সম্মেলন ও পরবর্তী নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে দল গোছানোর প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। টানা তিনবার ক্ষমতায় থাকার ফলে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত দলে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। নানা ধরনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে এখন প্রায় প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও সহিংস ঘটনা ঘটছে আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গ সংগঠনের মধ্যে।
গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে করোনার কারণে সভা-সমাবেশ এবং দলীয় কর্মসূচি না থাকায় অভ্যন্তরীণ কোন্দল বেড়ে গেছে। বিভিন্ন দল উপদলে বিভক্ত হয়ে নেতাকর্মীরা নিজেদের মধ্যেই বিশৃঙ্খলা করছেন। এর মধ্যে হত্যার ঘটনাও ঘটছে। আবার আগামী বছর দলের সম্মেলন। জেলা ও উপজেলা কমিটির সম্মেলন বাকি অনেক জায়গায়। সম্মেলনের পরপরই চলের আসবে পরবর্তী সংসদ নির্বাচনের সময়। এ পরিস্থিতিতে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মেটানো এবং দলীয় শৃঙ্খলা ঠিক করতে সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগ।
প্রথমে জেলা, উপজেলা, থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে দলের সাংগঠনিক কাঠামো ঠিক করতে ‘সাংগঠনিক টিম’ গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের কথা উল্লেখ করে গত বৃহস্পতিবার দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তৃণমূল পর্যায়ে ‘সাংগঠনিক টিম’ গঠনের জন্য সারা দেশের স্থানীয় নেতাদের কাছে চিঠি পাঠান। ওই চিঠিতে বলা হয়, ‘এই সাংগঠনিক নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর করতে হবে।’
দলটির একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা ও জেলা নেতাদের মধ্যে কয়েকজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তৃণমূলে দলীয় শৃঙ্খলা একেবারেই ভেঙে পড়েছে। করোনার কারণে দলীয় সভাপতি এখন আর তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন না। এমপি, চেয়ারম্যান-মেম্বার (পৌরসভা ও ইউপি) এবং স্থানীয় নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করেছে। প্রতিদিন একাধিক বিশৃঙ্খলা এবং খুন-খারাবির ঘটনা ঘটছে। বিষয়টি দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও জানেন।’
আওয়ামী লীগের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, দলের পরিস্থিতির পুরো তথ্য সভাপতির কাছে আছে। তিনি চান আগামী সম্মেলনের আগেই সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী হোক। পাশাপাশি টানা তিনবার ক্ষমতায় থাকার ফলে দলে যেসব অনুপ্রবেশকারী ঢুকেছে তাদের একটি তালিকা হোক।
তৃণমূলের সাংগঠনিক টিমের কাজ সম্পর্কে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জেলা, মহানগর, উপজেলা, থানা, পৌর শাখা আওয়ামী লীগের নেতারা বসে কমিটির বাইরে থেকেও নেতাকর্মী নিয়ে তৃণমূলের সাংগঠনিক টিম গঠন করবে। দ্রুত এই টিম গঠন করে দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা চিহ্নিত করবে এবং সম্মেলনের প্রস্তুতি নেবে। তিনি বলেন, অনেক দিন সভা-সমাবেশ না হওয়াতে সব দলছুট হয়ে নিজেদের মতো কাজ করছে। এই টিমের মাধ্যমে সমন্বয়টা হবে।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকদের একজন অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ একটি বড় রাজনৈতিক দল। সংগঠনকে গতিশীল করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দলের সম্মেলন, নির্বাচন এবং জনগণের পাশে দাঁড়াতেই এই টিম কাজ করবে। জেলা-উপজেলা, থানা ও পৌর শাখা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা সাংগঠনিক টিম গঠন করবে। টিমওয়ার্কের মাধ্যমে দলের শক্তি আরও বৃদ্ধি পাবে।’ অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও এর জের ধরে সংঘটিত নানা ঘটনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘একটি বড় দলে কিছু প্রতিযোগিতা তো থাকবেই। এটা বড় কিছু নয়। এই কভিডের মধ্যেও মাঠে আওয়ামী লীগই আছে। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা মানুষের সেবা করেছে। সাংগঠনিক গতিশীলতা আরও বাড়লে মানুষ বেশি সেবা পাবে।’
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য লে. কর্নেল (অব.) ও সংসদ সদস্য ফারুক খান বলেন, ‘সম্মেলনকে ঘিরে আওয়ামী লীগ সবসময় দলের তৃণমূলকে শক্তিশালী করে। এটা সাংগঠনিক কাঠামো আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ। এই টিমের কাজ হবে দলকে জনগণের একেবারে কাছে পৌঁছে দেওয়া।’
এদিকে জেলা নেতারা বলেছেন, শুধু নির্দেশনা এসেছে। টিম গঠন করা হবে এবং কেন্দ্রের সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হবে।
সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের স্বাক্ষরিত চিঠির নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের সব শাখায় সংগঠনের গতিশীলতা বাড়াতে এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমকে আরও জোরদার করতে সারা দেশে ‘সাংগঠনিক টিম’ গঠন করতে নির্দেশনা দিয়েছেন সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নির্দেশনা দ্রুত কার্যকর করতেও বলা হয়েছে। নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে সংগঠনে সারা দেশের সব জেলা/মহানগর শাখার অধীন উপজেলা/থানা/পৌর শাখা আওয়ামী লীগের গতিশীলতা বৃদ্ধি এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমকে আরও জোরদার করতে জেলা/মহানগর আওয়ামী লীগ কার্যনির্বাহী সংসদের নেতাদের সমন্বয়ে প্রয়োজনীয়সংখ্যক ‘সাংগঠনিক টিম’ গঠন করবেন। এই টিম সংশ্লিষ্ট জেলা/মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে আলোচনাসাপেক্ষে দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা/থানা/পৌর শাখার বিদ্যমান সাংগঠনিক সমস্যাগুলো দ্রুত সময়ের মধ্যে সমাধানের উদ্যোগ নেবেন।
এছাড়া আওয়ামী লীগ দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের গতিশীল এবং তথ্য ও প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়াতে দল বিরোধী বিভিন্ন অপপ্রচার রোধে ভূমিকা রাখতে ভিডিও কনফারেন্স শুরু করেছে। আওয়ামী লীগের দপ্তর বিভাগ থেকে ধাপে ধাপে আটটি বিভাগের জেলাসমূহের দপ্তর ও সহ-দপ্তর সম্পাদকদের সঙ্গে এ সভা করবে।
গতকাল বিকেলে আওয়ামী লীগের দপ্তর ও উপ-দপ্তর সম্পাদকের সঙ্গে রাজশাহী বিভাগের সাংগঠনিক জেলাসমূহের (রাজশাহী মহানগর, রাজশাহী, জয়পুরহাট, নওগাঁ, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলা) দপ্তর ও সহ-দপ্তর সম্পাদকদের এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সভায় কাজের ব্যবস্থাপনায় তথ্য ও প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করা হয়। সভায় বর্তমান যুগে তথ্যপ্রযুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরে আলোচনা শুরু করা হয়। বক্তাদের কথার মূলভাব ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ অনলাইনে প্রচার-প্রচারণার কৌশল নির্ধারণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৃণমূল পর্যন্ত দলীয় নেতাকর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিতের পাশাপাশি দলীয় প্রচার-প্রচারণায় উদ্বুদ্ধ করা। গুজবের বিরুদ্ধে মানুষকে কীভাবে সচেতন করা যায় এবং বিরোধী শিবিরের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কীভাবে পাল্টা জবাব নির্ধারণ করা যায় তা তুলে ধরা হয়।
সভায় বলা হয়, সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে পাঁচ কোটি মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশেষ করে ফেইসবুকে সক্রিয়। আর এ ব্যবহারকারীর অধিকাংশই তরুণ। তাই দলীয় কাজের ব্যবস্থাপনায় ও প্রচার-প্রচারণায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
দলের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া বলেন, ‘সংগঠনে দপ্তর বিভাগ একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পাদকীয় বিভাগ। দপ্তর বিভাগ সচল থাকলে সংগঠনে প্রাণশক্তির সঞ্চার হয়।’
এছাড়াও করোনা পরিস্থিতির মধ্যে মানুষের মাঝে অর্থ ও খাদ্য সহায়তা নিয়ে আলোচনা হয়। সভা থেকে রাজশাহী বিভাগে কভিড পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করতে এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিধি মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়। জেলা নেতারা জানান, করোনা প্রতিরোধে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করা হবে এবং প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক প্রদত্ত মাস্কও জনগণের মাঝে বিতরণ করা হবে।
আওয়ামী লীগের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশনের (সিআরআই) পক্ষ থেকে সভা পরিচালনায় কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হয়। সিআরআইয়ের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানটির কো-অর্ডিনেটর তন্ময় আহমেদ এবং ডেটাবেজ টিমের সদস্য নূরুল আলম পাঠান মিলন ও কাওছার আহমেদ কৌশিক সভায় সংযুক্ত ছিলেন। এছাড়া সভায় রংপুর বিভাগের জেলাসমূহের সংযুক্ত দপ্তর ও উপ-দপ্তর সম্পাদকরা বক্তব্য রাখেন।