিলাম। ওই বার্তাটাই স্বস্তি এনে দিয়েছিল।’
কোচের সেই ‘টনিক’ কতটা ফলপ্রসূ ছিল, তা প্রতিধ্বনিত হলো দলের বাকিদের কণ্ঠেও। অতিরিক্ত সময়ের নায়ক এনজো ফার্নান্দেজ বলেন, ‘এটি অবিশ্বাস্য! কাতার বিশ্বকাপের পর থেকেই আমি এমন একটি গোলের অপেক্ষায় ছিলাম। আমাদের দলটা অসাধারণ, যারা কখনো হাল ছেড়ে দেয় না।’
একই সুরে হুলিয়ান আলভারেজ বলেন, ‘হাইড্রেশন ব্রেকে আমাদের একটাই বার্তা দেওয়া হয়েছিল কখনো বিশ্বাস হারানো যাবে না। আমরা জানতাম গোল আসবেই।’ অন্যদিকে ৯০ মিনিটে মিসরের একটি নিশ্চিত কাউন্টার অ্যাটাক রুখে দেওয়া লিয়ান্দ্রো পারেদেস দলের মানসিকতা নিয়ে বলেন, ‘আমরা কখনই ভাবিনি যে আমরা ম্যাচ থেকে ছিটকে গেছি। এই দলটা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করতে এবং বিশ্বাস রাখতে জানে।’
সতীর্থদের পাশাপাশি এই ৩৯ বছর বয়সী মহাতারকাকে এমন আবেগে ভাসতে দেখে মুগ্ধ হয়েছেন খোদ মাস্টারমাইন্ড লিওনেল স্কালোনিও। নিজের চিরচেনা আবেগ লুকিয়ে রাখতে না পারা এই কোচ মেসির প্রশংসা করে বলেন, ‘আমি নিশ্চিত যে মেসি এখনো শুধু এই বিশেষ মুহূর্তগুলোর জন্যই ফুটবল খেলে। ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসেও ও যেভাবে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে, তা আসলেই ভাষায় ব্যাখ্যা করা কঠিন। এটি একটি অবিস্মরণীয় মুহূর্ত ছিল।’ স্কালোনি আরও যোগ করেন, ‘যাই ঘটুক না কেন, এই দলটা আমাকে এই বিশ্বাস জোগায় যে পরিস্থিতি যতই প্রতিকূলে যাক, এরা কখনো আশা হারায় না।’
বিশ্বের কোটি ভক্তের মতো আর্জেন্টিনার এই রুদ্ধশ্বাস প্রত্যাবর্তন কাঁপন ধরিয়েছে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের বুকেও। গভীর রাতে যখন চারদিক নিস্তব্ধ, তখন দেশের অলিগলিতে মেসিভক্তদের উল্লাস আর উত্তেজনার চিৎকার মনে করিয়ে দিচ্ছিল বুয়েনস আইরেস থেকে হাজার মাইল দূরের এই ভূখণ্ডে মেসির আবেগ কতটা গভীরভাবে মিশে আছে।