প্রতিদিনই করোনা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। বিশেষ করে খুলনা বিভাগে গত কয়েক দিন ধরেই ভাঙছে শনাক্ত-মৃত্যুর রেকর্ড। বিভাগটির বেশিরভাগ জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে লকডাউন বা কঠোর বিধিনিষেধ দিয়েও লাভ হচ্ছে না। গতকাল রবিবারও বিভাগটিতে ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২৮ জনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে অধিপ্তরের কেন্দ্রীয় হিসাবে এই সংখ্যা ৩২। বিভাগটিতে আগের ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত গত দুই দিনের তুলনায় বেড়েছে। বেড়েছে শনাক্তের হারও। এই অবস্থায় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে না মানলে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাবে।
এদিকে রাজশাহীতে গত কয়েক দিন ধরেই মৃত্যু ১০ থেকে ১২ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ আছে। আগের ২৪ ঘণ্টায় এই বিভাগে মৃত্যু হয়েছে ১০ করোনা রোগীর। তবে রাজশাহীতে এক দিনের ব্যবধানেই তিন গুণের বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে। বিভাগটিতে শনিবার ৩৪৫ জন নতুন রোগীর তথ্য পাওয়া গেলেও রবিবার তা বেড়ে ১০২৩ হয়েছে।
রংপুর বিভাগেও বেড়েছে রোগী শনাক্তের সংখ্যা। আগের ২৪ ঘণ্টায় বিভাগটিতে ২০৭ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এ সময় করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে মাত্র একজন। অন্যদিকে ঢাকায় দৈনিক শনাক্তের সংখ্যা ১৪১১ জন থেকে কমে ১০৪৫ জন এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ৪০১ জন থেকে কমে ২৯৩ জন হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ঢাকা বিভাগে পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্তের হার আগের দিনের ১৫ দশমিক ৪১ শতাংশ থেকে কমে ৯ দশমিক ৬ শতাংশ এবং খুলনা বিভাগে ৩৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ থেকে কমে ৩১ শতাংশ হয়েছে। রাজশাহী বিভাগে ১৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ২২ দশমিক ৩১ শতাংশ। চট্টগ্রামে এই হার আগের মতোই ১৫ শতাংশের ঘরে রয়েছে।
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ফেরদৌসী আক্তার বলেন, সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আগের চেয়ে খারাপের দিকে যাচ্ছে। অবস্থা খুব বেশি খারাপ হলে তখন হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে। ফলে মৃত্যু বাড়ছে। স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে না মানলে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাবে।
খুলনা বিভাগে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে কুষ্টিয়ায়, ৭ জনের। এছাড়া খুলনায় দুজন, বাগেরহাটে দুজন, সাতক্ষীরায় দুজন, যশোরে চারজন, নড়াইলে একজন, মাগুরায় একজন, চুয়াডাঙ্গায় পাঁচজন এবং ঝিনাইদহে চারজন মৃত্যুবরণ করেছেন। এর আগে শনিবার (১৯ জুন) বিভাগে সর্বোচ্চ ২২ জনের মৃত্যু হয়। আর বৃহস্পতিবার (১৭ জুন) বিভাগে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ১৮ জনের মৃত্যু হয়। তবে শুক্রবার বিভাগে ৮ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জেলাভিত্তিক করোনাসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, খুলনায় ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ২২৩ জন, বাগেরহাটে ৬৮ জন, সাতক্ষীরায় ১৪ জন, যশোরে নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ৭৩ জন, ঝিনাইদহে শনাক্ত হয়েছে ৯০ জন, নড়াইলে ৪৪ জন, কুষ্টিয়ায় শনাক্ত হয়েছে ১৬৪ জন, চুয়াডাঙ্গায় ৬৮ জন এবং মেহেরপুরে নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ১৯ জন। এছাড়া মাগুরায় ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে কোনো রোগী শনাক্ত হয়নি।
রামেক আরও ১০ মৃত্যু : করোনার সংক্রমণ থামাতে রাজশাহী শহরে ১০ দিনের লকডাউন শেষ হলো। কিন্তু রামেক হাসপাতালের করোনা ইউনিটে মৃত্যুর সংখ্যা কমছেই না। কমছে না রাজশাহীতে করোনা সংক্রমণও। গত ২৪ ঘণ্টায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে আরও ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি মাসে ২০ দিনে এ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে মারা গেছেন ২০৩ জন। এর মধ্যে শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছেন ১০৬ জন। বাকিরা মারা যান উপসর্গ নিয়ে।
শনিবার সকাল থেকে রবিবার সকালের মধ্যে ১০ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করে রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী জানান, মৃত ১০ জনের মধ্যে একজনের করোনা পজিটিভ ছিল। বাকি ৯ জন মারা যান উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায়। এদের মধ্যে ৭ জন পুরুষ ৩ জন নারী।
মৃতদের মধ্যে রয়েছে রাজশাহীর ৭ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ২ জন এবং নওগাঁর একজন। হাসপাতাল পরিচালক জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় রামেক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৪ জন। আর এই সময়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৩৮ জন। রবিবার সকালে করোনা ইউনিটে চিকিৎসাধীন আছেন ৩৭৭ জন।
রংপুর বিভাগে ২০৭ জনের করোনা শনাক্ত : রংপুর বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় ২০৭ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ৩৫.২০ শতাংশ। এ নিয়ে বিভাগে মোট ২১ হাজার ৮৩৮ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এ সময় করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন একজন। রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক আবু মো. জাকিরুল ইসলামের পাঠানো প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।
রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে ৫৮৮ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ২০৭ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছে দিনাজপুর জেলায় ৬৭ জন, ঠাকুরগাঁওয়ে ৫৬ জন, নীলফামারীতে ৫ জন, পঞ্চগড়ে ৯ জন, কুড়িগ্রামে ২৬ জন, লালমনিরহাটে ১৫ জন, গাইবান্ধায় ১০ জন ও রংপুরে ১৯ জন। বিভাগে করোনায় আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত মারা যাওয়া ৪৫৩ জনের মধ্যে দিনাজপুর জেলার ১৬৫ জন, রংপুরের ১০৫ জন, ঠাকুরগাঁওয়ের ৫৭ জন, পঞ্চগড়ের ২০ জন, নীলফামারীর ৩৮ জন, লালমনিরহাটের ১৯ জন, কুড়িগ্রামের ২৬ জন ও গাইবান্ধার ২৩ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়েছেন ৫৪ জন।
রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক আবু মো. জাকিরুল ইসলাম বলেন, করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। করোনায় মারা যাওয়া ব্যক্তির বাড়ি রংপুর জেলায়।
এদিকে গতকাল নড়াইল, ফরিদপুর, টাঙ্গাইল ও দিনাজপুরে বেশকিছু এলাকা নতুন করে বিধিনিষেধের আওতায় আনা হয়েছে।