তবু যেন এক দুরন্ত যাযাবর

অপ্রাসঙ্গিক না হলেও, রাজ্জাকের জন্য অপ্রয়োজনীয় একটি প্রশ্ন করেছিলাম। জানতে চেয়েছিলাম, আপনার ভালো ছবি কোনটা কোনটা? একটু নিরুত্তর থেকে জানালেন, তুমি যে অর্থে বলছো, সে অর্থে একটিও ভালো ছবি করিনি আমি। আমার এই ‘যে অর্থটা’কে তিনি কোন মাপে মেপে নিয়েছেন, সে বুঝতে কিছু সময় লাগল। তাকালাম তার দিকে। এখন তাকে মেকাপ দিয়ে বয়েস কমিয়ে বালকের বাবার চেহারার আদল আনা হয়েছে। তার বয়েসি চোখেও এখন খানিকটা তারুণ্য। বললেন, মুক্তিযুদ্ধের পরে একটা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিই প্রায় আমার ঘাড়ের ওপর। কখনো তিন শিফটে কাজ করেছি। কাউকে ফেরাইনি। তাই তুমি যেমন ছবির কথা জানতে চাইলে অমন ছবি করার সুযোগ আমার হয়নি।

কথার পিঠে কথা তো আসতেই পারে। সে কথায় জানালেন, প্রস্তাবও পেয়েছেন তিনি, কিন্তু হাতের ওই সব কাজ রেখে তার পক্ষে সেদিকে সাড়া দেওয়ার সুযোগ ছিল না। অথচ জহির রায়হানের হাতে প্রথম নায়ক। আনোয়ার হোসেনের সমান্তরালে ‘জীবন থেকে নেয়া’রও প্রধান অভিনেতা। ‘স্বরলিপি’তে ববিতার প্রেমিক, ‘আলোর মিছিল’-এ বিপ্লবী মামা। বিখ্যাত কথাসাহিত্য অবলম্বনে তিনি পরিচালনা করেছেন। যেমন শরৎচন্দ্রের বৈকুণ্ঠের উইল থেকে সৎভাই, তারাশঙ্করের চাঁপাডাঙার বউ। চাঁপাডাঙার বউয়ে অভিনয়শিল্পী বাছতে গিয়ে মনে হলো, শাবানার দেবরের ভূমিকায় দর্শক তাকে গ্রহণ নাও করতে পারে, সেই আশঙ্কা থেকে বাপ্পারাজকে বললেন অভিনয় করতে। কেন যেন মনে হলো, ‘আলোর মিছিল’-এর দর্শক ততদিনে অনেকখানি খোপেপোরা। রাজ্জাক-শাবানা, রাজ্জাক-ববিতা আর অতি অবশ্যই রাজ্জাক-কবরী মিলিয়ে ভাবতে শিখে গেছে। রাজ্জাককে তারা আর ওই নায়িকাদের প্রেমিক বা স্বামীর বাইরে অন্য কোনো চরিত্র দিয়ে দেখতে চাইছেন না। হতে পারে, তার এই চিন্তা তখনকার প্রয়োজনে যথার্থই ছিল। এদেশের চলচ্চিত্রের গতিপ্রকৃতি অভিনেতা পরিচালক ও প্রযোজক হিসেবে তার নখদর্পণে।

একটি পুরনো প্রসঙ্গ জানালেন। একবার, সম্ভবত সেই ছবিটি ‘দর্পচূর্ণ’, সেখানে ফতেহ লোহানী, আনোয়ার হোসেন, আনোয়ারা, রাজ্জাক ও কবরী অভিনয় করেছেন। ‘তুমি যে আমার কবিতা’ জনপ্রিয় গানটি এ ছবিতে। সিদ্ধান্ত হয়, এটি হবে যৌথ প্রযোজনায়। রাজ্জাক ভেটো দিয়ে বলেছিলেন বাঙালি যৌথভাবে কোনো কাজ করতে পারে না। প্রয়োজন হলে পরিচালক তাকে পরে পয়সা দেবেন, কিন্তু তিনি এই বিষয়ে থাকবেন না। ছিলেনও না। ছবিটি হিট করেছিল। রাজ্জাক ছবি প্রতি নেন কুড়ি হাজার, সে টাকায় তখন গুলশানে এক বিঘা জমি পাওয়া যায়। তিনি ওই এক বিঘাই কিনেছেন। সেখানে তার বাড়ি। চাইলে তো তখন আরও কিনতে পারতেন। কিন্তু কখনোই তার তা মনে হয়নি যে আরও জমি কেনা প্রয়োজন। আজকাল সবার প্রচুর সম্পদ করার দিকে আগ্রহ।

দুপুরে খাওয়ার পরে, ভেবেছিলাম, এই বয়েসে তিনি নিশ্চয়ই একটু রেস্ট নেবেন। এই শ্যুটিংবাড়িতে হয়তো সেই সুযোগও আছে। কিন্তু তা নয়। চা খেলেন এক কাপ। তারপর শ্যুটিংয়ের এটা-সেটা দেখলেন, নিজের অংশ বুঝে নিলেন; তার শট কখন কোথায় দিতে হবে তাও জানলেন। এখনকার দৃশ্যে তার মেকাপ প্রায় অপ্রয়োজনীয়। দুপুরের আগে যে বালকের বাবা সেজেছিলেন বিকেলের দৃশ্যে সে পরিণত যুবক, ফলে রাজ্জাককে মেকাপ নিতে হবে না। যে পোশাক পরা তাতেই চলবে। তিনি একটু নিশ্চিন্ত। পরিচালক ডাকলেই শট দেবেন।

সহ অভিনেতা-অভিনেত্রীর প্রসঙ্গ উঠল। সেটা উঠতই। কেন যেন মনে হলো, প্রায় এই ধাঁচের কথার মুখোমুখি জীবনে বহুবার হয়েছেন। এর উত্তর হোক কিংবা নিজস্ব অভিমতই হোক, তিনি এমন কথা জানাতে খুবই অভ্যস্ত। কবরীর সঙ্গে তার জুটিই সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়েছিল। সেটিই ছিল স্বাভাবিক। ববিতা দেখতে অনেকটাই শহুরে, শাবানা খানিকটা গৃহবধূ ধাঁচের, সেখানে কবরী যেন আমাদের চেনা মেয়ে। স্বাধীনতার পরে এ দেশের দর্শকরা তাদের জুটিকে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেছিল। কিন্তু কবরীর সঙ্গে তার সম্পর্ক সেখানে থাকেনি। কারণ কবরীর ব্যক্তিজীবন। রাজ্জাক চাননি কবরী তার দাম্পত্য সম্পর্কের ইতি টানুন। এ নিয়ে দুজনার সম্পর্ক বেশ শীতল হয়ে যায়। আমার কেন যেন মনে হলো, এই প্রসঙ্গটা আগে কখনো এভাবে বলেননি। আমি যদি কোনো সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধি হতাম, তাহলে হয়তো আমাকেও বলতেন না। যেমন, এখানে নায়ক-নায়িকার সম্পর্ক কিংবা সহকর্মী-কর্মীদের ভেতরে যে সম্পর্ক, সেই প্রসঙ্গও। সেসব কথা অবশ্য এলো এমনিতেই। রাজ্জাক বললেন, এখন তো দেখি কারও সংসারই প্রায় টেকে নো। এমন কেন হয়। সে তুমি কাজের ক্ষেত্রে যাই করো, তা সংসারে টেনে নিয়ে যাও কেন। কাজকে কাজের জায়গায় রাখলেই তো চলে, সেটাকে ঘরে টেনে নিয়ে যাওয়ার কী দরকার? আমার সঙ্গে অনেকেরই অমন সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, কিন্তু তা কখনোই নিজের সংসারে টেনে নিয়ে যাইনি। কাজটাকে সব সময়েই কাজের জায়গায় রেখেছি। হয়তো শর্মিলী আহমেদ সামনে ছিলেন না বলে নিজস্ব মতামতগুলো অমনভাবে বললেন। কী জানি, হয়তো তা নয়, তিনি এইসব এভাবেই বলে থাকেন, আগে তো কখনো তার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ ঘটেনি। হতে পারে, আমার জানতে চাওয়ার আগ্রহে তার বলতে অপ্রাসঙ্গিক ঠেকছে না বলে অনায়াসে জানালেন। আর যারা ছায়ার জগতে বিচরণ করেন, তাদের এমন সামনে পেয়ে এসব কথা শোনার সুযোগ আমিই-বা হাতছাড়া কেন করব?

সংসার আর চলচ্চিত্রকে এই এক না করার প্রসঙ্গেই উঠে এলো, জোকার ছবিতে, ‘বাপের চোখের মণি নয়, মায়ের সোনার খনি নয়, ভাইয়ের আদরের ছোটবোন’, তার চোখের মণি ময়না অভিনয় করেছেন তার বোনের চরিত্রে। মেয়ের সঙ্গে অভিনয় করতে কোনো অসুবিধা হয়নি। বললেন, শ্যুটিংয়ে ময়না তার বোন হয়ে গেছিল, বাকি সময়ে মায়ের মতো। হ্যাঁ, ও ভালো অভিনয় করেছিল। যদিও পরে আর কখনো অভিনয় করতে চায়নি। আমি আর কখনো ওর অভিনয় করা নিয়ে জোর করিনি। সংসার করল, এসব থেকে একেবারে দূরে। বাপ্পাই যা অভিনয়ের সঙ্গে থাকল। পরে সম্রাট। ছেলেমেয়েগুলো বড় হওয়ার পরে, দেখা গেল লক্ষ্মীর আর কোনো কাজ নেই। তাই সম্রাটের জন্ম। এসব পারিবারিক কথা বলার সময়ে একটু অবাক হচ্ছিলাম, কেন আমাকে এমন ব্যক্তিগত কথা বলছেন তিনি। যদিও এর কোনোটাই গভীর অন্তর্গত কোনো কথা নয়, তবু ব্যক্তিগত তো, এতটা ব্যক্তিগত কথা আমাকে তিনি না বললেও পারতেন। ওদিকে আমি শোনার উৎসাহে শুনে চলেছি।

জাফর ইকবালের গলায় ঠোঁট মিলিয়েছেন তিনি ‘বদনাম’-এ। কী প্রতিভাবান ছিলেন এই অভিনেতা ও গায়ক। রাজ্জাক মনে করেন, তারই সম্ভাবনা ছিল এদেশের চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় হিরো হওয়ার। শৃঙ্খলা ছিল না। হয়তো সেজন্য ওকে অকালে চলে যেতে হলো। ওই গানটা কী সুন্দর গেয়েছে।

তার বিখ্যাত ছবির অনেকগুলোই আমি দেখেছি। অন্তত ‘বদনাম’-এর কথা মনে করিয়ে দিতেই তিনে বললেন। বললেন সালমান শাহ’র কথা, তোমাদের সময়ে এই ছেলেটি দারুণ সম্ভাবনা নিয়ে এসেছিল। কিন্তু আবেগের বশে কী করে ফেলল। ছেলেটি আরও বড় নায়ক হতো, নিঃসন্দেহে।

এর ভেতরে তার বিকেলের শটগুলো দেওয়া শেষ। এরপর কাছে আর একটা জায়গায় যেতে হবে। তার আগে পরিচালকের এখানে অন্যদের সঙ্গে আরও কিছু কাজ বাকি আছে। সেটুকু সারার আগে যা সময়। জাফর ইকবালের গলায় গানের প্রসঙ্গে জানালেন চলচ্চিত্রের গানেই খুরশিদ আলম ও আবদুল জব্বারের কণ্ঠে তার ঠোঁট মেলানোই বেশি। চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রনাথের গান প্রসঙ্গ বললেন, সে সুযোগ খুব হয়নি। তবে দুই-একবার রবীন্দ্রসংগীতও গেয়েছি। হাসলেন। আমি অন্তত একটি মনে করতে পারলাম, ‘এই কথাটি মনে রেখো’, রাজ্জাক হারমোনিয়াম বাজিয়ে গেয়েছিলেন ‘চোখের জলে’ ছবিতে, সামনে বসা কবরীর থমথমে মুখ। ছবিটার নাম মনে করতে পারছিলাম না আমরা। আর, ‘জীবন থেকে নেয়া’য় ‘আমার সোনার বাংলা’ ব্যবহৃত হয়েছে, অবশ্য সে দৃশ্যে রাজ্জাক নেই।

একটি দৃশ্যের জন্য তাকে যেতে হবে অন্যত্র। আমিও যাব সেখানে। কিন্তু আর এভাবে কথা বলার সুযোগ হবে না। তাই এতক্ষণের, এই প্রায় সারাটা দিনের কথা হওয়ার কারণে জানতে চাইলাম, আত্মজীবনী লিখবেন না? আমরা পড়তে পারতাম, জানা যেত এই দেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অনেক কিছু। অন্তত আমাদের কথা ভেবে। তিনি বললেন, এবার শুরু করতে হবে। অনেকবারই তো ভেবেছি, হয়নি। বললাম, প্রয়োজন মনে করলে কো-রাইটার নেন।

এরপর আর কথা এগোয়নি। অন্যত্র যেখানে আর একটি শট, সেটা দেওয়া হয়ে গেলে সেই সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ গাড়িতে ওঠার মুখে বললেন, একদিন এসো বাড়িতে, কথা বলা যাবে। ফোন করে এসো।

সেই একদিন আর যাওয়া হয়নি।

বরং, সেদিনের কথা হাতড়ে, অনেকবারই মনে হয়েছে, ওই বয়সে প্রতিটি শটের আগে তার হাঁটুর বয়েসি পরিচালকের কাছ থেকে প্রতিবার বুঝে নেওয়া, এবং শট দেওয়ার আগে সেই মতো নিজেকে প্রস্তুত করা আর নিয়মানুবর্তিতা, যা জীবনযাপনের অংশ করে নিয়েছেন।

মনে হয়েছে আর একটি বিষয়। সেই যে চৌষট্টির দাঙ্গার পরে কলকাতা ত্যাগ করেছেন প্রায় একবস্ত্রে, তার ভাষায় দেশত্যাগ, দেশত্যাগী মানুষের অন্তর্গত বেদনা ছিল রাজ্জাকের অন্তরে। যেন এত কিছুর পরেও, এত এত প্রাপ্তি বাদ দিলেও এ জীবন যেন যাযাবরের। ‘আবির্ভাব’ ছবিতে তার ঠোঁটে ‘আমি এক দুরন্ত যাযাবর, দিন নেই রাত নেই বসে আছি গাড়িতেই’ দেখলে মনে হয়, এখানে প্রকৃত রাজ্জাক। নিজের কথাই বলছেন। আবার সেই তিনিই এই ভূখন্ডের স্বাধীনতার মুখে নির্মিত ‘জীবন থেকে নেয়া’র অন্যতম প্রধান অভিনেতা; ছবির ভাষায়, হিরো! ২০ বৈশাখ ১৪২৮/০৪ মে ২০২১। সিলেট।

লেখক কথাসাহিত্যিক

prasantamridha@gmail.com