বিশ্ব সংগীত দিবসে শিল্পীদের প্রত্যাশা

বহু বছর ধরেই ২১ জুন ঐতিহ্যবাহী মিউজিক ফেস্টিভ্যালের আয়োজন করে ফ্রান্স। ১৯৮২ সালে এই দিনটিকে ফরাসি মন্ত্রী জ্যাক ল্যাং প্রথম বিশ্ব সংগীত দিবস পালনের প্রস্তাব করেন। ১৯৮৫ সালে প্রথম গোটা ইউরোপ এবং পরে সারা বিশ্ব ২১ জুন সংগীত দিবস হিসেবে পালন করে। বাংলাদেশেও দুই দশকের বেশি সময় ধরে সংগীত দিবস পালিত হয়ে আসছে। যদিও করোনাকালে এবার সেই উৎসবের রং অনেকটাই ফিকে। বিশ্ব সংগীত দিবস নিয়ে কথা বলেছেন দেশের চার গুণী শিল্পী। লিখেছেন মাসিদ রণ

দিনটি শিল্পীসত্তা উদযাপনের মাধ্যম

রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা

বিশ্ব সংগীত দিবসের ঠিক প্রাক্কালেই আমরা দেশের সংগীতশিল্পীদের নিয়ে গড়ে তোলা ‘সিঙ্গারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’-এর প্রথম কমিটি গঠন করেছি। আমাকে এই সংগঠনের প্রথম সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি শিল্পী ও সংগঠক হিসেবে আমার কাছে বড় একটি প্রাপ্তির। আজীবন রবীন্দ্রসংগীতের প্রচার ও প্রসারে কাজ করেছি। এখন সব ধরনের গানের শিল্পীদের ভালো-মন্দ নিয়ে ভাবনা ও তাদের স্বার্থ রক্ষার্থে কাজ করছি। ‘গান হতে হবে মুক্ত, সংশয়হীন’ স্লোগান সামনে রেখেই তো ‘ওয়ার্ল্ড মিউজিক ডে’ পালন করছে সারা বিশ্ব। আমরাও আমাদের সংগঠনের মাধ্যমে এ বিষয়টিই সুপ্রতিষ্ঠিত করতে চাই। তবে শিল্পী হিসেবে বছরের প্রতিটি দিনই আমার কাছে সংগীত দিবস। কিন্তু একটি দিন যখন সারা বিশ্বের সংগীতশিল্পীদের জন্য আলাদা করে রাখা হয়, তাদের অবদানের কথা, তাদের চর্চার কথা স্মরণ করা হয়, তখন শিল্পী হিসেবে অবশ্যই আনন্দ লাগে। এটা শিল্পীসত্তা উদযাপনের একটি মাধ্যম হিসেবেই দেখি।

বাংলা গানকে বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে হবে

নকিব খান

সংগীতের কোনো বাউন্ডারি নেই, এর ভাষা ইউনিভার্সাল। তাই আমি মনে করি বিশ্বের সব ভাষার গান সব জায়গায় প্রচার পাওয়া উচিত। সেদিক থেকে বাংলা বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ভাষা। কিন্তু ইংরেজি, আফ্রিকান, লাতিন আমেরিকান কিংবা হিন্দি গান যত মানুষের কাছে পৌঁছেছে, বাংলা কিন্তু তা পারেনি। বিশ্ব সংগীত দিবসে আমার একটাই চাওয়া বাংলা গান বিশ্ব মানের হোক এবং গানগুলো যেন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ আমরা যে ব্যান্ড কালচার তৈরি করেছিলাম সেটি কিন্তু ওয়েস্টার্ন মিউজিক থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই। যদিও পরে আমরা পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের মিশেলে আমাদের ব্যান্ড মিউজিকের কম্পোজিশনগুলো করি। কিন্তু এই টিমওয়ার্ক কিংবা বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করি ব্যান্ডের গানে, তা কিন্তু ওয়েস্টার্ন মিউজিকেরই। ফলে সারা বিশে^র মানুষের কাছে এই গানগুলো সহজে গ্রহণযোগ্যতা পাবে বলে মনে করি। আমরা যখন শুরু করি, তখন বিটলস, ইগলস, এল্টন জন, স্টিভ ওয়ান্ডার, স্ট্রিং, ডি পার্পল খুব অনুপ্রাণিত করেছে। একই সঙ্গে ভারতের সলিল চৌধুরী, আরডি বর্মণ, আমাদের দেশের আলাউদ্দীন আলী, আজাদ রহমান, আনোয়ার পারভেজের গানে অনুপ্রেরণা পেয়েছি।

গান তার আপন মহিমা ফিরে পাক

ফাহমিদা নবী

আমাদের দেশে চলচ্চিত্র দিবস, নাট্য দিবস কিংবা নৃত্য দিবসের আয়োজনগুলো চোখে পড়ার মতো। সরকারি কিংবা সংগঠনগুলোর পৃষ্ঠপোষকতায় নানা ধরনের আয়োজন হয়। সেদিক থেকে বিশ্ব সংগীত দিবস নিয়ে সেভাবে কাউকে কোনো উদ্যোগ নিতে দেখি না। করোনার আগে বিচ্ছিন্নভাবে দু-একটা অনুষ্ঠান হতো। এখন তা-ও হয় না। আসলে এখন একটা বিষয় দেখে খুব খারাপ লাগে। টিভিতে পর্যন্ত সংগীতের অনুষ্ঠানের প্রতি খুবই অনীহা দেখতে পাই। প্রতিটি চ্যানেলে গন্ডায় গন্ডায় রান্নার অনুষ্ঠান হচ্ছে। আমি একজন সংগীতশিল্পী। কিন্তু আমাকে সংগীতের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ না করে টিভি চ্যানেলগুলো রান্নার অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ করে। এটা সংগীতশিল্পীর জন্য অবমাননাকর বলে মনে করি। কিন্তু এর জন্য দায়ীও আমরাই। অনেক শিল্পী কিন্তু শিল্পীসত্তার গুরুত্ব না বুঝে ঠিকই ওই সব অনুষ্ঠানে যান। এখন সবাই গানকে খুব সস্তা একটি বিষয় বানিয়ে ফেলেছে। যে কেউ বুঝি চাইলেই গান গাইতে পারে। একজন নায়ক-নায়িকাকে টক শোতে ডেকে বলা হয় একটা গান গাইতে। তারা যেহেতু বুঝতে পারছেন গান শুনতে পছন্দ করে মানুষ, তাহলে আলাদা করে কেন গানের অনুষ্ঠান করছেন না! এগুলো বন্ধ না করলে গানের সেক্টরটি আরও হুমকির মুখে পড়বে। বাবা দিবস ও বিশ্ব সংগীত দিবস উপলক্ষে বাবার ‘তুমি কখন এসে দাঁড়িয়েছিলে’ গানটি আমার ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করেছি। আমার প্রত্যাশা, গান তার আপন মহিমা ফিরে পাক।

সংগীত দিবস উপলক্ষে লাইভে আসব

বাপ্পা মজুমদার

প্রথমেই বিশ্ব সংগীত দিবসে বিশ্বের সব শিল্পী ও সংগীতপ্রিয় মানুষের প্রতি শুভেচ্ছা। আমরা কাছে দিনটি বিশেষ ভালো লাগার। একটি দিনে শিল্পীরা আলাদাভাবে মূল্যায়িত হন। নিজেদের সৃষ্টিকে উদযাপন করেন। করোনার আগে প্রতিবার নানা ধরনের আয়োজনে ব্যস্ত থাকতে হতো এই দিনটিতে। কিন্তু করোনাকালে তার কিছুই হচ্ছে না। তারপরও শিল্পী হিসেবে দায়িত্ব থেকে যায়। এ জন্য আমরা আজ রাত ৯টায় আমাদের ব্যান্ড দলছুটের সব সদস্য মিলে লাইভে আসব। ভক্তদের সঙ্গে বিশ্ব সংগীত দিবসের আনন্দ ভাগাভাগি করব। আমার আসলে সব ধরনের গানই ভালো লাগে, যদি সেটি ভালো গান হয়। আমাকে গানের পছন্দের ক্ষেত্রে কিছুটা ওল্ড স্কুল বলতে পারেন। পিংক ফ্লয়েড আমার সব সময়ের পছন্দ। পুরনো দিনের অনেকের গানই পছন্দ। জন মিয়ারের গানও ভালো লাগে। উপমহাদেশে অবশ্য প্রিয় শিল্পীর তালিকা অনেক লম্বা। সলিল চৌধুরী, ভুপেন হাজারিকা, আরডি বর্মন, মান্নাদে, কিশোর কুমারের গান সবার মতো আমারও পছন্দ। হিন্দুস্তানি ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিকে ভীমসেন যোশী, পন্ডিত যশরাজ, অজয় চক্রবর্তী আমাকে মুগ্ধ করেন।