করোনা মহামারীর কারণে ঋণ পরিশোধে শিথিলতা থাকলেও গত মার্চে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। ফলে ঝুঁকিবাহিত সম্পদের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে বেগ পেতে হয়েছে ব্যাংকগুলোকে। তবে পর্যাপ্ত আয় না থাকায় ১১টি ব্যাংক প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে পারেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায়, বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) প্রয়োজনীয় প্রভিশন রাখতে ব্যর্থ হওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংক; বেসরকারি খাতের বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ১২ হাজার ৬৪৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী সরকারি, বেসরকারি ও বিদেশিসহ সব ধরনের ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের গুণমান বিবেচনায় নির্দিষ্ট হারে প্রভিশন রাখতে হয়। কোনো ঋণ শেষ পর্যন্ত মন্দ ঋণে পরিণত হলে তাতে যেন ব্যাংক আর্থিকভাবে ঝুঁকিতে না পড়ে, সে জন্য প্রভিশন সংরক্ষণের বিধান রাখা হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ১১ লাখ ৭৭ হাজার ৬৫৮ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপির পরিমাণ ৯৫ হাজার ৮৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের ৮ দশমিক ০৭ শতাংশ।
গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৮৮ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। সেই হিসাবে আলোচিত সময়ে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬ হাজার ৩৫১ কোটি টাকার বেশি।
এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনার প্রভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাব বিরাজ করছে। ব্যবসায়ীরা ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না। আবার অনেকে বিশেষ সুবিধার আশায় ইচ্ছা করে ঋণের কিস্তি দিচ্ছে না। এসব কারণে খেলাপি ঋণ বাড়ায় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে পারেনি ব্যাংকগুলো।
তিনি বলেন, ঋণের ঝুঁকি কমাতে হলে আদায় বাড়াতে হবে। যাচাই-বাছাই করে সঠিক নিয়মে ঋণ দিতে হবে। বিশেষ করে সরকারি ব্যাংকগুলোর বিষয়ে নজর দিতে হবে। ঋণ আদায়ে জোর দিতে হবে। সুশাসন নিশ্চিত ও স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। এখন ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য আছে। এ অর্থ সঠিক জায়গায় বিনিয়োগ করতে হবে। বড় ঋণে নিরুৎসাহিত করে ছোট ছোট ঋণে বেশি জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন সাবেক এ গভর্নর।
আলোচিত সময়ে প্রভিশন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে সরকারি চার ব্যাংকের ঘাটতি ১০ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। এ খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি জনতা ব্যাংকের। মার্চ শেষে জনতা ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়ায় ৫ হাজার ২৫৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা। এরপরই বেসিক ব্যাংকের ৩ হাজার ৫৬৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা, অগ্রণী ব্যাংকের ১ হাজার ৩৫৬ কোটি ৪৭ লাখ টাকা এবং রূপালী ব্যাংকের ৭৮৮ কোটি ৪১ লাখ টাকা প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে।
বেসরকারি খাতের ছয় ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ১ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রভিশন ঘাটতি বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের। মার্চ মাস শেষে এই ব্যাংকটির ঘাটতি ৫৫৮ কোটি ৫১ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। এ ছাড়া ঢাকা ব্যাংকের ২৪৬ কোটি ২৩ লাখ টাকা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ১৯৫ কোটি ৪৯ টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংকের ৩৩৮ কোটি ১২ লাখ টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৭৩ কোটি টাকা এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ১৫৭ কোটি ৯১ লাখ টাকা প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে। বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ১৬৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।
জানা গেছে, কয়েকটি ব্যাংক প্রয়োজনের অতিরিক্ত প্রভিশন রাখায় সার্বিকভাবে ব্যাংক খাতে প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ কিছুটা কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল ৬৮ হাজার ৬৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ব্যাংকগুলো সংরক্ষণ করতে পেরেছে ৬২ হাজার ৮০৭ কোটি ২০ লাখ টাকা। ফলে সার্বিকভাবে ব্যাংক খাতে মোট প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়ায় ৫ হাজার ২৫৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।
জানা গেছে, ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে তা ঋণ হিসেবে বিতরণ করে থাকে। আমানতকারীদের এই অর্থ যেন ঝুঁকির মধ্যে না পড়ে সে জন্য প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজন হয়। নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকের অশ্রেণিকৃত বা নিয়মিত ঋণের বিপরীতে শূন্য দশমিক ২৫ থেকে ৫ শতাংশ হারে প্রভিশন রাখতে হয়। এর মধ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণের (এসএমই) বিপরীতে সবচেয়ে কম শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ আর ক্রেডিট কার্ডে রাখতে হয় সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ প্রভিশন।
এছাড়া নিম্নমান বা সাব স্ট্যান্ডার্ড ঋণের বিপরীতে ২০ শতাংশ, সন্দেহজনক ঋণের বিপরীতে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ বা কু-ঋণের বিপরীতে ১০০ শতাংশ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়।
ব্যাংকের আয় খাত থেকে অর্থ এনে প্রভিশনিং করা হয়। খেলাপি ঋণ বাড়লে আর সে অনুযায়ী ব্যাংকের আয় না হলে প্রভিশন ঘাটতি দেখা দেয়। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, প্রভিশন ঘাটতি থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারে না। তবে বর্তমানে অনেক ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ডেফারাল সুবিধা নিয়ে দেরিতে প্রভিশন সংরক্ষণ করছে।
এদিকে মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে বিশেষ সুযোগ নিয়ে বছরজুড়ে কিস্তি না দিয়েও যেসব ঋণ খেলাপি হওয়া থেকে ছাড় পেয়েছে, সেসব ঋণের বিপরীতে এখন অতিরিক্ত ১ শতাংশ প্রভিশন (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) সংরক্ষণ করতে গত ডিসেম্বরে নির্দেশনা জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।