সীমান্তে সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি

মোংলায় সংক্রমণ ৬৮ শতাংশ রামেকে আরও ১২ জনের মৃত্যু

ঈদুল ফিতরের পর থেকে দেশজুড়েই বাড়ছে করোনা সংক্রমণের হার; বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু দুটোই বাড়ছে হু হু করে। এমন পরিস্থিতিতে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে এলাকাভিত্তিক লকডাউনের পাশাপাশি বিশেষ কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। উল্টো সপ্তাহ ব্যবধানে কয়েকগুণ বেড়ে কোনো কোনো এলাকায় সংক্রমণ হার পেরিয়েছে ৬০ শতাংশ।

এদিকে রাজশাহীতে আজ থেকে ৭ দিনের সর্বাত্মক কঠোর লকডাউন ঘোষণা করেছে বিভাগীয় কমিশনার। গতকাল বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত মিটিং শেষে এ ঘোষণা দেন বিভাগীয় কমিশনার হুমায়ুন কবীর।

সীমান্ত জেলা বাগেরহাটে সবশেষ ২৪ ঘণ্টার নমুনা পরীক্ষায় ৬১ জনের শরীরে নতুন করে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। নমুনা পরীক্ষায় শতকরা হিসাবে সংক্রমণের হার ছিল প্রায় ৩৯ শতাংশ। তবে জেলাটির সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মোংলা উপজেলায় সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় ৩৪ জনের নমুনা পরীক্ষায় ২৬ জনের পজিটিভ রিপোর্ট এসেছে। সংক্রমণের হার ছিল ৬৮ শতাংশ।

এদিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের করোনা ইউনিটে এক দিনে আরও ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত বুধবার সকাল থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে তারা মারা যায়। এ ছাড়া আরও কয়েকটি জেলা থেকে করোনা শনাক্ত ও মৃত্যুর উল্লল্ফনের তথ্য পাওয়া গেছে। বিস্তারিত দেশ রূপান্তরের সংশ্লিষ্ট জেলার প্রতিনিধি ও নিজস্ব প্রতিবেদকদের পাঠানো খবরে:

বাগেরহাটে গত ২৪ ঘণ্টার নমুনা পরীক্ষায় ৬১ জনের শরীরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। ১৫৫টি নমুনা পরীক্ষায় ৬১ জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। সংক্রমণের হার ছিল প্রায় ৩৯ শতাংশ। জেলার সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মোংলায় সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় (গত বুধবার ভোর ৬টা থেকে গতকাল ভোর ৬টা পর্যন্ত) ৩৪ জনের নমুনা পরীক্ষায় ২৬ জনের পজিটিভ রিপোর্ট এসেছে। সংক্রমণের হার ছিল ৬৮ শতাংশ; যা আগের দিনের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

বাগেরহাটে সম্প্রতি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বাড়লেও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা নেই। জনসমাগমের কেন্দ্রস্থল হাটবাজারগুলোতে আসা ক্রেতা-বিক্রেতাদের স্বাস্থ্যবিধি মানার বালাই নেই। তারা না পরছেন মুখে মাস্ক, না মানছেন শারীরিক দূরত্ব। এতে সংক্রমণের হার আরও বাড়বে বলে ধারণা করছে স্বাস্থ্য বিভাগ। এমন পরিস্থিতিতে জেলার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা মোংলা উপজেলায় প্রশাসনের কঠোর বিধিনিষেধ আরও এক সপ্তাহ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে জেলা প্রশাসন। গত ৩০ মে থেকে মোংলায় কঠোর বিধিনিষেধ চলমান রয়েছে।

বাগেরহাট সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল কর্মকর্তা সুব্রত দাস গতকাল বলেন, বাগেরহাটে করোনা সংক্রমণের হার উদ্বেগজনক; বিশেষ করে মোংলা উপজেলায় প্রতিদিন সংক্রমণের হার ওঠানামা করছে। জনসমাগমস্থলগুলোয় মানুষের স্বাস্থ্যবিধি মানার বালাই নেই। তাদের মধ্যে সচেতনতার অভাব এখনো রয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চললে সংক্রমণের হার আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আজিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাগেরহাটের সব উপজেলাতেই সংক্রমণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে মোংলায় সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি। ১৫ দিন ধরে ঊর্ধ্বমুখী। এ কারণে মোংলায় ১৬ জুন পর্যন্ত চলমান কঠোর বিধিনিষেধ বাড়ানো হয়েছে।’

এদিকে মোংলায় গতকাল সকালে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে করোনা পরীক্ষা করাতে এসে দুজন মারা গেছেন। তারা হলেন রামপাল উপজেলার পেড়িখালী ইউনিয়নের ফুলপুকুরপাড়ের রফিকুল ইসলামের স্ত্রী তহুরুননেছা খুকি (৪২) ও মোংলার মালগাজী গ্রামের নুর আলমের ছেলে ইব্রাহিম (১৬)।

রামেকে আরও ১২ মৃত্যু :  রামেক হাসপাতালের করোনা ইউনিটে এক দিনে আরও ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে রাজশাহীর নয় ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিনজন। গত বুধবার সকাল থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে তারা মারা যায় বলে জানান হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সাইফুল ফেরদৌস।

তিনি আরও জানান, মৃত ১২ জনের মধ্যে সাতজন করোনা শনাক্ত হওয়ার পর মারা যান। বাকিরা মারা যান নমুনা পরীক্ষার আগে চিকিৎসাধীন অবস্থায়। আর করোন শনাক্ত সাতজনের মধ্যে রাজশাহীর পাঁচজন ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের দুজন।

ডা. সাইফুল জানান, ১ থেকে ১০ জুন পর্যন্ত এ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে মারা গেছে ৯২ জন। এর মধ্যে ৫৬ জনই মারা গেছে করোনা শনাক্ত হওয়ার পর। বাকিরা উপসর্গ নিয়ে মারা যায়। এর মধ্যে ১ জুন, সাতজন, ২ জুন সাতজন, ৩ জুন নয়জন, ৪ জুন ১৬ জন, ৫ জুন ৮ জন, ৬ জুন ছয়জন, ৭ জুন ১১ জন, ৮ জুন আটজন, ৯ জুন আটজন এবং সর্বশেষ ১০ জন ১২ জন মারা যায়।

উপপরিচালক ডা. সাইফুল জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা ইউনিটে ভর্তি হয়েছে ৪২ জন। এর মধ্যে রাজশাহীর ১৮, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১৬, নওগাঁ ৭, নাটোর ১। একই সময় সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২৫ জন।

তিনি জানান, বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত করোনা ওয়ার্ডের ২৭১ শয্যার বিপরীতে রোগী ভর্তি রয়েছেন ২৯০ জন। এর মধ্যে রাজশাহীর ১৪২, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১১১, নওগাঁর ১৫, নাটোরের ১৫, পাবনার ৩, কুষ্টিয়ার ৩ জন ও চুয়াডাঙ্গার ১ জন। আইসিইউতে ভর্তি রয়েছেন ১৮ জন।

সাতক্ষীরায় চলমান লকডাউন এক সপ্তাহ বৃদ্ধি : সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে নতুন করে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। পরপর দুদিনে একই ওয়ার্ডে করোনা উপসর্গে আটজনের মৃত্যু হলো। সীমান্ত জেলা সাতক্ষীরায় করোনা সংক্রমণের হার না কমায় চলমান লকডাউন আরও এক সপ্তাহ বৃদ্ধি করা হয়েছে। সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা. হুসাইন শাফায়াত এ তথ্য জানিয়ে বলেন, গতকাল দুপুরে জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটির ভার্চুয়াল সভা থেকে লকডাউন ১৭ জুন পর্যন্ত বাড়ানোর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামাল জানান, করোনার ঊর্ধ্বমুখী পরিস্থিতি ঠেকাতে শহরের মোড়ে মোড়ে ব্যারিকেড দিয়ে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। বাঁশ ও চেয়ার-টেবিল ফেলে যানবাহন ও মানুষ চলাচলে বাধা দিচ্ছে পুলিশ। কড়াকড়ি করা হয়েছে লকডাউনের বিধিনিষেধ। জরুরি প্রয়োজনে মানুষ হেঁটে যাতায়াত করছেন; তবে বিশেষ জরুরি পরিষেবা লকডাউনের আওতামুক্ত রয়েছে। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে খুলনা ও যশোর থেকে সাতক্ষীরায় প্রবেশের পথ। এরই মধ্যে গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে সর্দি, কাশি, জ্বর ও ডায়রিয়ার মতো করোনার নানা উপসর্গ। স্বাস্থ্যবিধি মানাতে হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসন। ভোমরা স্থলবন্দরে সীমিত পরিসরে চলছে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম। তবে ভারতীয় চালক ও হেলপাররা যাতে খোলামেলা ঘুরে বেড়াতে না পারেন, সে জন্য পুলিশ ও বিজিবির নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। এ ছাড়া লকডাউনের মধ্যে দোকানপাট খোলা রাখা, স্বাস্থ্যবিধি না মানাসহ বিভিন্ন অপরাধে জেলার বিভিন্ন স্থানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ৫০টি মামলায় ৩২ হাজার ৩০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।

সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা. হুসাইন শাফায়াত জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ৯৫ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৪৮ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে; যা শনাক্তের হার ৫০.৫২ শতাংশ।

সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামাল বলেন, ‘চলমান লকডাউন আরও এক সপ্তাহের জন্য বৃদ্ধি করা হয়েছে; যা চলবে ১৭ জুন রাত ১২টা পর্যন্ত।’

যশোরে করোনা শনাক্তের হার ৫৮ শতাংশ : যশোরে হু হু করে বাড়ছে করোনা শনাক্তের হার। গতকাল সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় এ জেলায় নতুন করে ২০০ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ৫৮ শতাংশ। গতকাল শনাক্তের হার ছিল ৪৯ শতাংশ।

অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কাজী সায়েমুজ্জামান জানান, করোনার ঊর্ধ্বগতির কারণে যশোর সদর ও অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়া পৌরসভায় সাত দিনের কঠোর বিধিনিষেধ কার্যকর করা হয়েছে।

তবে সকাল থেকেই সড়কে মানুষের চলাচল ছিল চোখে পড়ার মতো। এ ছাড়া যশোর থেকে অভ্যন্তরীণ রুটে কোনো বাস না ছাড়লেও দূরপাল্লার বাসগুলোতে সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। অবশ্য প্রশাসন বলছে, তারা স্বাস্থ্যবিধি শতভাগ কার্যকর করতে কাজ করছে।

ভারত সীমান্তবর্তী জেলা হিসেবে যশোর উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে। জুন মাসের শুরুতে প্রতিদিনই বাড়ছে শনাক্তের হার। ৮ জুন শনাক্তের হার ছিল ৪২ শতাংশ। ৯ জুন তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৯ শতাংশে। গত ২৪ ঘণ্টায় এ জেলায় ৩৪৬ জনের নমুনা পরীক্ষা করে নতুন করে ২০০ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ৫৮ শতাংশ। এ পর্যন্ত জেলায় ৭ হাজার ৭০১ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে মারা গেছে ৮৪ জন। এ ছাড়া যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৭৪ জন।