২০২০-২১ অর্থবছরে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ লাখ ১৫ হাজার ৪৩ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে বাড়িয়ে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ লাখ ২৫ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা। দেশের মোট বাজেটের বিশাল এ অংশ ব্যয়ে ব্যাপক দুর্নীতি-অনিয়ম ও অপচয়ের কথা তুলেছে খোদ সরকারেরই একটি সংস্থা। সংস্থাটি বলছে, সরকারি দপ্তরের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা, স্থানীয় প্রভাবশালীদের প্রভাব এবং ঠিকাদারদের অনৈতিক যোগসাজশের কারণে সরকারি স্থাপনাগুলো নির্মাণের পরপরই গুণগত মান নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি হচ্ছে এবং কখনো কখনো অতি দ্রুত অবকাঠামোগুলোর অবস্থা অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়ছে। এজন্য তারা ১১টি কারণ চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে অর্থ ব্যয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা অসৎ উদ্দেশ্যে ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে দুর্নীতি, যৌক্তিকভাবে অর্থ বরাদ্দ না হওয়া, ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে কাজের মেয়াদ এবং ব্যয় বৃদ্ধি করা,মাঠপর্যায়ের সঙ্গে সমন্বয় ব্যতিরেকে প্রকল্প পরিকল্পনা প্রণয়ন, দায়িত্বে অবহেলা, বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতার অভাব, দাপ্তরিক শৃঙ্খলার অভাব বা দুর্বলতা, মাঠপর্যায়ের কাজ সম্পর্কিত পর্যাপ্ত ও কার্যকরী প্রশিক্ষণের স্বল্পতা অন্যতম। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) থেকে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এসব কথা বলা হয়েছে।
দুদক সচিব ড. মু. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার স্বাক্ষরিত চিঠিতে এসব অনিয়ম বন্ধে মাঠপর্যায়ে প্রকৌশলীদের দক্ষতা বাড়ানোসহ নির্মাণকাজের প্রাক্কলনে প্রকল্পের লাইফ স্প্যান (স্থায়িত্বকাল) সুস্পষ্ট থাকা, প্রকৌশল দপ্তরগুলো কাজের ধরন অনুযায়ী চেকলিস্ট প্রস্তুতকরণ, ‘কোড অব প্র্যাকটিস’, বিএনবিসি, এসিআই কোডসহ কাজ-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য স্ট্যান্ডার্ড প্রতিপালনে ১২টি মন্ত্রণালয়ের সচিব ও ১৪টি সংস্থাপ্রধানকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
দুদকের চিঠি : দুদকের সচিব ড. মু. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামের কাছে একটি চিঠি পাঠান। সেখানে দুদক সচিব বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রতিবছর উন্নয়ন বাজেটের আকার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকার প্রতিবছর নতুন রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট, সরকারি স্থাপনা/ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ ও সংস্কারে প্রচুর অর্থ ব্যয় করছে। উন্নয়ন কার্যক্রমের ব্যাপকতার ফলে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলো তাদের সীমিত জনবল দিয়ে সকল প্রকল্প সার্বক্ষণিক তদারকিতে সমর্থ হচ্ছে না। এ সুযোগে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজের গুণগত মান হ্রাস পাচ্ছে। আর এসব কাজে দুর্নীতির মাত্রাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।’
চিঠিতে তিনি আরও বলেন, ‘সরকারি দপ্তরের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা, স্থানীয় প্রভাবশালীদের প্রভাব এবং ঠিকাদারদের অনৈতিক যোগসাজশের কারণে সরকারি স্থাপনাগুলো নির্মাণের পরপরই গুণগত মান নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি হচ্ছে এবং কখনো কখনো অতিদ্রুত অবকাঠামোগুলোর অবস্থা অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়ছে মর্মে অভিযোগ পাওয়া যায়। দেশের ভৌত অবকাঠামো খাতের চলমান উন্নয়নকে টেকসই রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে এ ধরনের দুর্নীতি দ্রুত রোধ করা অতীব প্রয়োজন। যেকোনো নির্মাণকাজের প্রাক্কলনে প্রকল্পের লাইফ স্প্যান (স্থায়িত্বকাল) সুস্পষ্ট থাকা বাঞ্ছনীয়। তাই সরকারি অর্থ অপচয় ও দুর্নীতি রোধে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল দপ্তরগুলো যেন যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে তা নিশ্চিতকরণে প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।’
এ চিঠি পাওয়ার পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব (জেলা ম্যাজিস্ট্রেসি নীতি অধিশাখা) মো. মাজেদুর রহমান গুরুত্বপূর্ণ ১২ জন সচিবকে বিষয়টি অবহিত করে চিঠি দেন। সেখানে রয়েছেÑ স্থানীয় সরকার, পানিসম্পদ, কৃষি, গৃহায়ন ও গণপূর্ত, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, সেতু বিভাগ, রেলপথ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ এবং দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব।
অনিয়ম-দুর্নীতির ১১ কারণ চিহ্নিত : দুর্নীতি প্রতিরোধ, সরকারি অর্থ অপচয় রোধকল্পে সরকারি নির্মাণকাজের স্থায়িত্ব ও গুণগতমান নিশ্চিতের বিষয়ে ১১টি কারণ চিহ্নিত করেছে দুদক। এগুলো হলোÑ অসৎ উদ্দেশ্যে ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে দুর্নীতি, যৌক্তিকভাবে অর্থ বরাদ্দ না হওয়া, ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে কাজের মেয়াদ এবং ব্যয় বৃদ্ধি করা, মাঠপর্যায়ের সঙ্গে সমন্বয় ব্যতিরেকে প্রকল্প পরিকল্পনা প্রণয়ন, দায়িত্বে অবহেলা, বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতার অভাব, দাপ্তরিক শৃঙ্খলার অভাব বা দুর্বলতা, মাঠপর্যায়ের কাজ সম্পর্কিত পর্যাপ্ত ও কার্যকরী প্রশিক্ষণের স্বল্পতা, নির্মাণকাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের বাস্তব কাজ সম্পর্কিত জ্ঞানের অভাব, প্রয়োজনীয় জনবল সংকট এবং পরিদর্শনীয় যানসহ অন্যান্য লজিস্টিক সহায়তার সংকট।
সুপারিশ : দুর্নীতি প্রতিরোধসহ টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে প্রকৌশলীদের দক্ষতা বাড়ানোর পরামর্শ দেয় দুদক। সেখানে বলা হয়, সরকারি প্রকৌশল দপ্তরে নিয়োগকৃত যেকোনো স্তরের প্রকৌশলীদের পদায়নের আগে নির্মাণ ব্যবস্থাপনা, সরকারি ক্রয়, মতবিনিময় দক্ষতা, দাপ্তরিক শৃঙ্খলা, আধুনিক নির্মাণ কৌশল, আধুনিক রক্ষণাবেক্ষণ কৌশল ও মাঠপর্যায়ের অন্যান্য সমূহের ওপর বিস্তারিত কার্যকরী প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। নির্মাণ সাইটে নিয়োজিত প্রকৌশলী প্রতিদিনের কাজের বিবরণ নির্দিষ্ট ছকে প্রতিবেদন রিপোর্টিং প্রকৌশলীর কাছে পাঠাবে। প্রতিটি নির্মাণ সাইটে সার্বক্ষণিক তদারকির জন্য ‘রিয়েল টাইম মনিটরিং’ ব্যবস্থা চালু করবে। নির্মাণ সাইটে যাবতীয় কাজের ত্রুটি-বিচ্যুতি, প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা ও করণীয় লিপিবদ্ধ করার জন্য আবশ্যিকভাবে সাইট অর্ডার বুক সংরক্ষণ করতে হবে। নির্মাণকাজ সুষ্ঠুভাবে শেষ করার জন্য প্রকৌশলী দপ্তরগুলো কাজের ধরন অনুযায়ী চেকলিস্ট প্রস্তুত করবে এবং মাঠপর্যায়ে তদারককারী প্রকৌশলীর কাছে পাঠাবে। বিভিন্ন ধরনের নির্মাণকাজের ক্ষেত্রে চেকলিস্ট বিভিন্ন হবে। যেমনÑ ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে সাইট সিলেকশন, ড্রয়িংস, ডিসমেন্টলিং ওয়ার্ক, সেইফটি, ফাউন্ডেশন লে-আউট, এক্সকাভেশন ওয়ার্ক, পাইল ড্রাইভিং, রিইনফোর্সমেন্ট ওয়ার্ক, শাটারিং ওয়ার্ক, ঢালাইয়ের আগে, ঢালাই চলাকালীন, ঢালাইয়ের পরে, ফিনিশিং ওয়ার্ক।
সরকারি যেসব কাজে অভিযোগ পাওয়া যায় সেগুলোর ভিত্তিতে দরপত্রে উল্লিখিত বিনির্দেশ, বিভিন্ন প্রকৌশল দপ্তরের কাজের জন্য নির্ধারিত ‘কোড অব প্র্যাকটিস’, বিএনবিসি, এসিআই কোডসহ কাজ-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য স্ট্যান্ডার্ড প্রতিপালন করার পাশাপাশি আরও কিছু নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। এগুলো হলোÑ ঢালাইয়ের আগে আয়তন হিসাবপূর্বক দরপত্রে উল্লিখিত কারিগরি বিনির্দেশ অনুযায়ী ম্যাটেরিয়ালসের পরিমাণ ও গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। ঢালাইয়ের আগে রিইনফোর্সমেন্ট ও শাটারিং চেক নিশ্চিত করতে হবে। ঢালাই চলাকালে কংক্রিট মেশানোর সময় সব ধরনের রেশিও নিশ্চিত করতে একজন প্রকৌশলীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। ঢালাইয়ের পর বিএনবিসি ও এসিআই কোড অনুযায়ী কনক্রিট কিউরিং নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া ভবন নির্মাণে ইটের গাঁথুনি, প্লাস্টারে দরপত্রে উল্লিখিত সব ধরনের কারিগরি নির্দেশনা ও রাস্তা নির্মাণের ক্ষেত্রে গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে।
সম্প্রতি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) মো. দেলওয়ার হায়দার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা যেসব কাজ করি সবগুলোতেই পিপিআর ও পিপিএ মেনে করি। এখানে অনলাইন দরপত্র আহ্বান করে কাজের প্রতিটি স্তরে কঠোর নজরদারির পাশাপাশি স্বচ্ছতায়ও দেওয়া হচ্ছে মনোযোগ। এছাড়া সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা সিপিটিইউ ক্রয়সংক্রান্ত কাজে দেখভাল করছে।’