হাসপাতালে প্রতি হাজার জনে শয্যা একটিরও কম

দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বেহাল চিত্র উঠে এসেছে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপে। এতে বলা হয়েছে, দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল মিলে প্রতি ১ হাজার মানুষের জন্য একটি করে শয্যাও বরাদ্দ নেই। গত কয়েক বছরে বেসরকারিভাবে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বেড়েছে। ফলে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে শয্যার সংখ্যা বেড়ে হয়েছে প্রতি হাজারে শূন্য দশমিক ৬৪টি। আর সরকারি হাসপাতালগুলোর অবস্থা আরও খারাপ, প্রতি হাজারে গড়ে শয্যা সংখ্যা শূন্য দশমিক ৩২টি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, প্রতি ১ হাজার মানুষের জন্য হাসপাতালে গড়ে সাড়ে ৩টি শয্যা থাকতে হবে।

গতকাল সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিবিএস অডিটরিয়ামে বিবিএসের ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিং উইংয়ের অধীনে বাস্তবায়নাধীন ‘সার্ভিস অ্যান্ড স্টাডিজ রিলেটিং টু জিডিপি রিবেইজিং ২০১৫-১৬’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় প্রকাশিত বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান জরিপ, ২০১৯-এর ফল তুলে ধরা হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে স্বাস্থ্য খাতের বেহাল চিত্র ফুটে ওঠে। রোগীর তুলনায় স্বাস্থ্যসেবা কত অপ্রতুল তা স্পষ্ট হয়েছে। সরকারের উচিত স্বাস্থ্য খাত নিয়ে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া। মহামারী করোনা থেকে শিক্ষা নিয়ে হলেও স্বাস্থ্যনীতিতে একটি লক্ষ্য স্থির করা উচিত। এছাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে আরও কার্যকর করা উচিত। এতে শহরের হাসপাতালগুলোতে চাপ কমবে। 

জরিপের ফলে আরও বলা হয়েছে, জরিপের তথ্যানুযায়ী, প্রতি একজন চিকিৎসকের (ডেন্টাল সার্জন বাদ দিয়ে) বিপরীতে মাত্র ০ দশমিক ৮৫ জন সেবিকা রয়েছেন। ডেন্টাল সার্জনদের অন্তর্ভুক্ত করলে প্রতি একজন চিকিৎসকের বিপরীতে সেবিকার সংখ্যা শূন্য দশমিক ৮৩ জন। শয্যা ও সেবিকার অনুপাত, প্রতি ৩ দশমিক ৪৭টি বা প্রায় ৪টি শয্যার জন্য একজন সেবিকা দায়িত্ব পালন করছেন। দেশের হাসপাতালগুলোতে ১ লাখ ৫ হাজার ১৮৩টি শয্যা রয়েছে। ক্লিনিক, ডেন্টাল ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, হাসপাতাল মিলে জনস্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৬ হাজার ৯৭৯টি। এসব হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ১৫ দশমিক ০৯ শতাংশ হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টের ব্যবস্থা আছে। আর উন্নত লাইফ সাপোর্টের ব্যবস্থা আছে মাত্র ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ হাসপাতালে।

স্বাস্থ্যসেবার এ অপ্রতুলতার বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা এবং হেলথ প্রমোশন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. মোজাহারুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রোগীর তুলনায় হাসপাতালের বেডের সংখ্যা কম এটা অনেক আগে থেকেই দেখা যায়। এজন্য হাসপাতালগুলোর মেঝেতে রোগীরা শুয়ে থাকে। দুঃখের বিষয়ে হলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে একটি ন্যূনতম সংখ্যার বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হলেও বাংলাদেশে নিজস্ব কোনো পরিকল্পনা নেই। এজন্য স্বাস্থ্যনীতিতে আগামী ৫-১০-২০ বছরে কত শয্যা বাড়ানো হবে, তার স্পষ্ট পরিকল্পনা থাকতে হবে।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘করোনার এই মহামারীতে সরকারের উচিত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে কার্যকর করা। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে প্রকৃতভাবে কার্যকর করতে পারলে শহরের হাসপাতালগুলোতে চাপ কমে যাবে। 

বিবিএসের জরিপ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে নিবন্ধিত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ৯৭৯টি। এর মধ্যে রোগ নির্ণয় কেন্দ্র ১০ হাজার ২৯১টি বা ৬০ দশমিক ৬১ শতাংশ। হাসপাতাল হলো ৪ হাজার ৪৫২টি বা মোট নিবন্ধনের ২৬ দশমিক ২২ শতাংশ এবং মেডিকেল ক্লিনিক হলো ১ হাজার ৩৯৭টি বা ৮ দশমিক ২৩ শতাংশ। অন্যদিকে, ডেন্টাল ক্লিনিকের সংখ্যা ৮৩৯টি বা ৪ দশমিক ৯৯ শতাংশ।

এতে আরও বলা হয়েছে, বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ২০১৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৫৮০ জন কর্মী নিয়োজিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ৩ লাখ ১৫ হাজার ৯৪১ জন বা ৮৫ দশমিক ৭২ শতাংশ পূর্ণকালীন এবং ৫২ হাজার ৬৩৯ জন বা ১৪ দশমিক ২৮ শতাংশ খণ্ডকালীন। নিয়োজিত মোট জনবলের মধ্যে হাসপাতালে ৫৬ দশমিক ৩২ শতাংশ, রোগ নির্ণয় কেন্দ্রে ৩৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং ক্লিনিকে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। আর ডেন্টাল ক্লিনিকে নিয়োজিত জনবল ১ দশমিক ১৯ শতাংশ।

গতকাল জরিপের প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে বিবিএসের মহাপরিচালক মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সভাপতিত্ব করেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব মুহাম্মদ ইয়ামিন চৌধুরী। অতিথি ছিলেন বিবিএসের অতিরিক্ত সচিব মুহাম্মদ মেসবাহুল আলম ও শশাঙ্ক শেখর ভৌমিক। জরিপ প্রতিবেদন তুলে ধরেন প্রকল্প পরিচালক আবদুল খালেক। 

মহাপরিচালক মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, ‘এই জরিপে বেশ কিছু নতুন তথ্য উঠে এসেছে। আরও কিছু যুক্ত করতে হবে। জরিপে নানা কারণে প্রকৃত চিত্র উঠে আসে না। কারণ হাসপাতালগুলোর কর্র্তৃপক্ষ যে হিসাব দেয়, সেগুলোই আমাদের বিশ্বাস করতে হয়ে। এক্ষেত্রে কর্মকর্তা-কর্মচারীর পেছনে বেসরকারি হাসপাতালগুলো আসলে কত ব্যয় করে, তার সঠিক তথ্য নাও উঠে আসতে পারে।’

সচিব মুহাম্মদ ইয়ামিন চৌধুরী বলেন, ‘এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি সামগ্রিক চিত্র পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্য খাত দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে কী পরিমাণ ভূমিকা রাখছে তার একটা হিসাব পাওয়া গেছে। এতে ভবিষ্যতে পরিকল্পনা গ্রহণে সুবিধা হবে। তবে এটিকে আরও বৃহৎ পরিসরে করার সুযোগ রয়েছে।’