গাজীপুর সিটি করপোরেশনের (জিসিসি) কোনাবাড়ী জোনের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেনকে হত্যার প্রায় এক বছর পর অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দিয়েছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। নিহত দেলোয়ারের এক সহকর্মীসহ তিনজনকে দোষীসাব্যস্ত করে গত ৩০ এপ্রিল ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা রাজধানীর তুরাগ থানার পরিদর্শক শেখ মফিজুল ইসলাম। সহকর্মীদের অবৈধ কর্মকাণ্ড ও ঘুষ বাণিজ্যের প্রতিবাদ করায় প্রকৌশলী দেলোয়ারকে তার সহকর্মীরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে হত্যা করেন বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে।
চার্জশিটে অভিযুক্তরা হলেন জিসিসির প্রকৌশলী মো. সেলিম ওরফে আনিস হাওলাদার (৪১), ভাড়াটে সন্ত্রাসী হেলাল হাওলাদার শাহিন (৪৫) এবং মাইক্রোবাসচালক হাবিবুর রহমান খান (৩৫)। তারা তিনজনই দেলোয়ার হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে এর আগে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
চার্জশিটের বরাত দিয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক শেখ মফিজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কোনাবাড়ী জোনের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন তার সহকর্মী মো. সেলিমের অবৈধ কর্মকাণ্ড নিয়ে মতবিরোধের জেরে হত্যার শিকার হয়েছেন।
চার্জশিটে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন, সেলিম ওরফে আনিস হাওলাদার বিভিন্ন ঠিকাদারের কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা গ্রহণ করতেন। কিন্তু দেলোয়ার এ জাতীয় অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করেছিলেন। সেলিম তার অফিসের বেশিরভাগ কর্মচারীদের ছোটখাটো বিষয় নিয়ে বকাঝকা ও নানাভাবে হয়রানি করতেন। সে কারণে অফিসের কর্মীরা সেলিমের চেয়ে প্রকৌশলী দেলোয়ারকে বেশি পছন্দ করতেন। যা নিয়ে সেলিম ও দেলোয়ারের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিল। ২০১৮ সালে সিটি করপোরেশনের কোনাবাড়ী জোনাল অফিসে থাকাকালীন সেলিমকে জালিয়াতির অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছিল। তিনি ভেবেছিলেন দেলোয়ারের কারণেই তাকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়। যার কারণে সেলিম ক্ষিপ্ত হন। ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে দেলোয়ার গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নগর ভবনের দায়িত্বে ছিলেন। সে সময় সেলিম গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দেলোয়ারকে ওই সময় সিটি করপোরেশনে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে বদলি করা হয়েছিল।
ওই সিদ্ধান্তে সেলিম অসন্তুষ্ট ছিলেন উল্লেখ করে অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, গত বছর ৫ মে দেলোয়ারের সঙ্গে সেলিমের ঝগড়া হয়। এরপর তিনি তার সহকর্মী দেলোয়ারকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন। এজন্য হেলাল হাওলাদার ওরফে হরিলা ঘোড়ামি এবং মাইক্রোবাসের চালক হাবিবুর রহমান খানকে ভাড়া করেন। ১১ মে সকালে সেলিম দুজনকে সঙ্গে নিয়ে একটি মাইক্রোবাসে করে ঢাকার মিরপুরে দেলোয়ারের বাড়িতে যান। দেলোয়ারকে তার বাড়ি থেকে বের করতে তারা একটি কৌশল ব্যবহার করেছিলেন। তারা একজন রিকশাচালককে দেলোয়ারকে কল করতে ১০০ টাকা দিয়েছিলেন যে তার একটি পার্সেল সংগ্রহ করা দরকার। দেলোয়ার তখন বাসা থেকে বের হয়ে সেখানে একটি মাইক্রোবাস অপেক্ষা করতে দেখেন। সেলিম তখন তাকে বলেছিলেন যে তিনি অফিসে যাওয়ার জন্য মাইক্রোবাসটি ভাড়া করেছেন। দেলোয়ার বিশ্বাস করে মাইক্রোবাসে উঠেছিলেন। গাড়িটি রূপনগর বেড়িবাঁধ এলাকায় পৌঁছলে সেলিম ও হেলাল দড়ি দিয়ে দেলোয়ারকে শ্বাসরোধে হত্যা করে। হত্যার পরে তারা লাশটি বেড়িবাঁধের কাছের উত্তরা ১৭ নম্বর সেক্টরের একটি ফাঁকা প্লটে ফেলে দেন। আরেকটি ডোবায় দেলোয়ারের মোবাইল ফোনটি ফেলে দেওয়া হয়।
ওইদিন বেলা ৩টার দিকে পুলিশ উত্তরার ১৭ নম্বর সেক্টরের ৫ নম্বর ব্রিজের পশ্চিম পাশের একটি জঙ্গল থেকে প্রকৌশলী দেলোয়ারের লাশ উদ্ধার করে। ওই ঘটনায় পরদিন তার স্ত্রী খোদেজা বেগম অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজনকে আসামি করে তুরাগ থানায় হত্যা মামলা করেন। পরে পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পর তারা তিনজনই গত বছর ২১ মে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিল। এ তিনজন এখন কারাগারে আছেন।