সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইসলামি বক্তা হিসেবে পরিচিত আবু ত্ব-হা মোহাম্মদ আদনান ব্যক্তিগত কারণে আত্মগোপনে ছিলেন বলে দাবি করেছে পুলিশ। গতকাল শুক্রবার বাড়ি ফিরলে ত্ব-হা ও তার সঙ্গীদের প্রথমে রংপুর মহানগর পুলিশের (আরএমপি) গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে তাদের আদালতে নেওয়া হলে রাত সাড়ে ১১টার দিকে নিজ নিজ পরিবারের জিম্মায় দেন চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক কেএম হাফিজুর রহমান।
এর আগে রাত সাড়ে ৯টার দিকে রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) কার্যালয় থেকে ত্ব-হা ও অন্যদের আদালতে নেওয়া হয়। সেখানে ‘স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে’ যাওয়ার বিষয়টি জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন আবু ত্ব-হা মোহাম্মদ, তার সঙ্গী আব্দুল মুহিত ও গাড়িচালক আমির উদ্দিন। আদালত তাদের ‘স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে’ যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেয়। গতকাল বিকেলে রংপুর ডিবি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উপপুলিশ কমিশনার (অপরাধ) আবু মারুফ হোসেন বলেন, ‘ত্ব-হা নিখোঁজের ঘটনায় দুটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছিল। তার মা একটি জিডি করেন এবং তার সঙ্গে নিখোঁজ থাকা আমিরুদ্দিনের ভাই ফয়সাল আরেকটি জিডি করেন। এরপর থেকে পুলিশ তাদের খোঁজে মাঠে নামে। প্রযুক্তিগত তদন্তসহ বিভিন্ন উপায়ে তদন্ত চলছিল। গতকাল সকালে আমরা গোপন সংবাদের মাধ্যমে জানতে পারি, ত্ব-হা তার প্রথম স্ত্রীর বাড়িতে আছেন। সেখান থেকে আটক করে তাকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়।’
পরিবারের অভিযোগ, ১০ জুন রংপুর থেকে ঢাকায় ফেরার পথে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন আবু ত্ব-হা। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। স্বামীর খোঁজ না পেয়ে স্ত্রী সাবিকুন নাহার গত বুধবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করেন। ওই দিনই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘ত্ব-হার নিখোঁজের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে।’ এ ঘটনার তিন দিনের মাথায় গতকাল ভোরে গাইবান্ধায় ত্ব-হার সন্ধান পান স্বজনরা।
জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের বরাত দিয়ে মারুফ হোসেন আরও বলেন, ‘১০ জুন রংপুর থেকে ভাড়া করা প্রাইভেট কারে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন আবু ত্ব-হা মোহাম্মদ আদনান, আব্দুল মুহিত, ফিরোজ আলম ও গাড়িচালক আমির উদ্দিন। পরে তারা ঢাকার গাবতলীতে পৌঁছালে ত্ব-হার ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে সেখান থেকে গাইবান্ধার ত্রিমোহনীতে চলে যান। সেখানে তার পূর্বপরিচিত বন্ধু সিয়ামের বাড়িতে অবস্থান করেন। এ সময় ত্ব-হার সঙ্গে আব্দুল মুহিত, ফিরোজ আলম ও গাড়িচালক আমির উদ্দিনও ছিলেন।
তিনি আরও বলেন, ‘ওই বাড়িতে অবস্থানকালে ত্ব-হার ইচ্ছা ও পরামর্শে সবাই তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন বন্ধ রাখেন। কিছুদিন এভাবে আত্মগোপনে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। মূলত পারিবারিক ও ব্যক্তিগত বিভিন্ন সমস্যার কারণে ত্ব-হা আত্মগোপনে থাকতে চান বলে সঙ্গীদের জানান এবং মোবাইল ফোন বন্ধ রাখতে বলেন। তার কথায় সায় দিয়ে অপর সঙ্গীরাও স্বেচ্ছায় মোবাইল ফোন বন্ধ করে আত্মগোপনে ছিলেন।
রংপুর ডিবি পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘তারা স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে থাকার দাবি করলেও এ ঘটনা রাষ্ট্র বা সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলার কোনো ষড়যন্ত্র কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।’
ত্ব-হার উদ্ধৃতি দিয়ে উপপুলিশ কমিশনার বলেন, ‘ত্ব-হা আমাদের তার ব্যক্তিগত কিছু সমস্যার কথা জানিয়েছেন। আমরা তার কথাগুলো যাচাই-বাছাই করছি। আমরা তাকে রংপুর কোতোয়ালি থানায় সোপর্দ করব। এই মুহূর্তে তার ব্যক্তিগত বিষয়গুলো মুখে আনতে চাই না। তদন্ত সাপেক্ষে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
তিনি বলেন, গতকাল দুপুর ২টায় আবু ত্ব-হা মোহাম্মদ আদনানের পরিবার থেকে জানানো হয়, তিনি বাড়ি ফিরেছেন। এরপর দুপুর পৌনে ৩টার দিকে নগরীর মাস্টারপাড়া এলাকার আজহারুল ইসলাম মণ্ডলের বাড়ি থেকে ত্ব-হাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কোতোয়ালি থানায় নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়।
খোকন নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, গতকাল দুপুর ১২টার দিকে রংপুর নগরীর মাস্টারপাড়ায় আবু ত্ব-হাকে দেখা যায়। ওই সময় তিনি কোনো কথা বলেননি। মুখে আঙুল দিয়ে চুপ থাকতে বলেন।
আবু ত্ব-হা মোহাম্মদ আদনানের প্রকৃত নাম আফছানুল আদনান। বয়স ৩১। তার মা আজেদা বেগম। বাবা মৃত রফিকুল ইসলাম। ছোট বোন রিতিকা রুবাইয়াত ইসলাম। আদনানের প্রথম স্ত্রী আবিদা নুর, তাদের সংসারে তিন বছরের একটি মেয়ে ও দেড় বছর বয়সী একটি ছেলে আছে।
বাবা মারা যাওয়ার পর রংপুর নগরীর সেন্ট্রাল রোডে নানার বাড়িতে বড় হন আদনান। বিয়ের পর স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে নগরীর নিউ শালবন এলাকায় বসবাস করেন। কয়েক মাস আগে আদনান আরেকটি বিয়ে করেন। তার দ্বিতীয় স্ত্রী সাবিকুন্নাহার সারা ঢাকার মিরপুর আল ইদফান ইসলামি গার্লস মাদ্রাসার পরিচালক ও শিক্ষক।