কভিড-পরবর্তী স্বাস্থ্য জটিলতায় খালেদা জিয়া

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন ১১ এপ্রিল। চার সপ্তাহ পর গত ৯ মে তৃতীয় দফা পরীক্ষায় করোনা নেগেটিভ হন তিনি। করোনা নেগেটিভ হলেও কভিড-পরবর্তী জটিলতার কারণে এখনো তিনি পুরোপুরি সুস্থ হননি। বর্তমানে তার শারীরিক দুর্বলতা রয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরকে এ কথা জানান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের কেবিনে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা চলছে। পুরোপুরি সুস্থ হতে সময় লাগবে।’

বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘উন্নত চিকিৎসার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে বিদেশে নেওয়ার আবেদন করা হলেও সরকার তা নাকচ করে দিয়েছে। কিন্তু ওনাকে বিদেশে যেতে দিলে দ্রুত সুস্থ হতে পারতেন।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে খালেদা জিয়ার পরিবারের এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কভিড-পরবর্তী জটিলতায় খালেদা জিয়া খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছেন। বাসায় থাকতে একজনের সহায়তায় হাঁটতে পারলেও এখন দুজন ধরার পরও হাঁটতে পারছেন না। অল্পতেই হাঁপিয়ে উঠছেন। শারীরিক দুর্বলতা কাটাতে চিকিৎসকদের পরামর্শে নিয়মিত ওষুধ খাওয়ানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর খাবার দেওয়া হচ্ছে। বাসা থেকেই তিন বেলার খাবার নেওয়া হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নির্দেশে শুরু থেকেই পরিবারের সদস্যসহ দলের নেতাদের যাতায়াত সীমিত করা হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে শুধু খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দার হাসপাতালে যেতে পারেন। তাও খালেদা জিয়া কোনো প্রয়োজনে ডাকলে যান। এছাড়া বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল, ব্যক্তিগত সহকারী এবিএম আবদুস সাত্তার ও ব্যক্তিগত চিকিৎসকরা যাচ্ছেন খালেদা জিয়ার খোঁজখবর নিতে।’

করোনাভাইরাস ছাড়া আর কী কী রোগে খালেদা জিয়া ভুগছেন সে সম্পর্কে জানতে চাইলে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও দলের ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খালেদা জিয়া করোনাভাইরাস থেকে সেরে উঠলেও করোনা-পরবর্তী জটিলতায় ভুগছেন। এছাড়া আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিসসহ পুরনো সব জটিল রোগে ভুগছেন। ধীরে ধীরে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে।’

গত ১১ এপ্রিল বিএনপি মহাসচিব গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানান। তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়ার করোনা পরীক্ষা করা হয়েছে। তার টেস্ট রিপোর্ট পজিটিভ, অর্থাৎ তিনি করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে এর মধ্যেই চিকিৎসা শুরু হয়েছে। তার কোনো টেম্পারেচার নেই, তিনি স্টেবল আছেন, ভালো আছেন, অন্য কোনো উপসর্গ তার নেই।’ বিএনপি মহাসচিব আরও বলেন, ‘আগের দিন খালেদা জিয়ার নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল, রবিবার তার ফলাফলে পজিটিভ হওয়ার তথ্য জানা গেছে। চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। যদি প্রয়োজন হয়, তাহলে ফারদার ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা করা হবে। আমরা দেশবাসীকে আশ্বস্ত করতে চাই তিনি তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে আছেন, তিনি ভালো আছেন।’

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর ১৪ এপ্রিল রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে খালেদা জিয়ার ফুসফুসের সিটি স্ক্যান করা হয়। সিটি স্ক্যান শেষে তাকে গুলশানের বাসভবন ফিরোজায় নেওয়া হয়। তখন চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, খালেদা জিয়ার ফুসফুসে ভাইরাসের সংক্রমণ ন্যূনতম। এরপর ২৫ এপ্রিল করোনাভাইরাসের পরীক্ষা করালে রিপোর্ট পজিটিভ আসে। এরপর ২৭ এপ্রিল তার সিটি স্ক্যান করানোর জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়। রাতেই সিটি স্ক্যান করার পর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

হাসপাতালের মেডিকেল বোর্ড গঠন : খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে ভর্তি করার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হাসপাতালের চিকিৎসক অধ্যাপক সাহাবুদ্দিন আহমদকে প্রধান করে ১০ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। মেডিকেল বোর্ডের সদস্যদের সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসনের ব্যক্তিগত পাঁচ চিকিৎসককে রাখা হয়। ৩ মে শ্বাসকষ্ট শুরু হলে তাকে করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) নেওয়া হয়। এর এক মাস পর গত ৩ জুন তাকে আবার কেবিনে নেওয়া হয়।

বিদেশে নেওয়ার আবেদন : ৩ মে সিসিইউতে নেওয়ার পর ৫ মে উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে বিদেশ নিতে পরিবারের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরাবর আবেদন করা হয়। ৬ মে বিএনপি মহাসচিব এক অনুষ্ঠানে সরকারের কাছে পরিবারের আবেদনের কথা জানান। এরপর ৯ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘সাজাপ্রাপ্ত আসামি হওয়ায় আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত অনুযায়ী খালেদা জিয়া চিকিৎসা নিতে বিদেশ যেতে পারবেন না। তাই আইন অনুযায়ী তাকে বিদেশ যাওয়ার আবেদন মঞ্জুর করতে পারছি না। তিনি আদালত কর্তৃক দন্ডপ্রাপ্ত হয়ে জেলে আছেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৪০১ এর ১ ফৌজদারি আইন অনুযায়ী তার দন্ডাদেশ স্থগিত করে তার সুবিধামতো চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। পরিবারের আবেদন আমরা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিলাম। তারা স্পষ্ট জানিয়েছে ৪০১ ধারায় সাজা স্থগিত করে যে চিকিৎসা সুযোগ দেওয়া হয়েছে এটা দ্বিতীয়বার করা সম্ভব নয়। মানে তার সাজা আবার মওকুফ করে বিদেশ পাঠানোর কোনো সুযোগ নেই।’

দুটি দুর্নীতি মামলায় ১৭ বছরের কারাদন্ড পাওয়া খালেদা জিয়া ২৫ মাস কারাগারে কাটানোর পর গত বছর ২৫ মার্চ বিশেষ ব্যবস্থায় ছাড়া পান। এরপর তার কারাদন্ড স্থগিতের মেয়াদ দুই দফা বাড়ানো হয়। পেনাল কোডের সেকশন ৪০১-এর অধীনে গত বছর তার কারাদন্ড স্থগিত করা হয়েছিল। তিনি বিদেশ যেতে পারবেন না এবং দেশেই তাকে চিকিৎসা নিতে হবে এ দুটি শর্তে সে সময়ে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ২০১৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদ- দেয় আদালত। এরপর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায়ও তাকে কারাদন্ড দেওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে আরও ৩৪টি মামলা রয়েছে।