৬ বছরেও জ্যেষ্ঠ শিক্ষক খুঁজে পায়নি কর্তৃপক্ষ

ঢাকার মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ মঈনউদ্দিন। ১৯৯৯ সালে তিনি এ পদে যোগ দেন। এরপর ২২ বছর একই পদে আছেন। অথচ একই সময়ে সরকারি কলেজে প্রভাষক পদে যোগ দিয়ে তারই পরিচিত অনেকে অধ্যাপক হয়েছেন।

দীর্ঘদিন পদোন্নতি না পেয়ে পেশা নিয়ে হতাশ মঈনউদ্দিন বলেন, ‘সরকারি সব চাকরিতে পদমর্যাদা বাড়ে, সমাজেও তারা আলাদা মর্যাদা পান। ব্যতিক্রম শুধু মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকরা। যে পদে শুরু, সে পদেই অবসর। পদোন্নতি না পাওয়ার এই যে হতাশা, তার প্রভাব পড়ে পাঠদানে।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষকদের এ হতাশা দূরে ২০১৫ সালে ‘জ্যেষ্ঠ শিক্ষক’ নামে একটি পদ সৃষ্টি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে এরপর ছয় বছর পার হলেও পদোন্নতির দেখা পাননি শিক্ষকরা। কতজন জ্যেষ্ঠতা পাবেন, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। যোগ্য শিক্ষকের বিপরীতে পদ সৃজনে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগের মধ্যেই সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের আওতাধীন সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (সেসিপ) থেকে নবম গ্রেডের ১ হাজার ৯টি পদ স্থায়ীকরণে প্রজ্ঞাপন জারি করে।

মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্তে শিক্ষকদের মধ্যে নতুন করে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, সেসিপ থেকে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা স্থায়ী হওয়ায় শিক্ষকদের পদোন্নতির পথ রুদ্ধ হবে। শিক্ষকদের বিভাগীয় পদোন্নতির মাধ্যমে জেলা ও থানা শিক্ষা কর্মকর্তাসহ অন্যান্য যেসব পদ (৫০ শতাংশ) সংরক্ষিত ছিল, সেটিও বাধাগ্রস্ত হবে।

‘সহকারী শিক্ষক’ নামে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে (সরকারি-বেসরকারি) মাত্র একটি পদেই সাধারণ শিক্ষক নিয়োগ হয়। এছাড়া ‘সহকারী প্রধান শিক্ষক’ ও ‘প্রধান শিক্ষক’ নামে আলাদা দুটি প্রশাসনিক পদ রয়েছে। যোগ্যতা অনুযায়ী সাধারণ শিক্ষকরা (সরকারি বিদ্যালয়) পদ দুটিতে যেতে পারেন। তবে পদসংখ্যা সীমিত হওয়ায় সব শিক্ষকের ভাগ্যে এটি জোটে না। আর এ জটিলতা কাটাতে দীর্ঘদিন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষকদের পদ তৈরির দাবি জানিয়ে আসছিলেন শিক্ষকরা। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০১৫ সালে ‘জ্যেষ্ঠ শিক্ষক’ পদ সৃষ্টি করে। চাকরি শুরুর পর আট বছরের অভিজ্ঞতা ও বিএড থাকলে পদটির জন্য যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৬৮০টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে, যেখানে শিক্ষক ১০ হাজার ৯০৪ জন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষকদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ শিক্ষক হওয়ার যোগ্য ৭ হাজার ২৩৩ জন। অথচ ২০১৫ সালে ৭ হাজার ৭৬৪ সহকারী শিক্ষকের বিপরীতে মাত্র ৩ হাজার ৮৮২টি জ্যেষ্ঠ শিক্ষক পদ অনুমোদন করে অর্থ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। বিষয়টি নিয়ে সে সময় শিক্ষকদের মধ্যেও অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল। তাদের অভিযোগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাউশির গাফিলতির কারণেই এ জটিলতা হয়েছে। প্রতিষ্ঠান দুটি সহকারী শিক্ষকদের তথ্য হালনাগাদ করেনি। ফলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষককে পদবঞ্চিত রেখেই এখন সেসিপ প্রকল্প থেকে হাজারো লোক নেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে সেসিপের উপপরিচালক অধ্যাপক ড. সামসুন নাহার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতের বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্মতি দিয়েছে। সবার প্রোফাইল যাচাই-বাছাই চলছে। অর্থ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের ব্যাপার রয়েছে। কারণ কিছু পদ তৈরি ও কিছু পদ স্থানান্তর করতে হবে। পিএসসিরও অনুমোদন প্রয়োজন পড়বে। এজন্য সময় লাগবে।’

পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক নোয়াখালীর একটি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, ‘সেসিপ প্রকল্পের ১ হাজার ৯টি নবম গ্রেডের পদ তৈরি হয়েছে। কিন্তু সরকারি মাধ্যমিকের শিক্ষকরা পাবলিক সার্ভিস কমিশন থেকে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এসে ১০তম গ্রেডে চাকরি শুরু করেন। চাকরিতে সন্তুষ্ট না হওয়ায় শিক্ষকরা পেশা বদল করছেন। পদোন্নতি না থাকায় ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে।’ আরেক শিক্ষক বলেন, ‘সেসিপের কর্মকর্তারা নবম গ্রেডে চাকরি শুরু করাই ভবিষ্যতে সহজেই পঞ্চম ও ষষ্ঠ গ্রেডের পদে সুযোগ পাবেন। ফলে আমরা ওই গ্রেডগুলোতে যেতে পারব না।’

বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহবুদ্দিন মাহমুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সেসিপ কর্মকর্তাদের পদায়নে শিক্ষকদের উদ্বেগের কিছু নেই।’ জ্যেষ্ঠ শিক্ষক পদে পদায়ন ও পদ সৃষ্টির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি পিএসসিতে আছে বলে আমি শুনেছি। মন্ত্রণালয় আশ্বাস দিয়েছে। শিগগিরই এটি হয়ে যাবে।’

এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুব হোসেনের মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কল ধরেননি। মাউশির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘শিক্ষকরা আশাহত হলেও বিষয়টি নিয়ে আসলে অধিদপ্তরের কিছু করার নেই। এটি মন্ত্রণালয় দেখভাল করবে।’

মাউশির মহাপরিচালক (ডিজি) সৈয়দ গোলাম ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিক্ষকদের পদায়নের বিষয়টি আমরা আগেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। এ বিষয়ে জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের ব্যাপার আছে। তাদের মধ্যে বৈঠক হয়েছে। আমরা আশা করছি শিগগিরই পদায়ন করা সম্ভব হবে।’