ব্যাপক আলোচনার মধ্যে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নিবন্ধনের কাজ নির্বাচন কমিশন থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগে ন্যস্ত করল সরকার। গত রবিবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করেছে। এর ফলে এখন থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের সব কাজ নির্বাচন কমিশনের পরিবর্তে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ করবে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, এ আদেশের ফলে ‘জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন আইন, ২০১০’ সংশোধন করতে হবে। কারণ এ আইনে জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধনের কাজটি এতদিন করেছে নির্বাচন কমিশন। আইন সংশোধন করে নির্বাচন কমিশনের বদলে সরকার শব্দ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সুরক্ষা সেবা বিভাগ জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিদ্যমান অবকাঠামো ও জনবল নির্বাচন কমিশন হতে সুরক্ষা সেবা বিভাগে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করবে। ‘রুলস অব বিজনেস, ১৯৯৬’ অনুযায়ী সুরক্ষা সেবা বিভাগের কাজের মধ্যে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন সংক্রান্ত কাজ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
এনআইডি সংক্রান্ত কাজ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগে না নেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশন আপত্তি জানিয়েছিল। কিন্তু সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানের আপত্তি সরকার আমলে নেয়নি।
২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে দেশে প্রথমবারের মতো ছবিযুক্ত জাতীয় পরিচয়পত্রের কাজ শুরু করে। এরপর থেকে পরিচয়পত্রের ভুল এবং সম্প্রতি নানা কৌশলে রোহিঙ্গারা এনআইডি পেয়ে যাওয়ায় নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সমালোচনা শুরু হয়। এরকম পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের এ গুরুত্বপূর্ণ কাজটি নির্বাহী বিভাগে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও দপ্তর বারবার একই ধরনের তথ্য সংগ্রহের কাজ করছে। এসব তথ্য সংগ্রহকারীদের মধ্যে কোনো সমন্বয় না থাকায় সরকারের অর্থ ও সময়ের অপচয় হচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নীতিনির্ধারকরা একটি জায়গা থেকে সমন্বিতভাবে এ তথ্য সংগ্রহ ও বিতরণের কাজ করার তাগিদ দিলেও কোনো লাভ হচ্ছে না। নির্বাচন কমিশন ভোটারের তথ্য সংগ্রহ করে ও ভোটার তালিকা প্রণয়ন করে। সাংবিধানিক এ সংস্থাটি ১৮ বছরের ওপরের নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি দিচ্ছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যালয়ের রেজিস্ট্রার জেনারেল সব নাগরিকের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন করে ও সনদ দেয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সিভিল রেজিস্ট্রেশনের কাজ সমন্বয় করে। পুলিশ নগর বাসিন্দাদের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে। পরিসংখ্যান বিভাগ অর্থনৈতিক, সামাজিকসহ নানা বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে নানা ধরনের পূর্বাভাস দেয়।
তবে নির্বাচন কমিশন থেকে শুধু এনআইডি করার দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে দিলেও কোনো পরিবর্তন আসবে কি না তা এখনই বলা সম্ভব নয়। স্থানীয় সরকার, পুলিশ, পরিসংখ্যান বিভাগসহ যেসব সংস্থা বা দপ্তর এসব তথ্য নিয়ে কাজ করে তাদের সবাইকে একই ছাতার নিচে আনতে হবে। তাহলেই এটি অর্থবহ হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এমনিতেই ওভারলোডেড। সুরক্ষা সেবা বিভাগের অধীনে পাসপোর্ট অধিদপ্তর রয়েছে কিন্তু এটি দুর্নীতিগ্রস্ত সংস্থা এবং সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছে। কাজেই সুরক্ষা সেবা বিভাগে এ দায়িত্ব দেওয়ায় কাজ কতটুকু গতিশীল হবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রশাসনসংশ্লিষ্টরা।
চারদলীয় জোট সরকারের সময় ভোটার তালিকা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক হয়। ভুয়া ভোটার অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো মাঠে নেমেছিল। পরিবর্তিত ব্যবস্থায় দায়িত্ব নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় ভোটার তালিকা প্রণয়নে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় নির্বাচন কমিশনের একটি প্রকল্পের মাধ্যমে শুরু হওয়া উদ্যোগটি বর্তমানে একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থায় দাঁড়িয়েছে। গত এক যুগ ধরে নির্বাচন কমিশন এ কাজ করে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে জনবল, অফিস, সার্ভার স্টেশন এবং নানা ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করেছে। প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারের যেকোনো সংস্থা এ ডেটাবেজ থেকে তথ্য আহরণ করে ব্যবহার করতে পারছে। ২০১৪ সাল পর্যন্ত ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত নাগরিকদের লেমিনেটেড কার্ড দেওয়া হলেও বর্তমানে স্মার্টকার্ড দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে ২২ ধরনের সেবা দেওয়া হয়। ভবিষ্যতে এর ব্যবহার আরও বাড়বে। এ অবস্থায় এটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে স্থানান্তরিত হলো। এখন হয়তো নতুন করে সবকিছু শুরু করতে হবে।
নির্বাচন কমিশন আইনানুগভাবেই জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র দিচ্ছে। ভোটার তালিকা প্রণয়ন কমিশনের সাংবিধানিক কাজ হলেও সব নাগরিকের জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন নির্বাহী কাজের অংশ। জাতীয় পরিচয় নিবন্ধনের কাজ সার্বজনীন। আর ভোটার তালিকার বিষয়টি শুধু ভোটার হওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের জন্য প্রযোজ্য। ভোটার শনাক্তকরণ কাজে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো নির্বাচন কমিশনও জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে।
জাতীয় পরিচয়পত্র তদারকির কাজ নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি জোরালো হওয়ার পেছনে কিছু অনিয়ম কাজ করেছে। নির্বাচন কমিশনের কঠোর নিরাপত্তা ও তদারকির পরও রোহিঙ্গাদের হাতে এনআইডি পৌঁছে যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির অভিযোগও উঠছে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে। রোহিঙ্গাদের ভোটার করার জন্য জন্মসনদ ইস্যুকারী, মা-বাবা পরিচয়ধারী এবং নাগরিক সনদ প্রদানকারীরাও দায়ী। তাদের সঙ্গে জনপ্রতিনিধিরাও বাদ যাচ্ছেন না। সবার সহযোগিতায় রোহিঙ্গারা এনআইডি পেয়ে যাচ্ছে। এছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্রের কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সময় মানুষের ভোগান্তির নানা অভিযোগ উঠেছে। নাম, পরিচয় এবং জন্ম তারিখে ভুলের অনেক অভিযোগ রয়েছে। জীবিত মানুষকে মৃত বানিয়ে দেওয়ার অভিযোগ নিয়েও সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। এ সমস্যার পেছনে নির্বাচন কমিশনের দক্ষতার অভাবকে দায়ী করেছেন সংশ্লিষ্টরা। রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির ঘটনায় এনআইডি নিবন্ধন কার্যক্রমের দায়িত্ব চেয়ে একটি প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুক্তি হচ্ছে নাগরিক নিরাপত্তা, চোরাচালান প্রতিরোধসহ অন্যান্য বিষয়ের জন্য এ কাজের দায়িত্ব তাদেরই থাকা দরকার। এ অবস্থায় সরকার নতুন আদেশ জারি করেছে।