ঢাকার বাইরে করোনা পরিস্থিতি বেসামাল হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে করোনা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণহীন। এছাড়া দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের কয়েকটি জেলায়ও হু হু করে বাড়ছে সংক্রমণ ও মৃত্যু। গতকালও দেশে যে ৫৪ মৃত্যুর তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দিয়েছে তার বেশিরভাগই রাজধানীর বাইরের। এসব এলাকায় কঠোর বিধিনিষেধ ও লকডাউন দিয়েও থামানো যাচ্ছে না সংক্রমণ। সংশ্লিষ্ট এলাকার দেশ রূপান্তর প্রতিনিধিরা সেখানকার বিশেষজ্ঞদের বরাতে জানিয়েছেন, বিধিনিষেধ অগ্রাহ্য করা এবং পরীক্ষায় আগ্রহ কম থাকার কারণে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুয়ায়ী, বৃহস্পতিবার ঢাকা বিভাগে মারা গেছে ১২ জন। তবে এর মধ্যে অন্তত ৪ জন ঢাকা শহরের বাইরে। এছাড়া এই দিন সবচেয়ে বেশি ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে। রাজশাহী বিভাগেও মারা গেছেন ১২ জন। এছাড়া মারা যাওয়াদের মধ্যে ৮ জন খুলনা বিভাগের, ৫ জন বরিশাল বিভাগের, ২ জন সিলেট বিভাগের এবং ১ জন ময়মনসিংহ বিভাগের বাসিন্দা ছিলেন। এছাড়া এই বিভাগগুলোর অনেক জেলায়ই শনাক্ত রোগীর সংখ্যা আগের থেকে বেড়েছে। গতকাল যেখানে সারা দেশে গড় শনাক্তের হার ১৮ শতাংশের মতো, সেখানে সীমান্তবর্তী কয়েকটি জেলা ও মধ্যাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় শনাক্তর হার ছিল ৬০ শতাংশের ওপরে।
রামেক হাসপাতালে আরও ১২ মৃত্যু : রাজশাহী অঞ্চলে করোনায় মৃত্যু কমছেই না। শুক্রবার আবারও ১২ জনের মৃত্যুর খবর দিলো রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। মৃতদের মধ্যে রাজশাহীর ৫ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ২, নাটোরের ২ ও নওগাঁর ৩ জন করে। এ নিয়ে চলতি মাসে ১৮ দিনে এ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে মারা গেছেন ১৮৩ জন। এর মধ্যে শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছেন ১০২ জন। বাকিরা মারা যান উপসর্গ নিয়ে।
হাসপাতাল পরিচালক জানান, হাসপাতালে ভর্তি ও চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা কিছুটা কমেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় রামেক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪১ জন। আগের দিন এ সংখ্যা ছিল ৪৪ জন। আর সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৫১ জন। যা আগের ২৪ ঘণ্টায় ছিল ৩১ জন। শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত এ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ৩৪৯ জন। বৃহস্পতিবার সকালে রোগী ভর্তি ছিলেন ৩৫৮ জন। এদিকে, করোনা সংক্রমণ কমাতে রাজশাহী শহরে গতকাল অষ্টম দিনের মতো বিশেষ লকডাউন চলেছে। শহরের বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিপণিবিতান বন্ধ রয়েছে। গণপরিবহনও বন্ধ। তবে শুক্রবার বিকেল থেকে শহরের রাস্তায় মানুষের চলাচল কিছুটা বেড়ে যায়। কাঁচাবাজারে যাওয়া বা জরুরি প্রয়োজনের কথা বলে অনেকেই রাস্তায় বেরিয়েছেন। রাস্তায় রিকশা ও অটোরিকশার সংখ্যাও আগের কয়েক দিনের তুলনায় বেড়েছে।
খুলনায় করোনায় শনাক্তের সংখ্যা বেড়েছে, কমেছে মৃত্যু : খুলনা বিভাগে প্রতিদিনই বেড়েই চলেছে শনাক্তের সংখ্যা। তবে গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে কমেছে মৃতের সংখ্যা। ২৪ ঘণ্টায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৩৩ জনের। সুস্থ হয়েছেন আরও ১০৭ জন।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তরের তথ্য মতে, ২৪ ঘণ্টায় খুলনায় ২ জন, যশোরে ২ জন, নড়াইলে ২ জন, মেহেরপুরে একজন ও সাতক্ষীরায় একজন করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। এর আগে বৃহস্পতিবার বিভাগে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ১৮ জনের মৃত্যু হয়। একই সময়ে ৭৬৫ জনের শরীরে করোনার উপস্থিতি পাওয়া যায়।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জেলাভিত্তিক করোনাসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, খুলনায় ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ২২৬ জন। এ নিয়ে জেলায় মোট করোনা শনাক্ত হয়েছেন ১২ হাজার ৪৪৯ জন। মারা গেছেন ২০৩ জন এবং সুস্থ হয়েছেন ৯ হাজার ৮৯৪ জন।
২৪ ঘণ্টায় বাগেরহাটে নতুন করে করোনা শনাক্ত হয়েছেন ৮৯ জন। এ নিয়ে জেলায় মোট করোনা শনাক্ত হলো ২ হাজার ৪৭৯ জন। আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৬৩ জন এবং সুস্থ হয়েছেন ১ হাজার ৬৬৬ জন।
সাতক্ষীরায় ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ৮৫ জন। এ নিয়ে জেলায় মোট করোনা শনাক্ত হয়েছেন ২ হাজার ৭৯৬ জন এবং মারা গেছেন ৫৬ জন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ হাজার ৮৭২ জন।
যশোরে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ২৯১ জন। এ নিয়ে জেলায় মোট করোনা শনাক্ত হয়েছেন ৯ হাজার ২৪৪ জন। মারা গেছেন ১০১ জন এবং সুস্থ হয়েছেন ৬ হাজার ৭৪১ জন।
২৪ ঘণ্টায় নড়াইলে নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ৪৬ জন। এ নিয়ে জেলায় মোট করোনা শনাক্ত হয়েছেন ২ হাজার ২১০ জন। মারা গেছেন ৩০ জন এবং সুস্থ হয়েছেন ১ হাজার ৮৪৭ জন।
মাগুরায় ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ১০ জন। এ নিয়ে জেলায় মোট করোনা শনাক্ত হয়েছেন ১ হাজার ৩৭৫ জন। এ সময় মারা গেছেন ২৪ জন এবং সুস্থ হয়েছেন ১ হাজার ২২০ জন।
ঝিনাইদহে ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ৫৪ জন। এ নিয়ে জেলায় মোট করোনা শনাক্ত হয়েছে ৩ হাজার ৩৮২ জন। মারা গেছেন ৬১ জন এবং সুস্থ হয়েছেন ২ হাজার ৮৫৮ জন।
২৪ ঘণ্টায় কুষ্টিয়ায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ১৫৬ জন। এ নিয়ে জেলায় মোট করোনা শনাক্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৬২ জন। মারা গেছেন ১৪০ জন এবং সুস্থ হয়েছেন ৪ হাজার ৯৫৭ জন।
চুয়াডাঙ্গায় ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ৫৯ জন। এ নিয়ে জেলায় মোট করোনা শনাক্ত হয়েছেন ২ হাজার ৪৪৭ জন। মারা গেছেন ৬৬ জন এবং সুস্থ হয়েছেন ১ হাজার ৯৩১ জন।
মেহেরপুরে নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ৩৩ জন। এ নিয়ে জেলায় মোট শনাক্ত হয়েছেন ১ হাজার ৩০০ জন। আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৩১ জন এবং সুস্থ হয়েছেন ৯৪৮ জন।
ফরিদপুরে করোনায় তিনজনের মৃত্যু : গত ২৪ ঘণ্টায় কভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে তিনজন। এসময় শনাক্ত হয়েছে ৯৪ জন। ফরিদপুর সিভিল সার্জন ডা. ছিদ্দীকুর রহমান জানান, করোনায় জেলায় এ পর্যন্ত মোট মৃত্যু হয়েছে ১৯৩ জনের। গত ২৪ ঘণ্টায় পিসিআর ল্যাবের ৩৩২টি নমুনা পরীক্ষায় করোনা পজিটিভ হয়েছে ৯৪ জন। জেলায় মোট শনাক্ত হয়েছে ১১ হাজার ৩২৮জন। আর সুস্থ হয়েছে ১০ হাজার ৪৫৭ জন।
নাটোরে ২ জনের মৃত্যু : নাটোরে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনার উপসর্গ নিয়ে সদর হাসপাতালে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। নতুন করে আরও ৬৫ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় ২৭৬ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৬৫ জনের পজিটিভ আসে। নাটোর শহর এলাকায় সংক্রমণের হার ৭৬ শতাংশ। জেলায় মোট আক্রান্ত ২৫০২ জন। ৪১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
টাঙ্গাইলে ইউপি চেয়ারম্যানের মৃত্যু : করোনায় আক্রান্ত হয়ে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার দিঘলকান্দি ইউপি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মারা গেছেন। শুক্রবার সকালে তিনি মারা যান। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত সপ্তাহে তিনি করোনায় আক্রান্ত হয়ে ঢাকা স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন। কিছুদিন চিকিৎসা নিয়ে তিনি বাড়ি চলে আসেন। পরে গত রাতে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। এ সময় তাকে মধুপুর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় মৃত্যু হয়।
টাঙ্গাইল সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা যায়, জেলায় করোনা সংক্রমণের হার বেড়ে ৪৩.২৮ ভাগে দাঁড়িয়েছে। বিধিনিষেধ চলমান থাকার পরও জেলার হাটবাজার ও শপিং মলগুলোতে মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি।
মাগুরায় পরীক্ষায় আগ্রহ কম : মাগুরায় আশঙ্কাজনক হারে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। জুনের প্রথম ৩ সপ্তাহে জেলায় আক্রান্ত হয়েছেন ১২২ জন। যা গত মে মাসে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৩২ জন। জুন মাসের ১৮ দিনেই আক্রান্তের হার মে মাসের তুলনায় তিন গুণের বেশি। বৃহস্পতি ও শুক্রবারে করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে ৩১ জনের। এদিকে জেলায় মাত্রাতিরিক্ত করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় গত ১৪ জুন জেলা প্রশাসন জেলা শহর ও মহম্মদপুর উপজেলাকে লকডাউনের আওতায় এনে কঠোর বিধিনিষেধ জারি করেছেন।
মাগুরায় অনেকেই জ্বর, সর্দি-কাশিসহ বিভিন্ন উপসর্গকে এখনো সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা হিসেবে মনে করে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিচ্ছেন। পাশাপাশি করোনা পরীক্ষা না করানোর বিষয়ে রয়েছে এ বিষয়ক নানা অপপ্রচার, আতঙ্ক ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা। এ বিষয়ে মাগুরা সিভিল সার্জন শহিদুল্লাহ দেওয়ান বলেন, এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য বিভাগ, পৌরসভা, জেলা প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রচার প্রচারণা চালানো হচ্ছে। কিন্তু অনেকে জ্বর, সর্দি, কাশিকে এখনো মৌসুমি অসুখ হিসেবে চিহ্নিত করছেন। খুব জটিল পর্যায়ে না গেলে তারা করোনার নমুনা পরীক্ষার বিষয়ে আগ্রহী হচ্ছেন না।
থেকে জেলা শহর ও মহম্মদপুর উপজেলাকে লকডাউনের আওতায় এনেছে জেলা প্রশাসন। মূল শহরের প্রধান সড়কগুলোতে আনুপাতিক হারে যানবাহন চলাচল কিছুটা কম। তবে পায়ে হাঁটাসহ বিকল্প নানা উপায়ে বিপুলসংখ্যক মানুষকে শহরে ভিড় করতে দেখা গেছে। লকডাউন কার্যকরে নিয়োজিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা মাস্ক না পরাসহ লকডাউনের নানা বিধি লঙ্ঘনের দায়ে বেশ ক’জনকে আর্থিক দন্ড দিয়েছেন।