নবম মস্কো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সম্মেলন

বাংলাদেশের টিকা উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে : প্রধানমন্ত্রী

বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিকদের সম্মানজনক ও শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে বিশ্বসম্প্রদায়ের সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল বুধবার তিন দিনব্যাপী নবম মস্কো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সম্মেলনে ভিডিও বার্তায় এসব কথা বলেন তিনি।

বাংলাদেশের টিকা উৎপাদনের সক্ষমতার বিষয় তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের সরকার টিকার জন্য রাশিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত আছে। আমাদের যদি টিকা উৎপাদন চেইনে নেওয়া হয়, আমরা বিশ্বসম্প্রদায়কে সহায়তা দিতে পারব।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বসম্প্রদায়কে তাই আমি অনুরোধ করব, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিকদের সম্মানজনক ও শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে আমাদের সহযোগিতা করুন।’

কভিড-১৯ মহামারীকে বর্তমান সময়ের ‘সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি’ হিসেবে বর্ণনা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এটা শুধু বিপুল মৃত্যু ডেকে আনেনি। অর্থনীতিকে ধসিয়ে দিয়েছে, সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিভিন্ন খাতে প্রণোদনা দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার এই মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা দেখিয়েছে।

দেশের সব নাগরিককে বিনামূল্যে কভিড-১৯ টিকা দেওয়ার অঙ্গীকারের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার সম্ভাব্য সব উৎস থেকে টিকা সংগ্রহ করার চেষ্টা করছে।

সরকার প্রধান বলেন, ‘এখন নিরাপত্তা ধারণার মধ্যে সামরিক হুমকি, ব্যক্তির আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রয়োজন, স্বেচ্ছায় গণঅভিবাসন, পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং অন্যান্য অপ্রচলিত নিরাপত্তা হুমকি অন্তর্ভুক্ত।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘এমনকি সন্ত্রাসবাদ, চরমপন্থা, বিচ্ছিন্নতাবাদ, ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র, সাইবার অপরাধ, আঞ্চলিক কোন্দল এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার নতুন চ্যালেঞ্জ ও সমস্যা দেখা দিয়েছে।’

ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির প্রশংসা করেন শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধুকন্যা আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের অন্যান্য অংশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিরাজ করবে।’

 জলবায়ু সংকটকে বর্তমান সময়ের আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে বর্ণনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে বিশ্বসম্প্রদায়ের ‘যথাযথ মনোযোগ’ দেওয়া প্রয়োজন। ‘যদিও জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের কোনো ভূমিকা নেই। অথচ যেসব দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, বাংলাদেশ তার একটি।’

জ্ঞান ও দক্ষতা বিনিময় এবং সহযোগিতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে বিশ্বসম্প্রদায় জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।

বাংলাদেশে টানা তিনবারের সরকারপ্রধান বলেন, ‘রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে বিরোধ যে আন্তঃরাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংকট তৈরি করে সে তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না।’

রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া ১০ লাখের বেশি মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিক বাংলাদেশ ও এ অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা তাদের আশ্রয় দিয়েছি। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে এখানে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের আশ্রয়স্থল হতে পারে না। বিশ্বসম্প্রদায়কে অনুরোধ করব, মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিকদের তাদের মাতৃভূমিতে সম্মানজনক ও শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিতে আমাদের সহায়তা করুন।’

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘চার বছরের বেশি সময় ধরে জোরপূর্বক বিতাড়িত মিয়ানমারের  ১ দশমিক ১ মিলিয়নের বেশি রোহিঙ্গা নাগরিককে বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়ে আসছে। তারা বাংলাদেশ এবং এ অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘একটি দেশের বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যকার সংঘাত আন্তঃদেশীয় নিরাপত্তা সমস্যার জন্ম দেয়।’

বিশ্বসম্প্রদায়কে কভিড-১৯ যুদ্ধে সবার জন্য টিকা নিশ্চিত করা, অসহায় মানুষের জন্য মানবিক সহায়তা, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন, সন্ত্রাসীদের অস্ত্র ও অর্থ সহায়তা বন্ধ করা এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে সামরিক সংস্থাগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন প্রধানমন্ত্রী।