ঈদুল ফিতরের পর থেকে দেশজুড়েই বাড়ছে করোনা সংক্রমণের হার। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু দুটোই বাড়ছে হু হু করে। সংক্রমণ রোধে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে এলাকাভিত্তিক লকডাউনের পাশাপাশি বিশেষ কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও থামানো যাচ্ছে না মৃত্যুর মিছিল। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের করোনা ইউনিটে এক দিনে আরও ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত শুক্রবার সকাল থেকে গতকাল শনিবার সকালের মধ্যে তাদের মৃত্যু হয়। খুলনায় উপসর্গসহ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। খুলনা করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়। এছাড়া এই হাসপাতালের আইসিইউতে মুমূর্ষু অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৩ জন রোগী। খুলনার পাশর্^বর্তী জেলা বাগেরহাটেও সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে নারীসহ ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। খুলনার পাশের আরেক জেলা যশোরেও নতুন করে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। সীমান্তবর্তী অন্য জেলাগুলো থেকেও পাওয়া গেছে সংক্রমণ ও মৃত্যুর তথ্য। বিস্তারিত দেশ রূপান্তরের সংশ্লিষ্ট জেলার প্রতিনিধি ও নিজস্ব প্রতিবেদকদের পাঠানো খবরে : রামেক হাসপাতালের করোনা ইউনিটে সর্বশেষ মারা যাওয়াদের মধ্যে একজন করোনা পজিটিভ ছিলেন। তার বড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। এছাড়া করোনা উপসর্গ নিয়ে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের সবার বাড়ি রাজশাহী জেলায়। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সাইফুল ফেরদৌস এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। গত ১ জুন থেকে ১২ জুন সকাল পর্যন্ত এ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে মারা গেছেন ১১২ জন। এর মধ্যে ৬৪ জনই মারা গেছেন করোনা শনাক্ত হওয়ার পর। বাকিরা উপসর্গ নিয়ে মারা যান।
করোনার ঊর্ধ্বগতি ঠেকাতে গত শুক্রবার বিকেল ৫টা থেকে রাজশাহী শহরে সর্বাত্মক লকডাউন চলছে। স্থানীয় প্রশাসন আগামী ১৭ জুন পর্যন্ত এই লকডাউন ঘোষণা করে। লকডাউনের কারণে শুক্রবার বিকেল থেকে শহরের দোকানপাট বন্ধ, গণপরিবহন চলছে না। রাস্তায় সাধারণ মানুষের চলাচলও সীমিত হয়ে গেছে। রাস্তায় মানুষের চলাচল ঠেকাতে মোড়ে মোড়ে পুলিশের তৎপরতা রয়েছে। রাজশাহী জেলা প্রশাসনের চারজন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে চারটি ভ্রাম্যমাণ আদালত শহরে কাজ করছে।
বাগেরহাটে নারীসহ ৪ জনের মৃত্যু : বাগেরহাটে ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে নারীসহ ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে বাগেরহাট সদরে একজন, মোংলা উপজেলাতে দুজন এবং মোরেলগঞ্জের একজন। এই নিয়ে বাগেরহাট জেলায় করোনাভাইরাস সংক্রমণে ৫৫ জনের মৃত্যু হলো। জেলায় নমুনা পরীক্ষায় নতুন করে আরও ৬ জনের শরীরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আরটি-পিসিআর ল্যাবে ২১টি নমুনা পরীক্ষায় ৬ জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। জেলার সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মোংলায় সরকারি ছুটির দিনে র্যাপিড অ্যান্টিজেন ল্যাবে পরীক্ষা হয়নি। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় ৫১ জনের নমুনা পরীক্ষায় ২৬ জনের পজিটিভ হয়। মোংলায় সংক্রমণের হার ছিল ৫০ শতাংশ। যা গত দিনের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ কম ছিল। (শুক্রবার ভোর ৬টা থেকে শনিবার ভোর ৬টা পর্যন্ত)।
জেলার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা মোংলা উপজেলায় প্রশাসনের আরোপ করা কঠোর বিধিনিষেধ ঢিলেঢালাভাবে চলছে। মোংলা পৌরসভা এলাকায় দোকানপাট বন্ধ থাকলেও সাধারণ মানুষ নানা অজুহাতে বাইরে ঘোরাফেরা করছে। আগামী ১৬ জুন পর্যন্ত এই বিধিনিষেধ চলবে।
খুলনায় আরও ৫ জনের মৃত্যু : খুলনায় উপসর্গসহ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। খুলনা করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়। বর্তমানে হাসপাতালের আইসিইউতে মুমূর্ষু অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৩ রোগী। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ও করোনা হাসপাতালের ফোকালপারসন ডা. সুহাস রঞ্জন হালদার এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
তিনি জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় (শুক্রবার-শনিবার) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এরমধ্যে একজন করোনা আক্রান্ত হয়ে এবং চারজন উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। এছাড়া হাসপাতালে ১৩১ জন রোগী ভর্তি রয়েছে। যার মধ্যে রেড জোনে ৬৫ জন, ইয়ালো জোনে ২১ জন, এইচডিইউতে ৩২ জন এবং আইসিইউতে ১৩ জন চিকিৎসাধীন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ২৭ জন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৩৮ জন।
দিনাজপুরে আক্রান্তের হার ৩২ শতাংশ : সীমান্তবর্তী উত্তরের জেলা দিনাজপুরে কয়েক দিন ধরে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় দিনাজপুর জেলায় করোনা আক্রান্ত হয়ে ৩৮ জন। যা শনাক্তের হার হিসেবে ৩২ দশমিক ২০ শতাংশ। নতুন আক্রান্ত ২৮ জনের মধ্যে শুধু দিনাজপুর সদর উপজেলায় ২৮ জন রয়েছে। আশঙ্কাজনক হারে করোনা আক্রান্ত হলেও লকডাউন না দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে প্রশাসন।
কঠোর বিধিনিষেধে কুষ্টিয়া পৌর এলাকা : সংক্রমণ হার উদ্বেগজনক হওয়ায় কুষ্টিয়া পৌর এলাকায় গত শুক্রবার মধ্যরাত থেকে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে জেলা প্রশাসন। শুক্রবার রাত ৮টায় কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অধিক হারে করোনা সংক্রমণের কারণে শুক্রবার মধ্যরাত ১২:০১টা থেকে ৭ দিনের জন্য অর্থাৎ আগামী ১৮ জুন মধ্যরাত পর্যন্ত কঠোর বিধিনিষেধের আওতায় নেওয়া হচ্ছে কুষ্টিয়া পৌর এলাকাকে।
আরোপিত বিধিনিষেধের মধ্যে রয়েছে সব ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শপিং মল, দোকান, রেস্টুরেন্ট বন্ধ থাকবে। তবে কাঁচাবাজার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকান সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে খোলা রাখা যাবে। বিধিনিষেধ চলাকালে কুষ্টিয়া পৌরসভা এলাকায় সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ থাকবে। কুষ্টিয়া জেলা করোনাভাইরাস প্রতিরোধ কমিটির সংক্ষিপ্ত এক জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নড়াইলে এক সপ্তাহের লকডাউন শুরু : করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় নড়াইলে সংক্রমিত এলাকায় এক সপ্তাহের লকডাউন শুরু হয়েছে। গতকাল থেকে শুরু হয়ে আগামী ১৯ জুন প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত সপ্তাহব্যাপী এই লকডাউন কার্যকর থাকবে।
লকডাউনের আওতাভুক্ত এলাকার মধ্যে রয়েছে নড়াইল পৌর এলাকা, সদর উপজেলার কলোড়া ও সিঙ্গাশোলপুর ইউনিয়ন, লোহাগড়া উপজেলা শহরের বাজার ও শালনগর ইউনিয়ন। গত শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধ জেলা কমিটির জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
যশোরে করোনা শনাক্তের হার উদ্বেগজনক : যশোরে করোনা শনাক্তের হার উদ্বেগজনক। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৩৫ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। শনিবার শনাক্তের হার ২৭ শতাংশ। মারা গেছেন চারজন। এছাড়া যশোর জেনারেল হাসপাতালে ৬৪ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। এদিকে করোনা সংক্রমণ রোধে যশোর পৌরসভা ও নওয়াপাড়া পৌরসভায় ঘোষিত লকডাউন আদলের বিধিনিষেধ কার্যকর করতে তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে প্রশাসন।
গত ১৬ দিন ধরে যশোরের করোনা শনাক্তের হার উদ্বেগজনক। গত ২৪ ঘণ্টায় ১৩৩ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৩৫ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন যশোর সিভিল সার্জন অফিসের মেডিকেল অফিসার ডা. রেহনেওয়াজ।
এছাড়া যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ৪ জন। এর মধ্যে দুজন করোনা ডেডিকেটেড ইউনিটে এবং অপর দুজন আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি ছিলেন।