তদন্ত কর্মকর্তাদের গাফিলতিতে ঝুলে গেছে মামলার কার্যক্রম

জয়পুরহাটের পাঁচবিবি থানার সুরাইল গ্রামের পরিত্যক্ত একটি স্কুলের কক্ষ থেকে দুই বছর আগে শিশু মো. আবদুর রহমানের (১১) রক্তাক্ত ক্ষত-বিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় মামলা হওয়ার পর প্রথমে তদন্ত শুরু করে পাঁচবিবি থানা পুলিশ। কিন্তু তারা কোনো কূলকিনারা করতে না পারায় পরে সেটির তদন্তভার পায় জয়পুরহাট জেলা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এরপর সেখানেও তিনবার তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়। তারপরও হত্যাকান্ডের কোনো রহস্য উদঘাটন হয়নি। খোদ মামলাটির তদন্তসংশ্লিষ্টরাই বলছেন, আগের তদন্ত কর্মকর্তাদের গাফিলতিতে মামলাটি ঝুলে গেছে। যার কারণে প্রকৃত আসামি এখনো গ্রেপ্তার হয়নি।

এদিকে হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটন না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহতের স্বজনরা। তাদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আন্তরিকভাবে কাজ না করায় প্রকৃত অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। যেখান থেকে আবদুর রহমানের লাশ উদ্ধার করা হয়, সেই পরিত্যক্ত স্কুল ঘরে এখনো বসে মাদকের আসর। প্রকাশ্যে চলে নানা ধরনের অসামাজিক কাজ। নির্জন ওই স্থানে ভূত আছে মনে করে স্থানীয়রা কেউ যায় না।

মামলাটির এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালের ১৫ মার্চ দুপুরে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে যাওয়ার কথা বলে সাইকেল নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয় পাঁচবিবির ধুরইল গ্রামের রেজাউল ইসলামের ছেলে আবদুর রহমান। সন্ধ্যার পরও বাড়ি না ফেরায় তাকে খুঁজতে বের হন পরিবারের লোকজন। খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে সেখানকার একটি পরিত্যক্ত স্কুলের একটি কক্ষের ভেতর থেকে আবদুর রহমানের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া লাশের পেট, পিঠ ও ঊরুতে গুরুতর জখম ছিল। ঘটনার পরদিন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন তার বাবা রেজাউল।

এ হত্যাকা-ে মাদকাসক্ত একাধিক ব্যক্তি জড়িত থাকতে পারে বলে ধারণা করেছেন মামলাটির বর্তমান এক তদন্ত কর্মকর্তা। এ বিষয়ে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আবদুর রহমানের জামার পকেটে সুতা ও ভাঙা ব্লেড ছিল। আমাদের ধারণা সে ওই পরিত্যক্ত স্কুলে ঘুঘুপাখির বাচ্চা ধরতে গিয়েছিল। সে খুবই প্রতিবাদী স্বভাবের ছেলে ছিল। ঘটনাস্থলে গিয়ে হয়তো একাধিক লোককে নেশা করতে দেখেছে। এর প্রতিবাদ করায় হয়তো তাকে হত্যা করা হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঘটনাস্থলে এখনো গাদা গাদা ব্লেড পড়ে থাকতে দেখা গেছে। এতে স্পষ্টই বোঝা যায়, সেখানে মাদকাসক্তরা বসে মাদক নেয়। আবদুর রহমানের শরীরে যে ক্ষত চিহ্ন ছিল, তা দেখে সহজেই বোঝা গেছে মাদক গ্রহণে ব্যবহৃত সরঞ্জাম দিয়েই তাকে আঘাত করা হয়েছিল। হত্যাকান্ডের পর হত্যাকারীরা ঘটনাস্থল ত্যাগের দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পরও নির্বাকভাবে বেঁচে ছিল আবদুর রহমান।’

নিহতের ভাই মুমিনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ভাইকে হত্যার দুই বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও প্রকৃত আসামি গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এখন পর্যন্ত চারবার তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়েছে। আমরা পুলিশের পেছনে ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। এর আগে এক কর্মকর্তা আনোয়ার নামে একজনকে গ্রেপ্তার করেন। তবে সে যে হত্যায় জড়িত, তা প্রমাণ করতে পারেনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার ভাইয়ের লাশ যে পরিত্যক্ত স্কুল থেকে উদ্ধার করা হয়, সেখানে সে পাখি ধরতে গিয়েছিল বলে আমাদের ধারণা। তবে স্থানটি ভালো না। সেখানে মাদকসেবীরা অবাধে অবস্থান করে। নারীঘটিত বিষয়ও রয়েছে সেখানে। এখনো স্থানটিতে এসব অবাধে হচ্ছে। আমার ভাই যেকোনো অন্যায় দেখলেই প্রতিবাদ করে। এজন্যই হয়তো তাকে নির্মমভাবে খুন করেছে। আমাদের একটাই চাওয়া প্রকৃত অপরাধী গ্রেপ্তার হোক, শাস্তি পাক।’

এদিকে এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় আনোয়ার হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। তিন মাস জেলও খাটেন ওই ব্যক্তি। তবে ঘটনার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেননি তিনি। মামলার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির এসআই জাহাঙ্গীর আলমের তদন্তে ওই ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে তখন দাবি করা হয়। তবে বর্তমান তদন্তসংশ্লিষ্টরা এখনো তার কোনো সম্পৃক্ততা পায়নি। বরং এ হত্যাকান্ডের পেছনে মাদকসেবীরা জড়িত রয়েছে বলে মনে করছেন তারা। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, কীভাবে আবদুর রহমান ওই পরিত্যক্ত স্কুলের ভেতর গেল তা আগের তদন্ত কর্মকর্তারা সঠিকভাবে অনুসন্ধান করেননি। এছাড়া ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, ঘটনাস্থলের প্রকৃত চিত্র ও শরীরের আঘাতের চিহ্ন সঠিকভাবে লক্ষ করেননি। ফলে হত্যার রহস্য উদঘাটন হয়নি।

মামলাটি দীর্ঘ সময় ধরে অবহেলিত থাকায় প্রকৃত আসামি গ্রেপ্তারে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নেওয়ার আর সুযোগ নেই বলে দাবি বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির এসআই প্রদীপ কুমার দাসের। তিনি বলেন, ‘আমি গত তিন মাস ধরে তদন্ত করছি। ঘটনাটি অনেক আগের। আমার পূর্ববর্তী কর্মকর্তা যারাই ছিলেন, তারা তাদের মেধা-মননশীলতা দিয়ে একরকম করেছেন, আমি তাদের চিন্তা-চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তারা যেটা করেছেন, তদন্তের আসল জায়গাতে হাতই দেওয়া হয়নি। এই মামলাটি তখন ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে ডিটেক্ট হয়ে যেত। এখন মূল রহস্য উদঘাটনে সময় লাগবে। মূলত সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা এসআই জাহাঙ্গীর আলম মামলাটি পঙ্গু করে গেছেন।’

তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও বলেন, ‘এ ঘটনায় আনোয়ার হোসেন নামে একজনকে গ্রেপ্তারের পর আমার আগের তদন্ত কর্মকর্তা আসামি ফরোয়ার্ডিং পেপারসে লিখেছেন, “আনোয়ারকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে জবাই করে হত্যার কথা স্বীকার করে। কিন্তু আমার কাছে স্বীকারোক্তি দিলেও কোর্টে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বীকারোক্তি দেবে না বলে জানায় সে।” এটা হাস্যকর। একজন তদন্তকারী কর্মকর্তা কত নিম্নমানের হলে এমন কনসেপ্ট তদন্ত প্রতিবেদনে লেখেন।’

মামলাটির তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির এসআই জাহাঙ্গীর আলম (বর্তমানে সিরাজগঞ্জ জেলা সিআইডিতে কর্মরত) দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি গোপন তথ্যের ভিত্তিতে একজনকে গ্রেপ্তার করেছিলাম। সে আমাকে যে তথ্য দিয়েছে তাই সিডিতে নোট দিয়েছি। মামলাটি তদন্তাধীন ছিল। আমি ডিটেক্ট করতে পারতাম। এমতাবস্থায় আমার বদলি হয়ে যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘একটি ক্লুলেস মামলা যেভাবেই হোক ডিটেক্ট করা দরকার। আমার পর যে কর্মকর্তা তদন্ত করছেন, উনি যদি অন্যভাবে তদন্ত করে আসামির ১৬৪ ধরায় জবানবন্দি আদালতে রেকর্ড করাতে পারেন তাহলে মামলাটি ডিটেক্ট হবে।’

আপনার কারণে মামলাটি ঝুলে গেছে, এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমি মনে করি না আমার কারণে মামলাটি ঝুলে গেছে। আমি যেটুকু করেছি তা সঠিক করেছি।’