উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ লোপাট ও চাঁদাবাজির পাল্টাপাল্টি অভিযোগে প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের মুখোমুখি অবস্থানের কারণে অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পাবিপ্রবি)। প্রধান প্রকৌশলীর অব্যাহতিসহ বিভিন্ন দাবিতে দেওয়া আল্টিমেটামের সময়সীমা পার হওয়ায় কর্মবিরতি পালন করছে পাবিপ্রবি অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন। গত রবিবার সকালে তারা রেজিস্ট্রার অফিস ঘেরাও করে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার বিজন কুমার ব্রহ্মকে বের করে দিয়ে সেখানে তালা ঝুলিয়ে দেয়। গতকাল সোমবারও অফিস করতে পারেননি তিনি।
এদিকে প্রধান প্রকৌশলী আমিনুল ইসলামকে লাঞ্ছিত করাসহ প্রকৌশল দপ্তর থেকে দেওয়া সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পাশাপাশি প্রধান প্রকৌশলীর অব্যাহতিসহ আট দফা দাবি তুলে গতকাল আবারও উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন। দাবি না মানা পর্যন্ত তাদের কর্মবিরতি অব্যাহত থাকবে বলে স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষাসংক্রান্ত দপ্তর এ কর্মবিরতির আওতামুক্ত থাকবে বলে জানিয়েছেন আন্দোলনরত কর্মকর্তারা।
তদন্ত কমিটি গঠনের সত্যতা নিশ্চিত করে পাবিপ্রবির ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার বিজন কুমার ব্রহ্ম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উভয়পক্ষের পত্রই আমরা পেয়েছি। প্রকৌশল দপ্তরের লিখিত পত্রে গত ১৫ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী আমিনুল ইসলামকে তার কক্ষে গিয়ে লাঞ্ছিত করা, গাড়ির চাবি কেড়ে নিয়ে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেওয়া ও পিকনিকের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নকাজে নিয়োজিত ঠিকাদারদের কাছ থেকে চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করা হয়েছে অফিসার সমিতির নেতাদের বিরুদ্ধে। অভিযোগগুলো স্পর্শকাতর হওয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষের নির্দেশে বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের ডিন অধ্যাপক কামরুজ্জামানকে আহ্বায়ক এবং আমাকে সদস্য সচিব করে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।’
তদন্ত কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খায়রুল আলম এবং ইতিহাস ও বাংলাদেশ স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক হাবিবুল্লাহ। তদন্ত কমিটিকে দ্রুততম সময়ে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
কর্মকর্তাদের অভিযোগ প্রসঙ্গে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার বলেন, ‘স্মারকলিপির বিষয়েও উপাচার্যকে জানানো হয়েছে। কর্মবিরতির কারণে রবি ও সোমবার দাপ্তরিক কোনো কাজ হয়নি। রবিবার সকালে কর্মকর্তারা আমাকে অফিস থেকে বের হয়ে যেতে বলায় আমি চলে এসেছি। পরে তারা সেখানে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পাবিপ্রবি অফিসার্স সমিতির সভাপতি হারুনর রশিদ ডন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় তহবিলের অর্থ অপচয় রোধ ও চলমান ৫০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পে নানা অনিয়ম এবং সেসব অনিয়মের বৈধতা দিতে ভুয়া বিল ভাউচারে কর্মকর্তাদের সাক্ষরে বাধ্য করার প্রতিবাদে আমরা প্রধান প্রকৌশলী আমিনুল ইসলামের অব্যাহতি চেয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাদের দাবিতে কর্ণপাত করেনি। উপাচার্য রোস্তম আলী স্যার এলে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হলেও ঘটনার পর থেকে তিনি এ পর্যন্ত অফিসে আসেননি। অচলাবস্থা নিরসনে কোনো উদ্যোগও নেননি। তাই বাধ্য হয়ে আমরা রবিবার থেকে কর্মবিরতি শুরু করেছি। এখানে আলোচনার কিছু নেই। আমরা আট দফা দাবি দিয়েছি। দাবি মানলেই আমরা কর্মবিরতি প্রত্যাহার করব।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের অভিযোগের বিষয়ে কোনো সুরাহা না করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রকৌশল দপ্তরের দেওয়া মিথ্যা অভিযোগে তদন্ত কমিটি করেছে। তাদের এমন আচরণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও সন্দেহজনক। দুর্নীতির বৈধতা দিতেই তারা পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চলমান উন্নয়নকাজের লুটপাট সিন্ডিকেট উপাচার্য এম রোস্তম আলী স্যারের ইশারায় কাজ করে। এ কারণে কর্মকর্তাদের অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো প্রকৌশলীদের অভিযোগ আমলে নিয়ে আজ্ঞাবহ বিতর্কিত ও জিয়া পরিষদ নেতা দুর্নীতিবাজ এক শিক্ষককে প্রধান করে তদন্ত কমিটি করেছেন। থলের বেড়াল বের হয়ে যাওয়ার ভয়েই তিনি পক্ষপাতমূলক আচরণ করছেন।’
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে পাবিপ্রবি উপাচার্য এম রোস্তম আলীর মোবাইল ফোনে কল করা হলে তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ জানিয়ে ঘুমিয়ে আছেন বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
পাবিপ্রবির উপাচার্য এম রোস্তম আলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে এর আগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। আর সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে কয়েক কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ তুলে তার অব্যাহতি দাবি করে পাবিপ্রবির প্রশাসনের কর্মকর্তারা। বিপরীতে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও প্রধান প্রকৌশলীকে লাঞ্ছিতের অভিযোগ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তর। তাদের পাল্টাপাল্টি অবস্থানে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।