আলী ইমাম মজুমদার সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব। কর্মজীবনে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। সাম্প্রতিক নানা প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলেছেন এই জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তর সম্পাদকীয় বিভাগের এহ্সান মাহমুদ
দেশ রূপান্তর : বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যু-পরবর্তী গার্ড অব অনার দেওয়ার সময় নারী কর্মকর্তাদের বিকল্প ব্যবস্থা করার সুপারিশ করেছে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
আলী ইমাম মজুমদার : নারী ইউএনওদের গার্ড অব অনারে থাকার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা দেখি না। গার্ড অব অনার আর জানাজা তো এক নয়। শতাধিক উপজেলায় নারী ইউএনও রয়েছেন। তাহলে তো সব উপজেলায় পুরুষ ইউএনও দিতে হবে। এত ইউএনও কোথায় পাওয়া যাবে? আমি মনে করি, এই প্রস্তাবটি বাংলাদেশের সংবিধান বিরোধী। পাশাপাশি এটি নারীর ক্ষমতায়নেরও পরিপন্থী। সংসদীয় কমিটি যে সুপারিশ করেছে, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এখনো এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানায়নি। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সংসদীয় কমিটি বলছে, যেহেতু জানাজা যেখানে অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে নারীরা উপস্থিত থাকেন না তাই তারা এটি সুপারিশ করেছেন। কিন্তু এমনটা যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে আবার কয়দিন পরে কেউ কেউ বলার অবকাশ পাবেন, পুরুষ ইউএনওদের মধ্যে অমুসলিমও থাকেন। সেখানে হিন্দু থাকেন, বৌদ্ধ থাকেন, খ্রিস্টান থাকেন। অন্য ধর্মাবলম্বী কেউও থাকতে পারেন। তখন তারা আবার বলতে পারেন যে, জানাজায় মুসলমান ছাড়া কেউ উপস্থিত থাকতে পারবেন না। তখন বিষয়টি আরও খারাপ হবে। তাই আমি মনে করি, এসব কথা কোনো গুরুত্ব বহন করে না। আমার মতে, যেভাবে এটি এতদিন চলে আসছিল, সেভাবেই চলবে। প্রশাসনের নারী কর্মকর্তারা ও পুরুষ কর্মকর্তারা একই পদে থেকে একই রকম দায়িত্ব পালন করে থাকেন। তাই এটাকে যুক্তিসংগত কোনো প্রস্তাব বলে আমি মনে করি না।
দেশ রূপান্তর : স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পরেও সংসদ সদস্যরা নারী-পুরুষে বিভেদ প্রকাশ পায় এমন একটি প্রস্তাব কেন করলেন? এতে করে প্রশাসনের কাজে কেমন প্রভাব পড়বে?
আলী ইমাম মজুমদার : আমার মনে হয়, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সংসদীয় ওই কমিটিতে যারা রয়েছেন তারা এর প্রতিক্রিয়াটা কেমন হতে পারে কিংবা এতে কোথায় কোথায় জটিলতা হতে পারে সেসব নিয়ে খুব একটা ভেবে সুপারিশ করেননি। কেননা, বিষয়টি কেবল ইউএনওদের মধ্যেই থাকবে না। অনেক জেলায় জেলা প্রশাসক পদেও নারীরা রয়েছেন। তারাও অনেক সময়ে গার্ড অব অনারে উপস্থিত থাকেন। দেশে এখন ৬৪ জেলার মধ্যে ৮ জেলায় নারী জেলা প্রশাসক রয়েছেন। এছাড়া এমন অনেক উপজেলা আছে যেখানে ইউএনও এবং এসিল্যান্ড দুজনেই নারী। সেখানে বিকল্প পাওয়া কঠিন। তাই তারা যে প্রস্তাবটি দিয়েছেন, সেটি অগ্রহণযোগ্য এবং অবাস্তব। এটি সামগ্রিকভাবে আমাদের সংবিধানের চেতনার পরিপন্থী।
এই প্রস্তাব কাজে তেমন প্রভাব ফেলবে বলে আমি মনে করি না। এটি গৃহীত হবে বলেও আমার মনে হয় না। এই প্রস্তাব কোনো মহল থেকেও সাধুবাদ পায়নি। কোনো রাজনৈতিক দলও সমর্থন করেনি। সবাই বিরোধিতা করেছে। আমার মনে হয় না সরকার এই বিষয়ে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেবে যা নারীর বিরুদ্ধে যাবে। তাই এটি প্রশাসনের কাজেও প্রভাব ফেলার কথার নয়।
দেশ রূপান্তর : উপজেলা বা মাঠ পর্যায়ে দায়িত্বপালনরত নারী কর্মকর্তারা তুলনামূলক ভালোভাবে কাজ করছেন বলে আলোচনা শোনা যায়। এই বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।
আলী ইমাম মজুমদার : দেখেন, এই সমাজ সংসার জগৎ কিন্তু নারী-পুরুষ মিলেই চলে। নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণেই সবকিছু সার্থক ও সুন্দর। সেখানে প্রশাসনে যারা নারী রয়েছেন, তাদের মধ্যে অনেকেই বেশ ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। আবার পুরুষরাও ভালোভাবে কাজ করছেন। আবার অনেক নারী কর্মকর্তাও যেমন অগ্রহণযোগ্য কাজ করেন, তেমনি পুরুষ কর্মকর্তারাও করে থাকেন। দায়িত্বপালনে পুরুষের চেয়ে নারী এগিয়ে কিংবা নারীর চেয়ে পুরুষ এগিয়েএমন তুলনা করার পক্ষে আমি নই।
দেশ রূপান্তর : এবার ভিন্ন প্রসঙ্গ। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়িত্বপালনে রাজনৈতিক চাপের বিষয়টি প্রায়ই আলোচনায় আসে। এটি নিরসনে কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে?
আলী ইমাম মজুমদার : প্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে এবং আইন মেনে কাজ করতে দিতে হবে। এ জন্য মূলত রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকতে হবে। সেটা পূরণ করতে হবে। অনেক সময় অঙ্গীকার থাকে, বাস্তবায়ন হয় না। সরকারি কর্মকর্তারা জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে আইন, বিধি কিংবা সরকারি নির্দেশ অনুসারে কাজ করেন। তারা সেগুলো সঠিকভাবে করছেন কি না, এটা জনপ্রতিনিধিরা দেখতে পারেন। সেখানে ব্যত্যয় ঘটলে বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষের নজরেও আনতে পারেন তারা। তাদের অভিযোগ কিংবা মতামত সব স্তরেই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। কিন্তু যেটা জনপ্রতিনিধিদের কাজ নয়, সেখানে হস্তক্ষেপ প্রশাসনব্যবস্থার মূলে আঘাত হানছে। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের জন্য বিষয়টি আপাতমধুর হলেও পরিণতিতে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে। আর এর মধ্যেই তা ফেলতে শুরু করেছে। আমাদের দেশে আগেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই বিষয়টি ছিল। কিন্তু ১৯৯১ সালে আমরা তথাকথিত স্বৈরাচারমুক্ত হওয়ার পরে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হলে এই বিষয়টা ব্যাপক আকারে শুরু হয়। আস্তে আস্তে এটি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে এটি সীমাহীন হয়ে পড়েছে। বর্তমানে যেহেতু একটি দল দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় রয়েছে, কর্মকর্তারাই এখন দলের হয়ে বিভিন্ন কাজ শুরু করে দিয়েছেন। তারাই প্রমাণ করতে সচেষ্ট থাকছেন যে, তারাও এই দলের। এটি করতে গিয়ে আমলারাই ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে মিলিমিশে থাকছেন।
দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা সরকারি কর্মকর্তাদের আইন অনুসারে ব্যবস্থা নিতে বলেন। নির্দেশনা দেন ভীতি ও অনুরাগের ঊর্ধ্বে উঠে দায়িত্ব পালনের। কিন্তু বাস্তবে তারা তা করতে পারছেন না, এটা অনেকেরই জানা। আর এতে শাসনযন্ত্রের যত ক্ষতিই হোক, দলীয় লোকদের কর্তৃত্বকে খাটো করতে চাইছেন না শীর্ষ নেতৃত্বের অনেকেই। এ কারণে শাসনব্যবস্থার কার্যকারিতা কমে যাচ্ছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সরকার, দেশ ও জাতি। রাজনৈতিক দলের চাপের এখন আর বিশেষ প্রয়োজন হয় না। এটা করতে গিয়ে এখন দেখা যাচ্ছে রাজনীতিবিদরা ক্ষমতার দ্বিতীয় সারিতে চলে আসছেন। আর আমলাতন্ত্র ক্ষমতার প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে পড়ছে।
দেশ রূপান্তর : প্রশাসনিক কাঠামো সংস্কারের বিষয়টি প্রায়ই আলোচিত হলেও তা হচ্ছে না। এর অন্তরায় কী বলে মনে করেন?
আলী ইমাম মজুমদার : প্রশাসনিক কাঠামো সংস্কারের জন্য দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের একটি প্রত্যয় থাকতে হবে। তারা যদি মনে করেন প্রশাসনকে আমি দলীয়করণ করব না, প্রশাসন হবে একটি পেশাদার প্রতিষ্ঠান, তারা আইন ও কাঠামোর মধ্যে থেকেই দায়িত্ব পালন করবে। তাদের দলীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে চাপ দেওয়া হবে না এইসব বিষয়ে একটি প্রতিজ্ঞা থাকতে হবে। পুলিশ বাহিনী হবে একটি পেশাদার বাহিনী, যেখানে কোনো চাপ থাকবে না। এসব যদি শীর্ষ নেতৃত্বরা ঠিক করতে পারেন তবে তাদের পরের ধাপের নেতারা তা মানতে পারবেন। এভাবে তার পরের ধাপের মধ্যে আইন মানা ও জবাবদিহির বিষয়টি থাকবে। তারা আইন ভঙ্গ করতে সাহস করবেন না। দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে রাষ্ট্রের নিয়ম মানার বিষয়ে সচেতন থাকবেন। সোজা কথায়, রাজনৈতিক সদিচ্ছা খুব জরুরি। প্রশাসন কর্মকর্তাদের আশকারা দিয়ে দলীয় কাজ করালে তারাও বিনিময়ে আখের গোছাতে নেমে পড়বেন ভয়ভীতি ছাড়া। পরিণামে জনগণের কাছে দায়ী হবে শুধু সরকার।
দেশ রূপান্তর : অনেক ধন্যবাদ, আপনাকে।
আলী ইমাম মজুমদার : আপনাকেও ধন্যবাদ।