অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় গুরুত্বপূর্ণ শক্তিশালী বেসরকারি খাত

পণ্যে বৈচিত্র্য এনে রপ্তানি-নির্ভর প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অর্থনীতির সম্ভাবনা উন্মোচনে বেসরকারি খাতকে শক্তিশালী করতে এবং এর আধুনিকায়নে বাংলাদেশকে নতুন দফার সংস্কার শুরু করতে হবে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের এক নতুন প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। 

আইএফসি এবং বিশ্বব্যাংক প্রণীত বাংলাদেশ কান্ট্রি প্রাইভেট সেক্টর ডায়াগনস্টিক (সিপিএসডি) রিপোর্টে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বাংলাদেশ অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন সাফল্যের উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরবর্তী দশকে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার  আকাক্সক্ষা পূরণে বাংলাদেশের এখন গতি পরিবর্তনের সময়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল বিশ্বে ৯০ শতাংশ কর্মসংস্থান বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে একটি বিস্তৃত বেসরকারি খাত গড়ে তোলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান বলেন, ‘কভিড-১৯ অতিমারীর প্রতিকূল প্রভাব সত্ত্বেও বাংলাদেশ গত বছর ইতিবাচক জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে এবং বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র দেশ যে মন্দার কবলে পড়েনি। আমরা কভিড-১৯ অতিমারীর সমস্ত চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় রেখে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছি।’ তিনি বলেন, ‘সিপিএসডি রিপোর্টের সুপারিশগুলো ২০৪১ সাল নাগাদ একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশের পথে যেতে সরকারের অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অগ্রাধিকারগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।’

আইএফসির এশিয়া ও প্যাসিফিক ভাইস প্রেসিডেন্ট আলফনসো গার্সিয়া মোরা বলেন, ‘অতিমারী বাংলাদেশের ওপর কঠিন আঘাত হেনেছে এবং দেশটি কভিড-১৯ থেকে উত্তরণের পর্যায়ে থাকায় সংস্কারের প্রয়োজনীতা আরও দৃঢ়ভাবে দেখা দিয়েছে। মজবুত আর্থিক খাতের সহায়তায় ইতিমধ্যে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ৭০ শতাংশের বেশি বেসরকারি খাতের এবং  এখন অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ত্বরান্বিত করতে এ খাতের জোরালো ভূমিকা রাখার দরকার, যাতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও রপ্তানি বাড়ানোর পাশাপাশি গুণগত মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে।’

রিপোর্টে বলা হয়েছে, ৪০ লাখের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী তৈরি পোশাক খাতের সাফল্য এবং সরকারের দূরদর্শী নীতির সহায়তায় রেমিট্যান্সের তেজি প্রবাহ বাংলাদেশের দৃঢ় ও প্রাণবন্ত প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে, এমনকি অতিমারীর সময়েও।

বাংলাদেশ ও ভুটানে নিযুক্ত বিশ^ব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর মার্সি টেম্বন বলেন, ‘রপ্তানিতে বিশ্বের দ্বিতীয় স্থানে থাকা তৈরি পোশাক খাত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। আরও প্রাণবন্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে এবং একটি বলিষ্ঠ ও অত্যাধুনিক বেসরকারি খাত গড়ে তুলতে হবে, যা করোনা পরবর্তী পুনরুদ্ধার পর্যায়ের জন্য প্রাসঙ্গিক,  যেখানে সরকারের বেশিরভাগ সম্পদের প্রয়োজন হবে সামাজিক খাতের জন্য।’

রিপোর্টে বলা হয়েছে, সংস্কার এজেন্ডার প্রধান অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সহায়ক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টি, আর্থিক খাতের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ এবং অবকাঠামো উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতাগুলো দূরীকরণ। বেসরকারি খাতে উজ্জ্বলতম বিনিয়োগ সম্ভাবনার খাতের মধ্যে রয়েছে পরিবহন ও লজিস্টিকস, জ্বালানি, আর্থিক সেবা, হালকা প্রকৌশল, কৃষি বাণিজ্য, স্বাস্থ্যসেবা এবং ওষুধ, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালে নিযুক্ত আইএফসির কান্ট্রি ম্যানেজার ওয়েন্ডি ওয়ার্নার বলেন, ‘এটা সুস্পষ্ট যে, গুণগত স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা পূরণে এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার দক্ষতা বাড়াতে বেসরকারি খাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কেননা একই পর্যায়ের উন্নয়নে  থাকা অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়ন নিম্ন মাত্রার।’ তিনি  বলেন, ‘এর বাইরে  বাংলাদেশ উচ্চমূল্যের তৈরি পোশাকের বাজারে মনোযোগ দিতে পারে ও নতুন প্রযুক্তির প্রবর্তন করতে পারে এবং পাদুকা, চামড়া, ইলেকট্রিক সামগ্রী এবং কৃষিবাণিজ্য রপ্তানির সুযোগ কাজে লাগাতে পারে।’

বাংলাদেশ সরকারের পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০২১-৪১) অনুযায়ী সরকার ২০৩১ সাল নাগাদ উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে সবার কর্মসংস্থান ও চরম দারিদ্র্য দূর করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সিপিএসডি রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, এখন পর্যন্ত ৪ কোটির বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে  এবং জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক মানুষ  দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়ার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, যা থেকে বের হওয়া বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।