বুদ্ধদার হাসিমুখ আকাশ ঢেকে ফেলছে

অনেক কথা থাকে, যা হঠাৎ বিদ্যুৎ ঝলকের মতো মনে পড়ে যায়। যেমন এখন কেন জানি না মনে পড়ে গেল মাও সে তুং-এর সেই বিখ্যাত বাণী ‘কোনো কোনো মরণ পাহাড়ের মতো ভারী।’ সত্যিই সব মৃত্যু নয় সমান। চলচ্চিত্র জগতের ইন্দ্র পতন ঘটে গেল ১১ জুন, ভোর রাতে ঘুমের মধ্যেই পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের চলে যাওয়ার পরে।

১৯৪৪ সালে পুরুলিয়ার আনাড় গ্রামে যে মানুষটি জন্মেছিলেন তিনি চলচ্চিত্র পরিচালক না কবি ছিলেন তাই নিয়ে তর্ক ছিল। মৃত্যুর পরে আগামী বহুদিন এই নিয়ে তর্কাতর্কি চলতেই থাকবে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সিনেমা জগতে আমার বন্ধুসংখ্যা খুব বেশি নয়। সামান্য এক তথ্যচিত্র পরিচালককে কজনইবা পাত্তা দেবে! তা ছাড়া অন্তত পশ্চিমবঙ্গে তথ্যচিত্র এমন দুয়োরানি যে লোকজন খুব একটা গুরুত্ব দেয় না সিনেমার এই ফর্মকে। শুধু সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় মৃত্যুর আগে অবধি চেঁচিয়ে গেছেন ডকুমেন্টারি একটা সিনেমার ফর্ম। ফলে আমরা যারা ডকুমেন্টারি ফিল্মমেকার তারা আদতে সিনেমা নির্মাতা।

এখন এই রাত-দুপুরে বুদ্ধদাকে নিয়ে লিখতে বসে মনে করার চেষ্টা করে যাচ্ছি কবে কীভাবে বিশিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাতা বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের কাছাকাছি এসেছিলাম আর কবেইবা তিনি আমার অত্যন্ত আপন বুদ্ধদা হয়ে উঠেছিলেন। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের পাশাপাশি মৃণাল সেন, গৌতম ঘোষ আর এই বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত একটুও দ্বিধা না করে আমার মতো আপাত অকুলীন মানুষকেও কীভাবে যেন কাছে টেনে নিতে জানতেন।

বুদ্ধদার সঙ্গে আমার সম্পর্ক সাত-আট বছরের। আলাপের পরপরই ঘনিষ্ঠতা। হতে পারে তার একটা কারণ বুদ্ধদা তখন যে তরুণীটির প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন তার সঙ্গে আমার সখ্য। সেই তরুণীকে আমি তখনো এবং এখনো স্নেহ করি। বুদ্ধদা সেটা জানতেন। দুজনের বয়সের তারতম্য এতটাই যে আড়ালে আবডালে এই সম্পর্ক নিয়ে যে জলঘোলা হবে সেটাও বুদ্ধদা বুঝতেন। তাই আমাকে পেয়ে বুদ্ধদা আশ্বস্ত হলেন যে, অন্তত একজন তার পক্ষে থাকবে। অসম প্রেম নিয়ে কথা উঠলেই বুদ্ধদার সরল লাজুক হাসি কখনো ভুলব না। অত বড় একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরিচালককে কোনো এক দুঃসাহসে আমি চেয়ারম্যান বলে ডাকতাম। বামপন্থা সমর্থক বুদ্ধদাকে বলতাম, চীনের নয় তুমিই আমার একমাত্র চেয়ারম্যান।

মৃত্যুর দশ-বারো দিন আগে হঠাৎ কেমন চরাচর সিনেমার কথা ভাবতে ভাবতে ফোন করলাম বুদ্ধদাকে। সেদিন রোদের তেজ কম ছিল। কেমন এক মায়াবী আলোয় ভরে ছিল বিস্তীর্ণ চরাচর। বুদ্ধদার স্ত্রী, আমার অত্যন্ত প্রিয় সোহিনী চেঁচাতে লাগল ফোনটা ধরো। বুদ্ধদার গলা শুনতে পাচ্ছি। কার ফোন! দাও দাও। পরে শুনেছিলাম, আগের দিন ডায়ালাইসিস করে বাড়ি ফিরেছেন বুদ্ধদা। প্রতি মাসে এই একটা বিষয় কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নিয়মিত ডায়ালাইসিস করা। ক্লান্ত ছিলেন। তবু টগবগে তরুণের গলায় ফোন ধরলেন কী খবর! কেমন আছিস তুই!

তারপর কত গল্প। বলেই যাচ্ছেন নানা কথা। সোহিনী একসময় বাধ্য হয়ে থামাতে চেষ্টা করল। পরে কথা হবে। তুমি বিশ্রাম নাও। কে শোনে কার কথা! বুদ্ধদা বকবক করতে করতে বলছেন যে, আবার কবে সৌমিত্রর সঙ্গে আড্ডা হবে কে জানে, সত্যিই তখন কি আর জানতাম যে এরপর কোনো দিনই আর বুদ্ধদার সঙ্গে কথা হবে না। দেখা হওয়া দূরের কথা।

মাঝেমধ্যে কথা বলতাম সিনেমা নিয়ে। ‘বাঘ বাহাদুর’ থেকে ‘মন্দ মেয়ের উপাখ্যান’। চিত্রনাট্যের ব্যাকরণ না মেনে কীভাবে শট নিতে হবে বুদ্ধদা গল্পের ছলে শেখাতেন। অর্থনীতির ছাত্র ছিলেন, ফলে কখনো-সখনো দেশের পরিস্থিতি নিয়ে আড্ডা মারতাম। তখন কে বলবে আমি এক দিকপালের সঙ্গে কথা বলছি। কবি বুদ্ধদেব দাশ গুপ্তের দক্ষতাও ছিল যথেষ্ট। হাঁটতে হাঁটতে যাচ্ছি। কনে দেখা আলো দেখে বুদ্ধদা কেমন বিভোর হয়ে যেতেন। তরুণদের ভালো লেখার খবর পেলে পড়তেন।

একবার বড় একটা লেখা লিখেছিলাম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে নিয়ে। প্রথম শ্রোতা ছিলেন বুদ্ধদা। চোখ বন্ধ করে শোনার পর বলেছিলেন তুই এটা বই কর। আমি ছাপব। মাওবাদী রাজনীতি নিয়ে বই লিখেছি। প্রেস ক্লাবের অনুষ্ঠানে না বলতেই হাজির অমন বিশ্ববরেণ্য পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত স্বয়ং। বাইরে একটু গম্ভীর হলেও ঘনিষ্ঠ মহলে ছিলেন সহজ সরল। এখন গভীর রাত। বাইরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। একা একা মনে মনে যেন বুদ্ধদার সঙ্গে বসে গল্প করছি। একটু একটু আলো ফুটবে একটু বাদেই। পুবের আকাশে লালের আভা। পুরুলিয়া জন্মস্থান বলেই বোধ হয় রুখাসুখা টিলা অরণ্যের ছোট নাগপুর মালভূমির বিপুল বিস্তীর্ণ প্রান্তর বুদ্ধদাকে টানত। বুদ্ধদার হাসিমুখ ক্রমেই বড় হয়ে আকাশ ঢেকে ফেলছে। খুব ইচ্ছা করছে বুদ্ধদার হাতটা ধরতে। কেন জানি পারছি না। পিছলে পিছলে যাচ্ছে। ভোর হচ্ছে। কিন্তু অন্ধকার যাচ্ছে না। দূরে কোথাও যেন মাদলের বোল শোনা যাচ্ছে। হাসছেন বুদ্ধদা। ‘পিন্দারে পলাশের বোন পালাব পালাব মন, নেংটি ইঁদুরে ঢোল কাটে, গতরে পিরিতির ফুল ফোটে...’। ঘুম ভেঙে গেল। হাত ছাড়িয়ে বুদ্ধদা কোথায় চলে গেছেন। কখনো হাজার ডাকাডাকিতেও আমার চেয়ারম্যান আর ফিরবেন না।

লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা

dastidarsoumitra786@gmail.com