ক্ষুদ্র শিল্প ও কৃষি খাতে ঋণ পুনঃতফসিল ফি লাগবে না

কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) এবং কৃষি খাতে ঋণ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে ঋণ প্রক্রিয়াকরণ ফি, পুনঃতফলিস ফি বা পুনর্গঠন ফি দিতে হবে না। তবে সিএমএসএমই ও কৃষি খাত ছাড়া অন্যান্য খাতের ঋণ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠন ফি বাবদ সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ ফি আদায় করতে পারবে ব্যাংক। তবে ফি’র পরিমাণ কোনোভাবেই ১০ হাজার টাকার বেশি হবে না।

এ ছাড়া অন্যান্য ধরনের ব্যাংকিং লেনদেনের ওপর কী হারে ফি বা চার্জ গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করা যাবে সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ একটি সার্কুলার জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে কোনো ব্যাংক আমানত হিসাব খোলা ও রক্ষণাবেক্ষণ ফি, ঋণ প্রক্রিয়াকরণ ফিসহ অন্যান্য ফি, আর্লি সেটেলমেন্ট ফি, চেকবই ইস্যুর ফি, এলসি কমিশন প্রভৃতির ওপর উচ্চ হারে বা ইচ্ছামতো সেবা মাসুল আদায় করতে পারবে না।

গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ‘শিডিউল অব চার্জ’ সংক্রান্ত মাস্টার সার্কুলার জারি করে ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ।

ঋণ সংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা মাসুলের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলারে বলা হয়েছে, ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে মোট মঞ্জুরিকৃত ঋণের সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ ‘লোন প্রসেসিং ফি’ আদায় করা যাবে। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ফি হবে ১৫ হাজার টাকা। ৫০ লাখ টাকার বেশি ঋণের ক্ষেত্রে লোন প্রসেসিং ফি হবে শূন্য দশমিক ৩০ শতাংশ, সর্বোচ্চ পরিমাণ ২০ হাজার টাকা। ঋণ আবেদন ফি নামে কোনো ফি আদায় করতে পারবে না ব্যাংক।

ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ডকুমেন্টশন ফি, সিআইবি চার্জ, স্ট্যাম্প চার্জ এবং অন্যান্য আইনি ও জামানত মূল্যায়ন ফি ব্যাংকের প্রকৃত ব্যয় যা হবে সেটাই গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করতে পারবে ব্যাংকগুলো।

রপ্তানি ঋণসহ যেকোনো ধরনের ঋণের ক্ষেত্রে সুদ বা মুনাফা হারের অতিরিক্ত কোনো সার্ভিস চার্জ, ঋণ ব্যবস্থাপনা ফি, মনিটরিং বা সুপারভিশন চার্জ, ঝুঁকি প্রিমিয়াম বা এ ধরনের কোনো নামে কোনো চার্জ, ফি বা কমিশন আদায় করতে পারবে না ব্যাংক।

নির্দিষ্ট মেয়াদের আগে ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে বকেয়া ঋণের সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ আর্লি সেটেলমেন্ট ফি আদায় করতে পারবে ব্যাংক। তবে কুটির, অতিক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র খাতে দেওয়া ঋণ, চলতি ঋণ বা তলবি ঋণের ক্ষেত্রে মেয়াদপূর্তির আগে ঋণটি সমন্বয়ের ক্ষেত্রে আর্লি সেটেলমেন্ট ফি বা এ ধরনের কোনো ফি আদায় করতে পারবে না ব্যাংক।

সার্কুলারে আমানত সংক্রান্ত ফি নিয়ে বলা হয়েছে, ব্যাংকে ৫০০ টাকা জমা দিয়ে সঞ্চয়ী হিসাব এবং ১০০০ টাকা জমা দিয়ে চলতি হিসাব খোলা যাবে। বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত হিসাব যেমন কৃষক, শ্রমজীবী পথশিশুদের হিসাবসহ এ ধরনের হিসাব খোলার ক্ষেত্রে এই টাকা জমা দিতে হবে না।

সঞ্চয়ী হিসাবে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত গড় আমানত থাকলে হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ ফি আদায় করতে পারবে না ব্যাংক। ১০ হাজার টাকার বেশি গড় আমানত ব্যাংকে জমা থাকলে বছরে দুইবার হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ ফি দিতে হবে গ্রাহককে। আমানতের পরিমাণের ওপর ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত ফি হতে পারে।

তবে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের প্রেক্ষাপটে চলতি বছরের জন্য ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয়ী আমানতের হিসাবে বছরে দুইবারের পরিবর্তে একবার হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ ফি আদায়ের নির্দেশনা রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের।

এছাড়া চলতি হিসাবে বছরে দুইবার সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা, বিশেষ উল্লিখিত আমানতে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা করে হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ ফি আদায় করতে পারবে ব্যাংক। বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত হিসাবগুলোতে কোনো প্রকার হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ ফি আদায় করতে পারবে না ব্যাংক।

একই ব্যাংকের অন্য শাখায় হিসাব স্থানান্তরের ক্ষেত্রে একই জেলার মধ্যে সর্বোচ্চ ৫০ টাকা এবং অন্য জেলায় সর্বোচ্চ ১০০ টাকা ফি দিতে হবে গ্রাহককে।

ডরম্যান্ট বা লেনদেন না হওয়া সঞ্চয়ী হিসাব সক্রিয় করতে কোনো ফি দিতে হবে না। মেয়াদপূর্তির আগে মাসিক সঞ্চয়ী হিসাব বা মেয়াদি আমানত তুলে নিতে প্রি-ম্যাচিউর এনক্যাশমেন্ট ফি দিতে হবে না।

কোনো হিসাব বন্ধ করতে হলে সঞ্চয়ী হিসাবের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা, চলতি হিসাবে ৩০০ টাকা, বিশেষ উল্লিখিত আমানত হিসাবে ৩০০ টাকা ফি দিতে হবে। চেকবই ইস্যুর ক্ষেত্রে প্রকৃত খরচের ভিত্তিতে চার্জ নির্ধারণ করতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এ ছাড়া সঞ্চয়ী ও চলতি হিসাবে আরোপিত ন্যূনতম ব্যালান্স ফি, ইনসিডেন্টাল চার্জ, লেজার ফি, সার্ভিস চার্জ, কাউন্টার ট্রানজেকশন ফি বা অনুরূপ কোনো ফি আদায় করতে পারবে না ব্যাংকগুলো।

স্থানীয় ও বৈদেশিক বাণিজ্য এবং রেমিট্যান্স সংক্রান্ত ফি বা চার্জের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়, শতভাগ নগদ মার্জিনে ঋণপত্র (এলসি) খোলার কমিশন প্রতি তিন মাসে সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ, ডেফার্ড বা ইউজান্স এলসি খোলার কমিশন প্রতি তিন মাসে সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ এবং সাইট বা ব্যাক টু ব্যাকসহ অন্যান্য এলসি খোলার কমিশন প্রতি তিন মাসে সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক ৪০ শতাংশ আদায় করা যাবে।

এলসি ট্রান্সমিশন, এলসি অ্যামেন্ডমেন্ট, কনফারমেশন, ক্যানসেলেশন, ফরেন করেসপন্ডেন্ট চার্জের ক্ষেত্রে মেইলিং, কুরিয়ার, টেলেক্স, সুইফট প্রভৃতি ক্ষেত্রে ব্যাংকের প্রকৃত ব্যয়ের ভিত্তিতে চার্জ আদায় দিতে হবে গ্রাহকদের।

এলসি অ্যাডভাইসিং চার্জ, এলসি সংশোধনী চার্জ ও এলসি ট্রান্সফার চার্জ বাবদ সর্বোচ্চ ৭৫০ টাকা আদায় করতে পারবে ব্যাংক। এলসি এক্সেপ্টেন্স চার্জ প্রতি তিন মাসে সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক ৪০ শতাংশ এবং এলসি ট্রান্সফার চার্জ প্রতি তিন মাসে সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ।

ফরেন করেসপন্ডেন্ট চার্জ (স্থানীয় অংশ), ডাটা ম্যাক্স, হ্যান্ডেলিং চার্জ, কপি ডকুমেন্ট এনডোর্সমেন্ট চার্জ, এলসি বাতিল বা মেয়াদোত্তীর্ণ অব্যবহৃত এলসি চার্জ আদায় করতে পারবে না ব্যাংক।

এভাবে ব্যাংকিং লেনদেনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কী হারে ফি বা চার্জ বা কমিশন আদায় করা যাবে তার পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই নির্দেশনা গ্রাহকের জানার সুবিধার্থে প্রত্যেক ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়, শাখা, উপশাখা ও এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটগুলোতে দৃশ্যমান স্থানে এবং ওয়েবসাইটে প্রদর্শনের জন্য নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।