শওকত ওসমান, আহসান হাবীব, ফররুখ আহমদ ও সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ এবং তাদের মতন অনেকেই সাতচল্লিশের পটভূমিতে কলকাতা থেকে ঢাকায় এসেছেন। এখানে শওকত ওসমান বাদে বাকি তিনজনেরই পৈতৃক ভিটে দেশভাগের নির্মম ও দারুণ জটিল হিসাবে পূর্ববাংলায়। এ যেন ব্রিটিশরাজের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাদেরও বাড়ি ফেরা। ওই সময়টাকে আর ওই সময়ের এই চার তরুণের সাহিত্যিক দিনযাপন নিয়ে একটু ভাবা যাক।
কলকাতায় তারা ছোট-বড়ো চাকরি করতেন। নিশ্চয় সে শহর ছাড়ার কথা তারা ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি। তরুণ সাহিত্যিক হিসেবে ইতিমধ্যে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ কনিষ্ঠ। তিনিসহ প্রত্যেকেরই প্রথম বই বেরিয়েছে। কোনো কোনোটির প্রচ্ছদ করেছেন ভারতখ্যাত তরুণশিল্পী জয়নুল আবেদিন। ফলে এই পূর্ববঙ্গজদের এক ধরনের সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ও শিল্পকলা সংক্রান্ত যোগাযোগ ছিল। ওয়ালীউল্লাহ শিল্পকলা নিয়ে কিছু প্রবন্ধও লিখেছেন ওই সময়ে।
কলকাতার মতন গোটা ভারতের সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক রাজনীতি ছেড়ে ঢাকা শহরে এসে তাদের যে সাহিত্যিক পরিমন্ডলে পড়তে হয়েছিল সেই বিষয়টা কেমন? আজকের ঢাকা নগরীর কাছে সেদিনের ঢাকা একেবারেই গঞ্জ বা মফস্বল শহর। বঙ্গভঙ্গ ও বঙ্গভঙ্গ-রদ এর ঘটনা সাতচল্লিশের চার দশক আগেকার বিষয়। সেই সময়ে ঢাকার স্থাপত্যে খানিকটা তেজ এসেছিল। তার প্রমাণ কার্জন হল ও এখনকার মেডিকেল কলেজের মূল ভবন। তারপর তো সবই যেইকে সেই। সদরঘাট থেকে ওয়ারীর এপাশে আর ঢাকা কই। যেটুকু তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কদিন আগে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা হওয়ায়। সে সবই সেদিনের মূল শহরের প্রায় বাইরে। ওই সময়ের ঢাকার বাসিন্দাদের স্মৃতিকথায় এমন নমুনা মেলে। এলিফ্যান্ট রোডে ধান ক্ষেত, ষাটের দশকের ঘটনা। ধানমন্ডি কিংবা ধানমন্ডাইয়ের মাঠ যে আসলেই ফাঁকা ধুধু সেখান থেকে তুরাগের প্রবাহ পুরোটাই দৃশ্যমান, সে কথা তো ওই দেশভাগের পরের ঘটনা।
এমন একটি শহরে কলকাতায় প্রতিষ্ঠা পাওয়া তিরিশ বছর বা তারও কম বয়েসি এই লেখকরা ঢাকায় এসে মহানগরীর আলোকোজ্জ্বলতা থেকে একেবারে সান্ধ্যকালীন অন্ধকারে পড়েছিলেন, তা বোঝার জন্য ঐতিহাসিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। উপলব্ধি করতে হলে এখনকার যে কোনো মেট্রোপলিটন নগর থেকে একটি জেলা শহরে সন্ধ্যেবেলায় উপস্থিত হলেই চলে। এই যে অন্ধকার লিখেছি, এর মানে আলোহীনতা নয়, আলো সেখানে আছে কিন্তু তা মহানগরীর আলো নয়। ঢাকা তো গত পঞ্চাশ বছর স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী। যে কোনো রাজধানীর চেহারা শত যানজট, বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার নির্যাতন, ধুলোর অত্যাচারের পরেও একেবারেই আলাদা। তারা ঢাকায় এসেছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতারও বাইশ-তেইশ বছর আগে। কলকাতা তখন আর ভারতের রাজধানী নেই ঠিকই, কিন্তু ব্রিটিশের দ্বিতীয় জনবহুল শহর আর বাদ বাকি সবদিক দিয়ে মোটামুটি লন্ডনের পরে। একইসঙ্গে সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তার প্রমাণ বম্বে টকিজের পরবর্তীকালের অবাঙালি অধিপতিদের সবাই তখন কলকাতায় জীবিকার সন্ধানে। ফলে সেই শহর ছেড়ে চার তরুণ ঢাকা শহরে! বিষয়টা এভাবে ভাবলে সহজ হবে।
সঙ্গে আরও যোগ করা যেতে পারে, বাংলা সাহিত্যের তখন স্বর্ণযুগ। রবীন্দ্রনাথ প্রয়াত হয়েছেন বছর ছয়েক। কাজী নজরুল নিষ্ক্রিয়। রবীন্দ্রনাথ থেকে নজরুল এই প্রায় চল্লিশ বছর বয়সের ব্যবধানের, দ্বিতীয় পর্যায়ের অর্থাৎ নজরুলের সমকালীন লেখকরা সবই একেবারে মাঝ আকাশে। একদিকে বিভূতিভূষণ-তারাশঙ্কর-মানিক অন্যদিকে জীবনানন্দ-সুধীন্দ্রনাথ-জসীম উদ্দীন-বুদ্ধদেব-বিষ্ণু দে প্রমুখ। আছেন প্রেমেন-শিবরাম-মুজতবা। এরপরের কালের লেখক হিসেবে যারা আসবেন, ওই চারজন তাদের সমকালীন। কিন্তু রাজনীতি তাদের জীবনের সবচেয়ে ফলবাজ সময়ে থিতু শহর ছাড়তে বাধ্য করছে। শুধু রাজনীতি? হয়তো তা নয়। বাংলার হিন্দু-মুসলমানের সবচেয়ে বড় সাম্প্রদায়িক বিভাজনের কাল সেটি। নীরদচন্দ্র চৌধুরীর মতে, সে দিন উনিশশ সাঁইত্রিশেই শুরু হয়েছে। সম্ভবত সবিতেন্দ্রনাথ রায়ের কলেজ স্ট্রীটে সত্তর বছর বইয়ে পড়েছি, তরুণ সবিতেন্দ্রনাথ শুনছেন একজন অন্যজনকে বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক বন্দে আলী মিয়াকে দেখিয়ে বলছেন, দেখ দেখ বন্দে আলী মিয়া! অন্যজন বলছেন, দেখতে তো একেবারে আমাদের মতো বাঙালি! ঘটনাটি কৌতূহলের সন্দেহ নেই। এরপরেই অন্যজন বলছেন বাঙালিই তো। বিষয়টা দাঁড়াচ্ছে, তাহলে যে মুসলমান! এটি হয়তো বিচ্ছিন্ন ঘটনা, কিন্তু বিষয়টা সাহিত্যিকমন্ডলেও ভেতরে ভেতরে বহমান হতে শুরু করেছে। নগর কলকাতার জনসংখ্যায় হিন্দু-মুসলমানের অনুপাত সব সময়েই বেশ কাছাকাছি, সেখানে অবাঙালি হিন্দুর তুলনায় অবাঙালি মুসলমান হয়তো বেশি, এর বড় একটি অংশ বিহার থেকে আগত।
ওই সাহিত্যিকরা কলকাতা ছেড়ে এসে এই যে ঢাকায় পড়লেন, সেখানে সাহিত্যিক হিসেবে তারা সংখ্যালঘু। ঢাকায় তখন যে বাংলা সাহিত্যের চর্চা হয়, তা যেমন কলকাতার দিকে তাকিয়ে আর বাকি বিরাট অংশের শিল্পমান একেবারেই শূন্য। হুমায়ুন আজাদের গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগ্রন্থ ভাষা আন্দোলন : সাহিত্যিক পটভূমিতে ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত ঢাকার সাহিত্যের যে প্রকাশপঞ্জি পাওয়া যায়, সেসব রচনা শিল্পের দিক থেকে অত্যন্ত দুর্বল। সেই লেখকরা পাকিস্তানপ্রাপ্তিতে গদগদ চিত্তে এমন সব লেখা লিখেছেন যে সেগুলো ওই পাকিস্তান পর্বের শেষ দিকেই বেশ হাসির খোরাক জুগিয়েছিল। স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনে ও এর সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট রচনায় ওইসব লেখার প্রায় কোনো ভূমিকাই নেই। সেখানে শওকত ওসমান, আহসান হাবীব, ফররুখ আহমদ আর সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ কলকাতা পর্বেই অত্যন্ত প্রতিশ্রুতিশীল লেখক। দেশভাগ তাদের সাহিত্যিক জীবনকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। যেমন একই কথা বলা চলে জয়নুল আবেদিন সম্পর্কে। শোনা যায় দেশভাগের পরে জয়নুল আবেদিনকে অন্তত তিনবার ভারতের সাংস্কৃতিক মন্ত্রক থেকে সে দেশে স্থায়ী হওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। সৈয়দ মুজতবা আলী এখানে এসে একেবারেই তিষ্ঠাতে পারেননি, সেই পালিয়ে বাঁচাও সাহিত্যের ইতিহাস বহন করছে। কিংবা কাজী আবদুল ওদুদ। আসেননি হুমায়ুন কবির। তেমন এক বাস্তবতায় তাদের এখানে সাহিত্যে স্থির হতে হয়েছে। হুমায়ুন আজাদ ওই সাতচল্লিশ-বাহান্ন পর্বের মাত্র দুটি উপন্যাসকে রচনার দিক থেকে যোগ্য মনে করেছেন, একটি লালসালু অন্যটি সূর্য-দীঘল বাড়ি। বাকিগুলোকে বলেছেন উপন্যাস পদবাচ্য নয়; তার ওই আলোচনায় উল্লেখ আছে, ওই দুটো নিরন্তর পাকিস্তান রাষ্ট্রের সমালোচনা। লেখা প্রয়োজন ফররুখ আহমদ পরবর্তীকালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সমালোচকের পরিবর্তে স্তুতিকারে পরিণত হয়েছেন, কিন্তু তার বিশ্বাসে যাই ঘটুক, কবি হিসেবে তিনি কোনোভাবে নিজ অর্জিত মানের নিচে নামেননি। অর্থাৎ কলকাতা থেকে ঢাকায় এসে, সেই ঢাকায় যে কবিতা রচনার মচ্ছপ চলছিল, যা কবিতার নামে প্রায় ছড়াই তা তিনি রচনা করেননি।
প্রসঙ্গে ফেরা যাক। ওই যে চারজন তরুণ লেখক, তাদের ভেতরে শওকত ওসমানের কাছে এটি একেবারেই নতুন দেশ। তিনি সম্ভবত এখানে এসে চাকরিসূত্রে চট্টগ্রামে চলে যান। বাকি তিনজনের কাছে দেশটি নিজের, কিন্তু এই শহরের সাহিত্যিক বাতাবরণের কোনো কিছুর সঙ্গে তাদের কোনো মিল খুঁজে পাওয়ার সুযোগ নেই। নেই দেশ বা চতুরঙ্গ পরিচয় মোহাম্মদী বা সওগাতের মতন কাগজ। নেই মৌচাক বা দেব সাহিত্য কুটিরের শিশু সাহিত্যের ধারা। আর মুদ্রণশিল্পের মানও তো ঢাকায় তখন একেবারে শৈশবে। যদিও এই ঢাকাতেই এর প্রায় নব্বই বছর আগে দীনবন্ধু মিত্রের বিখ্যাত নীলদর্পণ ছাপা হয়েছিল।
এর ছাপ লালসালুর দিকে তাকালেই চোখে পড়ে। লালসালু প্রকাশিত হলো ১৯৪৮-এ। দ্বিতীয় প্রকাশ ১৯৬০-এ। বারো বছর। যদি এই বইটি কলকাতায় প্রকাশিত হতো, যেমন হয়েছিল তার নয়নচারা, তাহলে এর প্রথম সংস্করণ শেষ হতে বারো বছর লাগত! শোনা যায়, বন্ধু সহযাত্রীরা মিলে প্রকাশ করেছিলেন এই বই। আহসান হাবীব জয়নুল আবেদিন যুক্ত ছিলেন। ওয়ালীউল্লাহ্র বই বেরুচ্ছে তার পুরনো বন্ধুদের সহযোগিতায়, যদিও সে বই বাঁধাইখানাতেই পড়ে রইল। ইতিমধ্যে তিনি পশ্চিম পাকিস্তান ও বিদেশের নানা জায়গায়। একবার ঢাকায় এলে বাঁধাইখানার দপ্তরি বলেছিলেন বইগুলো নিয়ে নিতেআর কতদিন এভাবে রাখবেন? ওয়ালীউল্লাহ কী করেছিলেন? যদিও ১৯৬০ থেকে ১৯৭০-এ লালসালু পাঠক পেয়েছে। অর্থাৎ, তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ঢাকা ততদিনে উপন্যাস পড়তে শিখেছে।
আচ্ছা, লালসালু রচনা ও প্রকাশকালে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তো নিমতলি বকশিবাজার এলাকায় থাকতেন। ওই বিপর্যস্ত সময়ে লিখেছিলেন দেশভাগের পটভূমিতে এক শ্রেষ্ঠ গল্প, একটি তুলসী গাছের কাহিনী, পুরান ঢাকার একটি বাড়িকে ঘিরে। কখনো কখনো ওই এলাকার রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে তার কি মনে হতো, তিনি কলকাতার পার্ক স্ট্রিটে কিংবা কলেজ স্ট্রিটে। তা ভেবে উদাস হয়ে তাকাতেন দক্ষিণ-পশ্চিমে, ফেলে আসা কলকাতা মহানগরী যে দিকটাতে। যেখানে বেরিয়েছিল তার প্রথম বই নয়নচারা!
লেখক কথাসাহিত্যিক
prasantamridha@gmail.com