টার্গেট প্রশাসনের নারী কর্মকর্তারা

সরকারের ভেতরে এবং বাইরে থাকা একটি গোষ্ঠী নারী কর্মকর্তাদের টার্গেট করেছে। গোষ্ঠীটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই নানা সিদ্ধান্তে নারী কর্মকর্তাদের বিতর্কিত করতে চাচ্ছে। একই সময়ে পুরুষ কর্মকর্তারা নানা ধরনের ‘অপকর্মে’ জড়ালেও প্রচার পাচ্ছে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হচ্ছে নারী কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড। সংশ্লিষ্টদের ধারণা নারীর ক্ষমতায়নে ঈর্ষান্বিত হয়ে ক্রমাগত এ ধরনের কর্মকা- ঘটানো হচ্ছে। নারী কর্মকর্তাদের হেয় করতে নানা পথ অবলম্বন করছে তারা। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনেও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে।

গাছের পাতা খাওয়ার অভিযোগে ছাগলের মালিককে ইউএনওর জরিমানা, বাড়ির মালিক ত্রাণ চাওয়ায় ১০০ জনকে ত্রাণ দিতে ইউএনওর বাধ্য করানো, লকডাউনে সবজি বিক্রি করায় বা চলাচল করায় তিন বয়স্ক নাগরিককে কান ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখার মতো কয়েকটি ঘটনার আদেশদাতা নারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একটি গোষ্ঠী ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছে। দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে ইউএনওকে হত্যাচেষ্টার ঘটনাটির এক সময় মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। ঘটনাটি ইউএনওর ব্যক্তিগত ঘটনার রেষারেষির ফল হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়। করোনার সংক্রমণ রোধে চলা বিধিনিষেধের মধ্যে পরিচয়পত্র দেখতে চাওয়ায় পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে বাগ্বিতন্ডায় জড়িয়ে পড়া নারী চিকিৎসককে নিয়েও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক চর্চা হয়েছে। শুধু তাই নয়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পরিবারের সদস্যদেরও কখনো কখনো টেনে আনা হচ্ছে।

দেশে যখন নারী কর্মীদের জয়জয়কার তখন নারীকে পেছনে ফেলে রাখার অপচেষ্টায় ভূমিকা রাখছে খোদ প্রশাসনের কিছু সিদ্ধান্তও। কর্মকর্তাদের পদায়ন নীতিমালার খসড়া করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। সেখানে বলা হয়েছে, যে উপজেলার ইউএনও নারী হবেন সেখানে এসিল্যান্ড পুরুষ হতে হবে। বা এসিল্যান্ড নারী কর্মকর্তা হলে ইউএনও হবেন পুরুষ। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শেষ হতে না হতেই সামনে আনা হয়েছে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গার্ড অব অনার প্রদানের বিষয়টি। নারী কর্মকর্তাদের পরিবর্তে পুরুষ কর্মকর্তাদের দিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গার্ড অব অনার দেওয়ার সুপারিশ করেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটি।

বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস ওমেন নেটওয়ার্কের মহাসচিব সায়লা ফারজানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কাজ করতে গেলে ভুল হতেই পারে। সেই ভুল ধরেই যদি ব্যাপক হাইলাইট করা হয়, পজিটিভ বিষয়গুলো প্রচারের আলোয় না আসে সেটা দুঃখজনক। নারীদের নেতিবাচক খবরটাই বেশি আসছে। সব সেক্টরে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। সর্বত্র নারীরা অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে কাজ করছে। ভালো করায় তারা বড় কাজের সুযোগ পাচ্ছে। ভালো করতে গিয়ে মাঝে মাঝে বিচ্যুতিও হচ্ছে। আর এই বিচ্যুতিগুলো ব্যাপকভাবে প্রচারণায় ব্যবহার হচ্ছে। যারা টার্গেট করে এসব করছে সামগ্রিক বিবেচনায় আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারছি না। তবে ভালো কাজ দিয়েই আমাদের জবাব দিতে হবে।’   

এক প্রশ্নের জবাবে সিভিল সার্ভিস ওমেন নেটওয়ার্কের মহাসচিব বলেন, ‘বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর পর গার্ড অব অনার দেওয়ার ক্ষেত্রে নারী ইউএনওর বিকল্প চাওয়ার সুপারিশে আমরা মর্মাহত। তবে সুপারিশ হতেই পারে। সুপারিশ মানেই সিদ্ধান্ত নয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় যখন এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে তখন নিশ্চয়ই সামগ্রিক বিষয়টি বিবেচনায় নেবে।’

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সংসদীয় কমিটির এই প্রস্তাবটি ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। এই যুগে এসে সংসদ সদস্যদের এমন প্রস্তাবে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অনেক কর্মকর্তা। প্রশাসনের শুধু নারী কর্মকর্তারাই এর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখাননি, পুরুষ সহকর্মীরাও এর সমালোচনায় মুখর হয়েছেন। একজন যুগ্ম সচিব নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘সংসদীয় কমিটির এ সুপারিশ চিন্তাই করা যায় না। এটা মৌলিক অধিকার পরিপন্থী। সংবিধানের তৃতীয় ভাগ যে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছে এটা তার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।’

সংবিধানের ২৮ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কেবল ধর্ম গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না। (২) রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষ সমান অধিকার লাভ করিবেন।’

বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর পর গার্ড অব অনার দেওয়ার ক্ষেত্রে নারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বিকল্প ব্যক্তি নির্ধারণে সংসদীয় কমিটির সুপারিশের ব্যাপারে চলমান বিতর্ক নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আপনারা যেভাবে শুনেছেন, আমিও সেভাবেই শুনেছি। এ নিয়ে মন্ত্রিসভায় কোনো আলোচনা হয়নি।’

এ সময় সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পড়ে শোনান একজন সাংবাদিক। তখন মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘এটা তো সামারি বললেন। মিটিংয়ে কী বলেছেন সেটা দেখতে হবে, আমাকে জানতে হবে। গার্ড অব অনার নিয়ে কেন বলেছেন জানি না। ধর্মীয় বিধান নিয়ে যদি বলত তাহলে বলা যেত, লেট আস সি। অনেক সময় কোর্টে কোনো পক্ষ হাইকোর্টের রুলিং দেখিয়ে বলেন, রুলিংয়ে এটা আছে, পড়ে শোনাতে বলার পর দেখা যায় ইম্পিলকেশনটা উল্টো।’

গার্ড অব অনারে নারী কর্মকর্তার উপস্থিতি সম্পর্কে আপত্তি প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। এটি নারীবিদ্বেষী ও সংবিধানবিরোধী সুপারিশ বলেও মন্তব্য করেছে কমিটি। গতকাল সোমবার সংগঠনের কেন্দ্র ও উপদেষ্টা পরিষদের পাঠানো এক যৌথ বিজ্ঞপ্তিতে এ মন্তব্য করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রদত্ত গার্ড অব অনারে সরকারের নারী কর্মকর্তা বা পুলিশ বাহিনীর নারী সদস্যদের উপস্থিতির বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি যে সুপারিশ করেছে, এ বিষয়ে আমরা হতভম্ব। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সংসদীয় কমিটি ধর্মের দোহাই দিয়ে কীভাবে এ ধরনের নারীবিদ্বেষী, মানবাধিকারবিরোধী, সংবিধানবিরোধী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী সুপারিশ করতে পারে তা আমাদের বোধের অতীত। আমরা এই ন্যক্কারজনক প্রস্তাবের তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা জ্ঞাপন করছি।’

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা। কিন্তু প্রায়ই চেকিংয়ের নামে হেনস্তা করার অভিযোগ ওঠে পুলিশের বিরুদ্ধে। অনেকের পকেটে ইয়াবা গুঁজে দিয়ে মামলা দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। ২০১৮ সালে রাকিব রাজ নামক পুলিশের এক সদস্য ফেইসবুকে একটি ভিডিও শেয়ার করেন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘দেখুন একটা অসভ্য মেয়ের কারসাজি। আজ রাত ২টায় (২২.১০.১৮ তাং) এই মেয়েটাকে পুলিশ চেকপোস্টে পুলিশ চেক করতে চাইলে সে পুলিশের সাথে এইরকম ব্যবহার করে। সবাই প্লিজ শেয়ার করবেন।’ পরে বিভিন্ন নামে একই পোস্ট বিভিন্ন পাবলিক গ্রুপেও পোস্ট করা হয়। ঘটনাটি ছিল, গভীর রাতে মেয়েটি সিএনজিতে করে কোথাও যাচ্ছিলেন। উত্তরা-খিলক্ষেতের দিকে কোনো এক চেকপোস্টে মেয়েটিকে আটকায় পুলিশ। এরপর তাকে চেক করার বদলে বাগ্বিত-া শুরু করে। ভিডিওতে  দেখা যায়, মেয়েটি কোনো এক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অশোভন আচরণ করার অভিযোগ আনেন। পুলিশ সদস্যরা তাকে বাজে কথাও বলেন, মেয়েটি নাকি ‘হোটেল থেকে নেমে এসেছেন’। উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের এমন আচরণে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন সেই নারী। তারা এরপর তাকে ‘অ্যাডিক্টেড’ বলেও মন্তব্য করেন।

ওপরের ঘটনাটি উল্লেখ করে একজন কর্মকর্তা বলেন, মেয়েটি রাতে বাসা থেকে বের হয়েছে বলে তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। একইভাবে চাকরি করতে ঘরের বাইরে বের হয় বলে মেয়েদেরকে কথা শুনতে হয় পরিবারে এমনকি কর্মস্থলেও। এসব প্রতিকূলতা ডিঙ্গিয়েই মেয়েদের কাজ করতে হচ্ছে এবং অদূর ভবিষ্যতে করতে প্রস্তুত থাকতে হবে।  

একজন নারী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরকারের বিভিন্ন নীতির কারণে ব্যাপক হারে নারীরা কাজে আসছেন। কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ ও প্রভাব উভয়ই বাড়ছে। কর্মক্ষেত্রে নারীদের সঙ্গে পেরে না ওঠার কারণে বৈরিতার সৃষ্টি হচ্ছে। এক্ষেত্রে পুরুষ সহকর্মীরা অনেক সময় নারী সহকর্মীর বিভিন্ন ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করছেন ও ভাইরাল হতে সহায়তা করছেন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরকার অনেক সময় তদন্ত না করেই পরিস্থিতি অবনতি হওয়ার ভয়ে কর্মকর্তাদের ওপর অবিচার করে থাকে। সম্প্রতি একজন ডিসিকে পদায়নের কয়েক মাসের মধ্যে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল তিনি অন্যের স্ত্রীর প্রতি আসক্ত। ওই নারীও চাকরি করেন। ওই নারীর স্বামী নিজে সংশ্লিষ্টদের কাছে ওই ডিসির বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। কিন্তু ঘটনার তদন্ত করে সংশ্লিষ্টরা জেনেছেন অনেক বছর আগেই অভিযোগকারী স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটিয়েছেন কর্মজীবী নারী। প্রতিশোধপরায়ণতা থেকে সাবেক স্ত্রীকে ডিসির সঙ্গে জড়িয়ে নানা কথা রটিয়েছিলেন তিনি।

নারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে যা হচ্ছে তা জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতির পরিপন্থী বলে মনে করছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। নারী উন্নয়ন নীতিতে নারীর প্রশাসনিক ক্ষমতায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যায়ে নারীকে সম্পৃক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এমনকি নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পেয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ ইতিবাচক বলেও বলা হয়েছে খোদ নারী উন্নয়ন নীতিতে।