সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোর (এএমসি) বেআইনি বিনিয়োগ, স্বেচ্ছাচারিতা ও অদক্ষতার কারণে দেশের মিউচুয়াল ফান্ড খাতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তলানিতে। চাহিদা কম থাকায় অধিকাংশ মিউচুয়াল ফান্ড সম্পদ মূল্যের চেয়ে অনেক কম দরে কেনাবেচা হচ্ছে। মিউচুয়াল ফান্ডের তহবিল পরিচালনায় দক্ষতা দেখাতে না পারলেও উচ্চহারে ফি আদায় করছে দেশীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলো। যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ১০ গুণ বেশি কমিশন ও ফি নিচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠান। এমনকি বিনিয়োগ লোকসানের কারণে ইউনিটধারীরা কোনো লভ্যাংশ না পেলেও সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান তহবিল পরিচালন ফি ঠিকই আদায় করছে।
গতকাল বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ক্যাপিটাল মার্কেট (বিআইসিএম) কর্তৃক আয়োজিত ‘মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের সমস্যা ও সম্ভাবনা : বাংলাদেশ প্রেক্ষিত’ সেমিনারে উপস্থাপিত গবেষণা প্রবন্ধে দেশীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোর উচ্চ হারে ফি নেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। বিআইসিএমের সহকারী অধ্যাপক কাশফিয়া শারমিন সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনা করেন।
গবেষণা প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের এএমসিগুলো মিউচুয়াল ফান্ডের নিট সম্পদ মূল্যের শূন্য দশমিক ২৫ থেকে শূন্য দশমিক ২৭ শতাংশ অর্থ কমিশন ও ফি আকারে পেয়ে থাকে। যেখানে দেশের মিউচুয়াল ফান্ড বিধি অনুযায়ী, এএমসিগুলো মিউচুয়াল ফান্ডের নিট সম্পদ মূল্যের ১ থেকে ২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন ও ফি আকারে আদায় করতে পারে। এ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় দশগুণ বেশি ফি আদায় করছে দেশীয় এএমসিগুলো, যা অনেক বেশি। মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগকারীদের অনীহার এটি একটি অন্যতম কারণ বলে গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়েছে।
মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগে অনীহার আরও একটি বড় কারণ হচ্ছে অনুমোদনহীন সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ। দেশীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই বেআইনিভাবে বিভিন্ন বেসরকারি ইকুইটিতে বিনিয়োগ করছে। ২০১৫ সালে একটি এএমসি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই বেসরকারি ইকুইটিতে ৯৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে। পরবর্তী সময়ে নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ ওই বিনিয়োগ প্রত্যাহার করার নির্দেশনা দিলেও ওই এএমসি তাতে ব্যর্থ হয়। এসব অনিয়ম বিনিয়োগকারীদের ভয়াবহ সংকেত দেয় মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগে।
মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ বৃদ্ধি এ খাতে বিনিয়োগে একটি বড় সমস্যা বলে উল্লেখ করা হয়েছে গবেষণায়। ২০১০ সালের ২৪ জানুয়ারি মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ দশ বছর বেঁধে দেয় এসইসি। কিন্তু ২০১৮ সালে মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ আরও দশ বছর বাড়ানোর সুযোগ দেয় এসইসি। ফান্ডে ইউনিটধারীরা এটি নেতিবাচকভাবে নেন এবং আদালতে যান।
নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের ঘন ঘন আইন পরিবর্তনও মিউচুয়াল ফান্ডে বিরূপ প্রভাব ফেলছে বলেও গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০০৮ সালে মিউচুয়াল ফান্ডের বোনাস ইউনিট ইস্যুতে বিধিনিষেধ আরোপ করে এসইসি। কিন্তু তা নিয়ে মামলা হলে এসইসি তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে। পরবর্তী সময়ে ২০১৯ সালে আবারও লভ্যাংশ হিসেবে মিউচুয়াল ফান্ডের বোনাস ইস্যুতে বিধিনিষেধ আরোপ করে এসইসি।
অন্যান্য দেশের তুলনায় দেশে মিউচুয়াল ফান্ডের আকার খুবই ছোট, যা জিডিপির এক শতাংশেরও কম। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে এএমসিগুলোর অবদান ৩ শতাংশেরও কম। যদিও দেশে এখন পর্যন্ত ৪৮টি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন রয়েছে, যাদের অধিকাংশই কোনো তহবিল পরিচালনা করছে না। এছাড়া এএমসিগুলোতে দক্ষ জনবলেরও অভাব রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের অজ্ঞতাও মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি সমস্যা। অধিকাংশ বিনিয়োগকারীরা জানেন না, মিউচুয়াল ফান্ড কীভাবে পরিচালিত হয়। যদিও তাদের জানা উচিত কী উদ্দেশ্যে তহবিল জমা হচ্ছে, তহবিলের অর্থ কোথায় এবং কীভাবে বিনিয়োগ করা হচ্ছে। পর্যাপ্ত কর সুবিধা না থাকাও এ খাতে বিনিয়োগে অনীহা রয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশে ৯৬টি মেয়াদি ও বেমেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড রয়েছে, যার মধ্যে ৩৭টি মেয়াদি। সবগুলো মিউচুয়াল ফান্ডের সম্পদের পরিমাণ হচ্ছে ১০ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা। গবেষণায় ২০১৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত মিউচুয়াল ফান্ডগুলো পারফরমেন্স বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। যেখানে দেখা গেছে, বেশিরভাগ তহবিলের বার্ষিক রিটার্ন ১০ শতাংশের কম। মাত্র ৭টি ফান্ড রয়েছে, যেগুলো বছরে ১০ শতাংশের বেশি রিটার্ন দিতে পারে। তুলনামূলক কম রিটার্ন দেওয়ার কারণে বছরের পর বছর ধরে অধিকাংশ মিউচুয়াল ফান্ড সম্পদ মূল্যের চেয়ে হ্রাসকৃত মূল্যে কেনাবেচা হচ্ছে। বর্তমানে ৩০টি মিউচুয়াল ফান্ড সম্পদ মূল্যের চেয়ে হ্রাসকৃত মূল্যে লেনদেন হচ্ছে।
দক্ষতা ও সফলতার মান বিবেচনায় সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো রেটিং না থাকার কারণে বেশিরভাগ মিউচুয়াল ফান্ড ভালো পারফর্ম করতে পারছে না। মিউচুয়াল ফান্ডে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে নতুন করে আর কোনো ফান্ডের মেয়াদ না বাড়াতে সুপারিশ করা হয়েছে উক্ত গবেষণায়। এছাড়া যেসব এএমসি অনুমোদনহীন বিনিয়োগ করেছে, তাদের যথাযথ শাস্তির আওতায় আনা, এএমসি কমিশন ও ফি কমিয়ে আনা, নতুন করে কোনো এএমসির নিবন্ধন না দেওয়াসহ মিউচুয়াল ফান্ডের লভ্যাংশে আরও কর ছাড়ের সুপারিশ করা হয়েছে।